যান না। আমি পিছু নিতে জানি।
সে তো বুঝতে পারছি। পিছু নিলে যোলো কলা পূর্ণ হবে। কিন্তু আমি সবদিক ভেবেচিন্তে এগোতে চাই। আপনি পাগলামি করবেন না।
শচীনের চেহারায় যে খ্যাপামির ছাপ পড়েছে সেটা কি প্রেমিক পুরুষের লক্ষণ? ঠিক বুঝতে পারছিল না চপলা, তবে একজন পুরুষ মানুষের ভিতরে যে এতটা ওলট-পালট সম্ভব এটা তাব ধারণায় ছিল না। কাল শচীনকে দেখে কেন যেন তার একটু ভয় হল। একটা ঝড় সে তুলেছে কিন্তু সামাল দিতে পারবে তো? পুরুষরা যখন এরকম আমূল উন্মাদ হয়ে ওঠে তখন কি সব লন্ডভন্ড করে দেয়? যদি দেয় তবে চপলা কী করবে?
চপলার শরীর সম্পর্কে শুচিবায়ু কেটে গিয়েছিল কৈশোরেই, যৌন সংসর্গ ঘটেনি ঠিকই, তবে স্পর্শদোষ ঘটেছিল। আজও তেমন শুচিবায়ু নেই। কিন্তু সংস্কার কাজ করে। কনককাপ্তির প্রতি তার বিরাগ নেই, অনুরাগও নেই। আছে থাক না, এরকম মনোভাব। শচীনের প্রতিও যে সে কোনও বাঁধন-ছেঁড়া আকর্ষণ অনুভব করে তাও নয়। সে শচীনকে অন্যরকমভাবে চেয়েছিল। একজন রূপমুগ্ধ ভক্ত। অঢেল প্রশংসাবাক্য, চাটুকারিতা আর মুগ্ধ দৃষ্টি দিয়ে প্রতিদিন বিধৌত করে দেবে তাকে। কিন্তু খুব কাছে আসবে না, অন্তত সে রকম সাহস হবে না। চপলাও দাক্ষিণ্য দেখাবে বই কী। কখনও-সখনও দু-একটা স্তোক, একটু-আধটু দৃষ্টির প্রসাদ, সামান্য হাসির দাক্ষিণ্য। সেটুকু নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে। সে ক্ষেত্রে বিশাখার বর হলেও শচীনের সঙ্গে তার নির্দোষ অথচ গোপন একটা ইঙ্গিতময় সম্পর্ক থেকে যেত।
কিন্তু তা হল না। হিসেবে ভুল হয়েছিল চপলার। শচীনকে সে ঠিকমতো জরিপ করে নেয়নি। যতটা নিরীহ, ভিতু আর ঠান্ডা মাথার মানুষ বলে মনে হয়েছিল ততটা শচীন নয়। তার ভিতরটা আগ্নেয়গিরির মতো টগবগ করে ফুটছে। চপলা সেই আঁচ টের পাচ্ছে আজকাল। শচীন যদি এতটা উন্মত্ত না হত তা হলে তাদের মধ্যে এত তাড়াতাড়ি, এত অল্প সময়ের মধ্যে এরকম অবৈধ প্রণয় ঘটে উঠত না।
এখন চপলা কী করবে তা বুঝতে পারছে না। কিছুতেই বুঝতে পারছে না। চৌকাঠের বাইরে পা বাড়ালেই ফেরার দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। আর ফিরতে কি কোনওদিন ইচ্ছে করবে না চপলার? সে মেয়েমানুষ। চিরকাল মেয়েমানুষেরা নিরাপদ ঘরের আশ্রয়, পুরুষের ছায়ায় নিরাপত্তা খুঁজে এসেছে। সেও তো ব্যতিক্রম নয়।
বৃষ্টির ইলশেগুঁড়ি ছাট আসছিল, তবু রেলিং-এ ভর দিয়ে দাঁড়াল চপলা। ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটায় শরীর শিরশির কবছে। সুতির চাদরটা ভাল করে গায়ে জড়িয়ে নেয় সে। ভেজা রেলিং হাতে হ্যাক করে শীতল শিহরন তোলে।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে জলের চাদরে ঢাকা বাগানটা দেখে সে। কিন্তু ভিতরে কোনও প্রতিক্রিয়া হয় না।
চপলা আস্তে-আস্তে বারান্দা ধরে এগোেল। আজকাল বিশাখা আলাদা ঘরে থাকে। কৃষ্ণকান্তও আলাদা ঘরে। কৃষ্ণকান্ত আজকাল ধ্যান-ট্যান করে।
বিশাখার ঘরের ভেজানো দরজার বাইরে চোরের মতো এসে দাঁড়ায় চপলা। মেয়েটা বড় সুন্দরী, কিন্তু সেরকমই সাংঘাতিক মুখরা আর অহংকারী। শচীনের সঙ্গে চপলার নতুন সম্পর্কটা তৈরি হওয়ার পর থেকে কিন্তু বিশাখার আর সেই তেজ নেই। ওর চোখের কোলে আজকাল প্রায় সবসময়েই জলের দাগ লক্ষ করা যায়। সারাদিন নিজের ঘরেই বসে থাকে। বেশিরভাগ সময়ে দরজা বন্ধ। হয়তো ঘরে বসে কাঁদে, ভাবে। ইদানীং বিশাখাও ভারী রোগা হয়ে গেছে।
চপলা দরজাটা খুব সামান্য ঠেলল। খুলল না। পুরনো পুরু কাঠের দরজা। সহজে খোলার নয়। খড়খড়ি সামান্য একটু তুলে ভিতরটা দেখতে চেষ্টা করল চপলা।
ঘরটা আধো অন্ধকার। তবে উত্তর দিককার একটা জানালা খোলা। সেটা দিয়ে মেঘলা আকাশের একটু ফ্যাকাসে আলো এসেছে ঘরে।
সেই জানালায় চুপ করে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে বিশাখা। শরীর যেন প্রাণহীন, স্পন্দনহীন, সংজ্ঞাহীন।
চপলা অনেকক্ষণ চেয়ে রইল। কিন্তু বিশাখা একটুও নড়ল না। একচুলও না। শুধু এলানো চুল বাতাসে পিঠময় গড়িয়ে যাচ্ছে।
দৃশ্যটা দেখে কয়েকদিন আগে চপলার এক ধরনের হিংস্র আনন্দ হতে পারত। আজ হল না। আজ সামান্য একটু মোচড় দিল বুকের মধ্যে। মেয়েটা অহংকারী, মেয়েটা ঝগড়াটে সন্দেহ নেই কিন্তু এখন যে ওর এই বোবা একটা ভাব, ওই যে পাথর হয়ে যাওয়ার মতো ভঙ্গি, এটা যেন ওর যথার্থ পাওনা নয়। শচীনের প্রতিশোধ কতটা সাংঘাতিক হতে পারে এটা বোধ হয় বোকা মেয়েটা আগে বুঝতেও পারেনি।
চপলা হঠাৎ দরজাটা ধরে টানল। বেশ জোরে। পাল্লা দুটো খটাং শব্দে খুলে গেল। খুব আস্তে মুখটা ফেরাল বিশাখা। দুটো বড় বড় চোখে নিষ্পলক দৃষ্টি। কিন্তু বিস্ময় নয়। কেমন শূন্য।
চপলা ঘরে ঢুকে দরজাটা আটকে দিল।
তোর সঙ্গে কথা আছে।
বিশাখা খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে যেন কষ্টে চিনতে পারল চপলাকে। কিন্তু নড়ল না। ওখান থেকেই বলল, তুমি এখন যাও বড় বউদি, আমার কিছু ভাল লাগছে না।
চপলা কথাটা গায়ে মাখল না। তারও মনের অবস্থা এমন যে, ছোটখাটো অপমান তার গায়ে লাগে না আজকাল। অনেক সময়ে বুঝতেই পারে না, কোনটা অপমান, কোনটা নয়।
চপলা বিশাখার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। জানালা দিয়ে উত্তরে নদীর প্রলয়ঙ্করী চেহারার দিকে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ। বিশাখা যেন বা চপলার ছোয়াচ বাঁচাতেই একটু সরে যায়।
চপলা চাপা গলায় বলে, তোর কী হয়েছে?
কিছু নয়। তুমি যাও।
শোন, তাড়িয়ে দিস না। আমার সত্যিই কথা আছে।
