ধ্রুব দরজা ঠেলে ঘরের মধ্যে এসে দাঁড়াল। দরজাটা ভেজিয়ে দিল আবার।
ডাকছ কেন?
আমি বম্বে চলে যাচ্ছি, জানো?–খুব ব্যাকুলভাবে রেমি বলে।
জানলাম।–ধ্রুবর কণ্ঠস্বর ভাবলেশহীন।
কার সঙ্গে জানো?
না তো।
রাজার সঙ্গে।
তাই নাকি?
ভাল হবে না?
ভালই তো।
যেতে দেবে আমাকে?
আমি যেতে দেওয়ার কে? তুমিই তো যাবে।
আঃ, বলোই না যেতে দেবে কি না।
দেব।
সত্যি বলছ?
বলছি।
তোমার একটুও কষ্ট হবে না আমার জন্য?
এখন ঘুমোও।
ঘুম আসছে না যে।
চেষ্টা করো। আমি বাইরে যাচ্ছি।
তা হলে আমি আবার হুইস্কি খাব।
ধ্রুব সামান্য একটু হাসল। তারপর বলল, ভয় দেখাচ্ছ?
না তো! আমি খাব।
খাবে তো কী হয়েছে? অনেকেই খায়। মেয়েরা আজকাল খুব টানছে।
আমি কি তাদের মতো?
হয়ে যাবে। ধীরে ধীরে হয়ে যাবে। তবে একদিনে অত নয়।
বম্বেতে গিয়ে আমরা কী করব জানো?
না।
তুমি যা চেয়েছিলে তাই।
খুব ভাল।
তোমার কিছু যাবে আসবে না?
না। বরং খুশি হব।
রেমি ধ্রুবর মনোভাব জানে। তবু কেমন যেন এই জবাবে সে অবাক হয়ে গেল। বলল, একটা কথা বলবে?
বলব না কেন?
আমার ওপর তোমার এত ঘেন্না কেন? এত ঘেন্না কি একজন মানুষকে আর-একজন করতে পারে?
তোমাকে কখনও ঘেন্না করিনি।
করোনি? তা হলে আমি অন্য একজনের সঙ্গে চলে যাব জেনেও খুশি হও কী করে?
বলেছি তো, আমি তোমাকে ঘেন্না করি না, কিন্তু তোমার দায়িত্ব চিরকাল বইতেও রাজি নই। বিয়ে করার জন্য পুরুষের এক ধরনের যোগ্যতা লাগে। আমার তা নেই।
তবু বিয়ে তো হয়েছে।
না, হয়নি। এটা বিয়ে নয়। চাপিয়ে দেওয়া।
তুমি আমাকে ঘেন্না করো।
না, করি না। কখনও করিনি।
আমাকে তুমি কখনও একটুও ভালবাসোনি।
তাও বাসিনি। ঠিক কথা। কিন্তু আজ নতুন করে এসব কথা কেন? এখন ঘুমোও।
ঘুম কি আসে! কত চিন্তা।
কীসের চিন্তা? জীবনটাকে খেলা হিসেবে নাও। আয়ু কতদিনেরই বা? সব ঠিক হয়ে যাবে। বম্বে ভাল শহর।
আজ রাজা এসেছিল।
জানি।
কী করে জানলে? তোমরা কি সবসময়ে বাড়ির বউ-ঝিদের পিছনে স্পাই লাগিয়ে রাখো?
আমি রাখি না। তবে তোমার গবুচন্দ্র রাখেন।
কে গবুচন্দ্র?
মন্ত্রী গবু, তোমার শ্বশুর।
উনি তো আর মন্ত্রী নন।
না। তবে শোনা যাচ্ছে উনি সেন্ট্রাল মিনিস্টার হবেন। ডেপুটি মন্ত্রী-টন্ত্রী বোধহয়। ফেরোজ লোকদের পথ এ সমাজে সবসময়ে ভোলা।
ফেরেব্বাজ কাকে বলে?
তোমার শ্বশুরের মতো লোকেরাই ফেরোজ। অন্য ডেফিনিশনের দরকার কী?
ওঁর ওপর তোমার রাগ বলেই কি আমাকে যন্ত্রণা দাও এত?
হতে পারে। এখন আমি এত কথা বলতে পারছি না, রেমি। তুমি ঘুমোও। আমি বরং বাতিটা নিবিয়ে দিয়ে যাই।
না, না!–আঁতকে উঠে রেমি বলে, বাতি নিবিয়ো না। তা হলে আমি ভয়েই মরে যাব।
বাতি চোখে লাগছে বলেই বোধহয় ঘুম আসছে না।
ঘুম আসবে। তুমি কাছে থাকো।
এই তো একটু আগে আমাকে চলে যেতে বললে।
তখন বুঝতে পারিনি।
কী বুঝতে পারোনি?
তোমাকে যে আমার ভীষণ দরকার।
কীসের দরকার?
আমি একজনকে একবার দেখতে চাই। দেখাবে?
ধ্রুব অবাক হয়ে বলে, কাকে দেখাব?
তাকে।
সে কে বলবে তো!
যাকে তুমি ভালবাসো। আমি চলে গেলে যাকে বিয়ে করবে। একবার চোখের দেখা দেখব। কিছু বলব না। ভয় নেই।
একথায় ধ্রুবর ফরসা রং টকটকে রাঙা হয়ে গেল। প্রথমটায় সে কিছু বলতে পারল না। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ঘুমোও।
বারবার ঘুমোতে বলছ কেন? বললাম যে ঘুম আসছে না। যদি ঘুম পাড়াতে চাও তবে একটু বিষ-টিষ কিছু এনে দাও। একেবারে ঘুমিয়ে পড়ি।
তা হলে জেগে শুয়ে থাকো। আমি যাই।
তুমি যেয়ো না। বেশিদিন তো আর নয়। আমি বম্বে চলে যাচ্ছি। একটু থাকো।
তুমি বড্ড বাজে বকচ্ছ।
খুব বাজে বকছি? কথাটা সত্যি নয়?
আমি কাউকে বিয়ে করব একথা সত্যি নয়।
তবে কী করবে?
আমি বিয়ে ব্যাপারটাকে বিশ্বাসই করি না।
তবে কীসে করো?
ওটা একটা ছেলেমানুষি প্রথা। মানেই হয় না।
তুমি তাকে বিয়ে করবে না?
না।
তবে একসঙ্গে থাকবে কী করে?
থাকলে দোষ কী?
দুনিয়াটা তো বিয়েহীন সমাজের দিকেই এগোচ্ছে।
কী যে বলো!
তোমার বুঝতে একটু সময় লাগবে, রেমি। বিয়ে একটা অচলায়তন। ওই প্রথা উঠে গেলেই ভাল।
আমি অত তর্ক করতে পাবি না। আমি তাকে একবার দেখব।
এসব তোমাকে কে বলল? রাজা নিশ্চয়ই।
রাজাই।
বলাটা ওর উচিত হয়নি।
কেন? আমি শকড হব বলে?
হ্যাঁ। তুমি আমার ওপর বড় বেশি নির্ভর করতে চাও।
কিন্তু আমি সামলে গেছি। দেখছ না, কেমন স্বাভাবিক।
স্বাভাবিক হলে অতখানি হুইস্কি গিলে বসে থাকতে না।
রেমি মাথা নেড়ে বলে, এসব ভেবে খাইনি। আমার ঘুম আসছিল না, শরীরটা কেমন করছিল, তাই খেয়েছি। আমাকে একবার দেখাতে তোমার ভয় কী?
আমি কাউকে ভয় পাই না।
জানি। মেয়েটা কে বলো তো!
কেউ একজন হবে। অত ভাবছ কেন?
আমার চেয়ে ফরসা?
জানি না।
জানো। বলতে চাও না। বললে দোষ কী? এই তো বললে ভয় পাও না।
তোমার চেয়ে ফরসা নয়।
কেমন দেখতে?
এইসব ভেবেই বোধহয় তোমার ঘুম আসছে না?
মেয়েটাকে কবে দেখাবে গো?
দেখলে কি খুশি হবে? খুশি কি হওয়া যায়?
তা হলে দেখতে চাইছ কেন?
আমার বর কেমন পাত্রী পছন্দ করল, সে আমার চেয়ে কত গুণ সুন্দর এসব জানার কৌতূহল হয় না?
রেমি, ব্যাপারটা খুব সরল অঙ্ক নয়। তুমি বোকা, ঠিক বুঝবেও না। তবে জেনে রেখো, এখনও ধ্রুব চৌধুরী মেয়েবাজ নয়।
তাই কি বলেছি।
তবে অত জেলাস কেন?
জেলাসি বোধহয় আমার একটু হওয়ার কথা।
কেন হবে? তুমিও তো অন্য একজনের সঙ্গে বম্বেতে ঘর বাঁধতে যাচ্ছ।
