প্যাসেজ ধরে একটা লোক আসছে। বগলে গোটানো বিছানা। চাকর। এ বাড়িতে চাকর অনেক। পুরনোদের চেনে ধ্রুব। কিন্তু আজকাল অনেক নতুন রিক্রুট হয়েছে, তাদের নামও ধ্রুব জানে না। এই লোকটাও তাদের দলে। বয়স বেশি নয় ছোরার। ধ্রুবকে দেখে উলটোদিকের দেয়াল ঘেঁষে সভয়ে চলে যাচ্ছিল।
ধ্রুব ডাকল, এই শোনো।
ছেলেটা দাঁড়িয়ে যায়।
জগাদা কোথায় বলো তো?
খাওয়ার ঘরে।
যাও তো, গিয়ে বলল আমি তাড়াতাড়ি আসতে বলেছি।
উনি তো হাসপাতালে যাবেন।
সে কী? হাসপাতালে কেন?
বউদির জন্য?
কেন?
বলছিলেন যদি রক্ত দিতে হয় তাই যাবেন।
ধ্রুব চিন্তিত হয়ে পড়ে। জগাদা নার্সিংহোমে যাচ্ছে, তার মানে কত রাতে ফিরবে বা আদৌ ফিরবে কি না তার ঠিক নেই। কিন্তু একা ঘরে তার পক্ষে থাকা সম্ভব নয়। ধ্রুবর মাথায় চকিতে একটা বুদ্ধি খেলে যায়। সে ছোকরাটাকে বলে, তুমি কোথায় শুতে যাচ্ছ?
আজ্ঞে, ওই পিছন দিককার সিঁড়ির নীচে।
আজ ওখানে শুতে হবে না। তুমি বরং আজ আমার ঘরে শুয়ে পড়ো।
ছেলেটা অবাক হয়। বলে, কিন্তু বাবা আমাকে ওখানেই শুতে বলেছেন।
বাবা! তোমার বাবা কে?
আজ্ঞে শ্রীজগবন্ধু রায়। যাকে আপনি জগাদা বললেন।
জগাদার ছেলে তুমি?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
ধ্রুব হঠাৎ একটু চটে গিয়ে বলে, জগাদার ছেলে হয়ে তুমি এ বাড়িতে চাকরের কাজ করতে ঢুকেছ কেন? আর কাজ পেলে না?
ছেলেটা একটু হকচকিয়ে গিয়ে বলে, আমি আর-এক জায়গাতেও কাজ করি।
কোথায়?
বাবার কোম্পানিতে। বেয়ারা।
কী পাশ করেছ?
হায়ার সেকেন্ডারি।
কোন ডিভিশন পেয়েছিলে?
সেকেন্ড ডিভিশন।
আর পড়োনি কেন?
পড়ছি তো।
পড়ছ?–ধ্রুব অবাক হয়।–কী পড়ছ?
নাইট কলেজে বি কম ক্লাসে ভর্তি হয়েছি।
এ বাড়িতে কী কাজ করতে হয়?
এই ফাইফরমাস।
সম্মানে লাগে না?
ছেলেটা মুশকিলে পড়ে গিয়ে বলে, কিছু অসুবিধে হয় না।
তুমি যে বি কম পড়ছ তা বাড়ির মালিক জানে?
জানে।
তা সত্ত্বেও ফাইফরমাস করে?
ছেলেটা এবার একটু হেসে বলে, বাবাও তো এ বাড়িতে কাজটাজ করে। তাই আমিও করি।
আর অফিসে যে বেয়ারার চাকরি করে সেটা কেমন লাগে করতে?
খারাপ লাগে না। খাটুনি তত বেশি নয়। আমি পড়ার বই নিয়ে যাই, অফিসে বসে পড়ি।
ধ্রুবর একটু ক্লান্তি লাগে।
জগাদার এই ছেলেটিকে সে কখনও দেখেনি। ছেলেটা জীবনের মোড় ফেরানোর জন্য জানপ্রাণ দিয়ে লড়ছে। নিজের শ্রেণিকে ছাড়িয়ে উচ্চতর শ্রেণিতে প্রবেশের ছাড়পত্র একদিন পেয়ে যাবেই। কিন্তু এত পরিশ্রম এরা করে কী করে? দিনে বেয়ারা, সকালে বিকেলে বাড়ির চাকর আর রাত্রে কলেজের পড়ুয়া। আরেব্বাস!
ধ্রুব একটু হেসে বলল, তুমি আজ আমার ঘরেই শোও। আমি জগাদাকে বলে দিচ্ছি। আমার শরীরটা আজ ভাল নেই, ঘরে একজন লোক থাকা দরকার।
ছেলেটা একথায় মাথা নেড়ে রাজি হয়ে গেল।
ধ্রুব দরজা খুলে ভিতরে ঢুকল। পিছনে ছেলেটি, সসঙ্কোচে।
ওই কোণের দিকে বিছানাটা পেতে নাও। মশারি আছে?
আছে।
আমি জগাদাকে বলে দিয়ে আসছি।
ছেলেটা বিছানাটা কাঠের আলমারির সামনে নামিয়ে রেখে বলল, আপনাকে যেতে হবে না, আমিই বাবাকে বলে আসছি। বাবা বলেছিলেন, দরকার হলে আমাকেও রক্ত দিতে যেতে হবে।
দরকারের সময় যদি আমাকে খুঁজে না পান তা হলে রেগে যাবেন!
ধ্রুব বিছানায় বসে নিজের কপাল চেপে ধরল। মাথা নেড়ে অস্ফুট গলায় বলল, আচ্ছা।
ছেলেটা যাওয়ার সময় সাবধানে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে গেল।
ধ্রুব নিজের হাতঘড়িটা দেখল। বারোটা বেজে চল্লিশ মিনিট। এতক্ষণে কি রেমিকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গেছে? বোধ হয়। না, রেমির জন্য তার কিছু করার নেই। তাকে কেউ কিছু করতে বলছে না। এমনকী রক্ত দেওয়ার জন্য বাড়ির কাজের লোকদের প্রস্তুত রাখা হচ্ছে, তাকে নয়। তার রক্ত বোধ হয় অশুচি।
খুবই দুঃখ হতে লাগল ধ্ৰুবর। আসলে নেশাটা আধখাচড়া হলেই তার দুঃখ-টুঃখ উথলে ওঠে। সে ভেবে দেখল, রেমির জন্যই শুধু নয়, পৃথিবীর কারও জন্যই তার কিছু করার নেই।
একটা মশা ডান পায়ের গোড়ালিতে কামড়াল। বসে বসে একটু ঢুলুনি এসেছিল ধ্রুবর, মশার কামড়ে চমকে উঠল। না, ছেলেটা এখনও আসেনি। বিছানাটা তেমনি গোটানো অবস্থায় পড়ে আছে।
এ বাড়িতে আগে মশা ছিল না। আজকাল হয়েছে। কিন্তু ধ্রুব নিজের মশারিটা টাঙানোর কথা ভাবল না। প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেট আর দেশলাই বের করে টেবিলে রেখেছিল। প্যাকেটটা তুলে নিয়ে একটা সিগারেট ধরায় সে। ঘুম আসবে না। বড় শীত করছে।
দরজাটা আস্তে আস্তে খুলে যাচ্ছে না? ধ্রুব স্থির হয়ে গেল। খুব জোরে রেলগাড়ি দৌড়তে লাগল বুকের মধ্যে।
হ্যাঁ, দরজাটা খুলে যাচ্ছে একটু একটু করে। কোনও দরজাই এত রহস্যময়ভাবে খোলা উচিত নয়। কোনও অশরীরী, কোনও অচিন বাতাস কি খুলছে দরজা?
কে?–বলে বিকট একটা চিৎকার করে ওঠে ধ্রুব।
দরজাটার ফাঁক হওয়াটা থেমে যায়। মৃদু মোলায়েম একটা মিয়াও আওয়াজ ক্ষীণ এসে পৌঁছয় ধ্রুবর কানে।
আশ্চর্য! সাদা আর বাদামিতে মেশানো সেই কাবলে বেড়ালটা না? রেমির বেড়াল। এটাকে কোনওকালে দুচক্ষে দেখতে পারে না ধ্রুব, কী চায় বেড়ালটা? এ ঘরে তো কখনও আসে না!
ধ্রুব বিস্ফারিত চোখে চেয়ে ছিল। মনের মধ্যে অনেক উলটোপালটা যুক্তিহীন কার্যকারণ কাজ করে যাচ্ছে। রেমির বেড়াল কখনও এ ঘরে আসে না, কিন্তু আজ এল কেন? এর মানে কি কোনও অশুভ ইঙ্গিত? না কি বেড়ালটি মৃতপ্রায় রেমির প্রতিনিধি হয়ে কিছু বলতে এসেছে তাকে?
