ঘর ভাঙতেই যাচ্ছি। কিন্তু সে তো তোমার জন্যই। আমি কি যেতে চেয়েছি?
কিন্তু যখন যাচ্ছ তখন সর্বান্তঃকরণেই যাও। পিছুটান রেখো না।
তোমাকেও একটা কথা বলি?
আবার কী কথা?
যাকে নিয়ে থাকবে বলে ঠিক করেছ তাকে একটু ভালবেসো, একটু মূল্য দিয়ে। আমার মতো হেলাফেলা কোরো না।
উপদেশের জন্য ধন্যবাদ। তবে সে তোমার মতো ছিচকাঁদুনে নয়। আমি কেমন সে জানে। তাই সে বেশি এক্সপেক্টও করে না।
লিবারেটেড মহিলা নাকি?
ধরো তাই।
রেমি একটু ভেবে বলে, তোমার সঙ্গে এরকমই কাউকে মানাবে।
ধ্রুব একটু হেসে বলে, তা হলে পাত্রী পছন্দ!
আগে একবার চোখের দেখা দেখি।
ধ্রুব আচমকা কাছে এসে দুহাতে রেমিকে ধরে তুলল। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, তুমি আমাকে ভালবাসো আমি জানি। একটা কাজ করতে পারো? ফর মাই সেক?
রেমির শরীর এই আকস্মিক স্পর্শে ঝংকার দিয়ে উঠল। ভিতরে ভিতরে মৃদু বিদ্যুতের তরঙ্গ বয়ে যাচ্ছে। বিহুল হতভম্ব চোখে সে ধ্রুবর মুখের দিকে কিছুক্ষণ বাক্যহারা চেয়ে রইল। তার ভিতরে একটি প্রার্থনা নীরবে মাথা কুটছিল। আমাকে জড়িয়ে ধরো, ভীষণ জোরে। এত জোরে যেন শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। যেন ভেঙে গুঁড়িয়ে যাই আমি।
স্খলিত কণ্ঠে সে জিজ্ঞেস করল, কী গো? তোমার জন্য আমি সব পারি।
আমাকে ডিভোর্স দাও। ক্লিন ডিভোর্স।
তারপর?
কিছুদিন বাপের বাড়ি গিয়ে থাকো।
তারপর?
তারপর আমি তোমাকে নিয়ে কোথাও একসঙ্গে থাকব। কিন্তু স্বামী-স্ত্রী হিসেবে নয়।
একটুও না ভেবে রেমি ধ্রুবর বুকের মধ্যে মাথাখানা ক্লান্তভাবে রেখে বলল, যা বলবে করব, যদি তাতে ভাল হয়।
ভালর জন্য নয়, রেমি। আমি প্রথা ভাঙতে চাই।
কেন যে তুমি এরকম পাগল!
তুমি বম্বে যেয়ো না, রেমি। পারবে না।
কে যেতে চেয়েছে?
গেলেও তুমি সহ্য করতে পারবে না বেশিদিন। আমি তোমাকে জানি।
রেমি মুখ তুলল। ধ্রুব তার সুন্দর টুলটুলে মুখখানার দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর যা সে কদাচিৎ করে তাই করল আজ। খুব নিবিড়ভাবে চুমু খেল রেমিকে। বিছানায় তারা যখন ঘনিষ্ঠ হচ্ছিল তখন ধ্রুব বলল, আর হুইস্কি খেয়ো না।
রেমি বলল, মেয়েটাকে দেখাবে তো! ঠিক?
০৫৭. এরকম বৃষ্টির রূপ
এরকম বৃষ্টির রূপ এক সময়ে ছেলেবেলায় দেখেছিল চপলা। বহুকাল আর দিগদিগন্তব্যাপী পাগল হাওয়ায় বয়ে আসা গভীর বিরামহীন বৃষ্টিপাত দেখেনি সে। সারাদিন কেবল জলের শব্দ। উলটোপালটা জলের শব্দ। পুকুর ছাপিয়ে জল ঢেকে ফেলেছে বাগান, উঠোন, বার-বাড়ির মাঠ। ব্রহ্মপুত্রের চেহারা দেখে শিউরে উঠতে হয়। সুড়কির রাস্তার প্রায় সমান-সমান উঠে এসেছে ব্রহ্মপুত্রের স্রোত, ওপাড়ে শম্ভুগঞ্জে কোনও ডাঙাজমি দেখা যায় না। স্রোত চলেছে দ্রুতগামী রেলগাড়ির মতো, বাগানের গাছপালা অনেকগুলোই শুয়ে পড়েছে প্রবল বৃষ্টির দাপটে। শুধু বার-বাড়ির দুটো কদম গাছ ভরে গেছে ন্যাড়ামাথা ফুলে।
সারাদিন যা কিছু ছোঁয়া যায় তাই যেন ভেজা, সঁাতা, মিয়োনো। না-শুকোনো ভেজা জামাকাপড়ের সোঁদা গন্ধ আসে বারান্দা থেকে। বাতাসটা পর্যন্ত জলে ভরা। দিন-রাত চারদিক থেকে হাজারও ব্যাঙের ডাক শোনা যায়। এই ডাকটি সহ্য করতে পারে না চপলা। কেমন যেন বুকের মধ্যে খা খা করতে থাকে।
আজকাল চপলার বুকের ভিতরেই যত যন্ত্রণা। এই যন্ত্রণার কোনও ব্যাখ্যা নেই। কেমন উদাস লাগে, সারাদিন যেন এক ভারহীন শরীরে সে হাঁটে চলে শোয়।
চপলা আজ স্নান করেনি, প্রথম বর্ষার কাঁচা জলে তার ঠান্ডা লেগেছে। শরীরে একটু জ্বোরো ভাব। একটু শীত জড়িয়ে আছে হাতে-পায়ে। দুপুরে খাওয়ার পর ছেলেমেয়ে নিয়ে মশারির মধ্যে শুয়ে ছিল সে। বাচ্চা দুটো ঘুমিয়ে পড়েছে, চপলার আজকাল খুব সহজে ঘুম আসতে চায় না। এপাশ-ওপাশ করে শরীরে ব্যথা হয়ে গেল।
বৃষ্টির তোড়টা কিছু কমেছে। চপলা উঠে বারান্দায় এসে এলোচুলের রাশিতে আঙুল চালিয়ে জট ছাড়াতে লাগল। বাতাস কমেছে, বৃষ্টিও অনেক কম। তবে এটা সাময়িক। ঘণ্টা খানেক বাদেই হয়তো আবার এক পরত মেঘ চলে আসবে। বিভীষণ বৃষ্টি নামবে তার পর। কয়েকদিন যাবৎ এরকমই হচ্ছে।
চপলা একটা হাই তুলল, এখানে থাকতে তার যে ভাল লাগছে তা নয়। আজকাল এ বাড়ির চাকরবাকর আর কৃষ্ণকান্ত ছাড়া কেউই তার সঙ্গে বড় একটা কথা বলে না। কেন বলে না তার কারণটা বড্ড স্পষ্ট। বড্ড নির্লজ্জ।
কিন্তু এরা কি জানে সেই কুমারী বয়স থেকে যে পিপাসা তার বুকের মধ্যে ছিল তা আজও রয়ে গেছে। কনককান্তি সে পিপাসা মেটাতে পারেনি। সে সাধ্যই তার নেই। সেই আকণ্ঠ পিপাসা নিয়ে যৌবনের এই দামাল দিন পার হচ্ছে সে। কিন্তু পার হওয়া কি সোজা?
শচীন কালও এসেছিল। ভারী উদ্ভ্রান্ত সে। একটু রোগা হয়ে গেছে। চোখের দৃষ্টিতে খ্যাপামির ভাব। একটা ওলট-পালট কিছু করে ফেলতে চায়। চপলার বয়স শচীনের চেয়ে কম, সে উকিলও নয়। তবু অভিজ্ঞতা তার অনেক বেশি। সে জানে, পুরুষের ভালবাসা হল গড়ানে জমি, সেখানে জল দাঁড়ায় না।
তা ছাড়া হুট করে কিছু করলেই তো হল না। পায়ের নীচে শক্ত জমি না থাকলে প্রেম-ট্রেম সব দুদিনেই ভেসে যাবে। চপলা তাই অনেক কবে বুঝিয়েছে কাল শচীনকে, এখুনি কিছু করে বসবেন না, প্লিজ। আর-একটু সময় নিন।
কীসের সময়? আমি যে পাগল হয়ে যাব।
পাগল হতেই তো বারণ করছি।
বারণ করলেই কি হল!
প্লিজ! ওরকম করলে আমি কিন্তু চলে যাব।
