আমার বুক কাঁপিয়া উঠিল। খোঁজ খবর করিতে গেলে অবোধ ও অবুঝ কিশোরীটি ধরা পড়িয়া যাইবে যে! তাহাকে রক্ষা করিবার একটা ব্যাকুল আগ্রহ বোধ করিতে লাগিলাম।
মাথা নাড়িয়া কহিলাম, সুনু, এরকম চিঠি আমাকে কেউ লিখতে পারে বলে আমার মনে হয় না। কোথাও একটা গোলমাল হয়েছে। মনে হয় কেউ ভুল করে রেখে গেছে বা বাচ্চারা কেউ কুড়িয়ে এনে রেখেছে। এটা নিয়ে শোরগোল না করাই ভাল।
সুনয়নী একটু সরল প্রকৃতির ছিল। সম্ভবত একটু ভালমানুষ গোছের। সে আমার স্ত্রী হইলেও তাহাকে খুব গভীরভাবে মনোযোগ দিয়া কখনও লক্ষ করি নাই। বিবাহবাসরে প্রথম তাহার মুখখানা দেখিয়া মনে হইয়াছিল, বাঃ, বেশ তো! ব্যস, আমার রূপমুগ্ধতার ওইখানেই শেষ। এই নিস্পৃহতা আমাকে কেউ চেষ্টা করিয়া অর্জন করিতে হয় নাই। আমার স্বভাবে ইহা ছিলই। তাই সুনয়নীর সহিত শারীরিকভাবে এতদিন ঘনিষ্ঠ বসবাসের পরও সে কখনওই আমার হৃদয় জুড়িয়া বসে নাই। বোধহয় ইহা একপ্রকার ভালই।
সুনয়নী আরও কিছুক্ষণ অশ্রুবিসর্জন করিল। অজানা পত্ৰলেখিকার উদ্দেশে কিছু গালি ও অভিশাপ বর্ষণ করিল। তারপর চিঠিটি কুটিকুটি করিয়া ছিড়িয়া ফেলিল। তারপব আমার দিকে হাত বাড়াইয়া বলিল, এসো, আমাকে অনেক আদর করো।
সেই কামনার আহ্বানে সাড়া দিলাম বটে, কিন্তু মনটা কেমন আড় হইয়া রহিল। শরীরের মিলনে মন নাচিয়া উঠিল না। এক অজানা স্পন্দনে আজ আমার হৃৎপিণ্ড আন্দোলিত হইতেছে। কিছু ভয়, কিছু চোরা আনন্দ, কিছু শিহরন আমি টের পাইতেছিলাম, যাহা দৈনন্দিন নহে, স্বাভাবিক নহে।
পরদিন সেই কিশোরীকে খুঁজিয়া বাহির করিলাম। কথাটা যত সহজে বলা গেল, কাজটা তত সহজ হয় নাই। কিশোরীটি সর্বদাই আমাদের বাড়ির সর্বত্র ঘুরিয়া বেড়ায়। পরনে আধময়লা শাড়ি, নগ্ন পদ, চুল ঝুটি করিয়া বাঁধা। তাহাকে খুঁজিতে হয় না। কিছুক্ষণ পরপরই তাহাকে দেখা যায়। আমি তাহাকে এইভাবে সকলের সামনে কিছু প্রশ্ন করিতে সাহস পাইলাম না। লোকের সন্দেহ হইতে পারে। তাই আমি তক্কেতকে রহিলাম। বার-বাড়ি হইতে খেলা সারিয়া দ্বিপ্রহরের দিকে সে নদীর ঘাটে চলিল। আমি আড়াল হইতে চোখ রাখিতেছিলাম।
নদীর ধারে সারা বছরই উলটানো নৌকা কিছু পড়িয়া থাকে। মেরামতির জন্য। অনেকগুলি আবার ঠেকনো সহযোগে ঈষৎ উঁচুতে তোলা। এগুলির অভ্যন্তর ছায়াময় এবং গৃহসদৃশ। বালক-বালিকারা এইসব নৌকার নীচে দিব্য খেলার সংসার পাতিয়া বসে।
আমার সেই কিশোরীটি এইরূপ একটি নৌকার ছায়ায় বসিয়া উদাস দৃষ্টিতে ব্রহ্মপুত্রের ঢেউ দেখিতেছিল। সেইখানে, সেই নির্জনতাতেও তাহার মুখোমুখি হইতে কেমন যেন সাহস হইতেছিল
না। মনে হইতেছিল, কী এক অসামাজিক কাণ্ড করিতে চলিয়াছি।
যাহা হউক অবশেষে সাহস সংগ্রহ করিলাম এবং সেই নৌকার কাছে গিয়া সবেগে গলা খাঁকারি দিলাম।
কিশোরীটি অপাঙ্গে একবার আমাকে চাহিয়া দেখিল। কিন্তু যেরূপ অপ্রত্যাশিত ছিল সেরূপ কিছুই ঘটিল না। শশব্যস্তে উঠিয়া বসিবে, সলজ্জ অবনত দৃষ্টিতে জড়োসড়ো হইবে, সেরূপ কিছুই না।
বলিল, তুমি কি আমাকে বকবে?
এমনভাবে বলিল যেন বকাঝকা সে বড় গ্রাহ্য করে না। বকিলে বকিতে পারো, তোমারই শ্রম।
আমি বলিলাম, চিঠিটা কি তুমি লিখেছিলে?
আমি ছাড়া আর কে?
কেন লিখলে?
আমার ইচ্ছে।
ইচ্ছে মানুষের নানারকম হয়, তা বলে কি ইচ্ছেমতো চলা উচিত?
তুমি আমার বাবাকে কী বলেছ?
কী বলেছি?
তুমি বাবাকে জিজ্ঞেস করেনি আমি পাগল কি না?
করেছি।
তুমি কি আমাকে পাগল ভাবো?
ঠিক তা নয়। তবে তোমার কিছু আচরণ স্বাভাবিক নয়।
বেশ তো, আমি না হয় পাগল। পাগলেরা অনেক কিছু করে, কী করবে?
কিছু করব বলিনি তো।
করো না! আমিও যা খুশি করব।
আমার ওপর তোমার এত রাগ কেন?
তুমি ওর সঙ্গে থাকো কেন?
ও মানে কে? সুনয়নী?
হ্যাঁ।
ও যে আমার বিবাহিতা স্ত্রী।
কিশোরী এবার ডগডগে চোখ দুইটি সম্পূর্ণ মেলিয়া আমার চোখে স্থাপন করিল, সেই দৃষ্টি এতই তীব্র যে সহিতে পারিতেছিলাম না। এক তীব্র জ্বালা ও উত্তাপ যেন আমাকে স্পর্শ করিতেছিল।
কিশোরী হঠাৎ চক্ষু নত করিয়া কহিল, তুমি কি আমাকে মরতে বলো?
ও কী কথা! মরতে বলব কেন?
আমি মরতে পারি। তাতে যদি তোমাদের শান্তি হয়।
ওকথা বলবেও না, ভাববেও না।
তা হলে কী করব?
দয়া করে শোওয়ার ঘরে উঁকি দিয়ো না, আর চিঠিও লিখো না।
কেন? আমার যে ইচ্ছে করে।
বললাম যে সবসময় ইচ্ছেমতো চলতে নেই। ধরা পড়ে যাবে।
ধরা পড়লে পড়ব।
না। ধরা পড়লে তোমার নিন্দে হবে।
হোক না নিন্দে। তোমাকে জড়িয়েই তো হবে।
সেটা কি ভাল হবে?
হবে। তোমার সঙ্গে জড়িয়ে আমার নিন্দে হলে আমি খুশি হই।
আমি স্তম্ভিত হইয়া গেলাম। এই পাগলিনীকে কে কীই বা বুঝাইতে পারিবে? রাগ করিয়া লাভ নাই। এই উন্মাদিনী যে-কোনও পরিণতির জন্যই প্রস্তুত। ইহার ভয় বলিয়া কিছু নাই। লজ্জা নাই। ঘৃণা নাই। মেয়েদের বয়ঃসন্ধির প্রেম কি এরকমই ভয়ানক?
অগত্যা অন্য পন্থা ধরিতে হইল।
কহিলাম, আমাকে কি তুমি ভালবাসো?
কী আশ্চর্য! এত কথায় ইহাকে বাগে আনিতে পারি নাই। কিন্তু ভালবাসা কথাটি উচ্চারণ করা মাত্র যেন জেঁকের মুখে লবণ পড়িল। আচমকা তাহার শ্যামলা রঙে রক্তোচ্ছাস দেখা দিল। চক্ষু নত।
সে জবাব দিল না। কিন্তু একটু পরেই দেখিলাম, সে হাতের পিঠ দিয়া চোখ মুছিতেছে।
কাঁদছ কেন? —আমি সস্নেহে প্রশ্ন করিলাম।
