তুমি যাও।
কেন বলো তো!
আমি আর চিঠি দেব না। উঁকিও মারব না।
ঠিক তো!
ঠিক।
মরার কথাও ভাববে না তো!
মরব। আজই মরব।
আমি আত্মসংবরণ করিতে পারিলাম না। হাত বাড়াইয়া তাহার একটি হাত সবলে চাপিয়া ধরিয়া কহিলাম, বেয়াদবি করবে তো এক্ষুনি নিয়ে গিয়ে তালাবন্ধ করে রাখব।
সে হাত ছাড়াইয়া লইল। তারপর বলিল, এখানে কেন এসেছ?
তোমাকে শাসন করতে।
সবাই দেখছে।
এখানে কে দেখবে?
বাড়ির ছাদ থেকে দেখা যায়। নদীর ঘাট থেকেও। তুমি যাও।
আমি বলিলাম, তোমাকে নিয়েই যাব। চলো।
আমি যাব না।
আমি কোমল কণ্ঠে কহিলাম, লক্ষ্মী সোনা, এরকম করে না। চলো। আমাকে কষ্ট দিয়ে তোমার কী লাভ?
তোমার আবার কষ্ট কীসের? সুন্দর বউ পেয়েছ।
বউ সুন্দর হলে বুঝি আর কারও কোনও কষ্ট থাকে না?
তাই তো।
কিন্তু আমি কষ্ট পাচ্ছি।–বলিয়া হাসিলাম। বলিলাম, তোমার জন্য।
পাগলিনী বলিল, তুমি ওকে বিয়ে করলে কেন?
আমি হাসিব না কাঁদিব ভাবিয়া না পাইয়া কহিলাম, আমি যখন সুনয়নীকে বিয়ে করি তখন তুমি তত এইটুকু খুকি।
এইবার সে হাসিল। হঠাৎ বলিল, নইলে কি আমাকে করতে?
আমি আমূল লজ্জা পাইয়া বলিলাম, ওসব কথা থাক।
থাকবে কেন? কান ভরে শুনে নিই। আমি তো আজ মরবই। বলো।
আমি বিব্রত ও হতচকিত হইয়া কহিলাম, বোধহয় তোমাকেই করতাম। এখন চলো।
আমার যা শুনবার শোনা হয়ে গেছে। এখন তুমি যাও। আমি জলে ঝাঁপ দেব।
সর্বনাশ!
যারা সাঁতার জানে তারা মরে না। আমি স্নান করব।
তটস্থ হইয়া কহিলাম, অন্য কোনও মতলব নেই তো!
না। তুমি যাও।
চলিয়া আসিলাম। মনটা বড় ভারাক্রান্ত। জীবনে নতুন একটি অপ্রত্যাশিত দিক হইতে যেন একটি আলোর রেখা আসিয়া পড়িয়াছে। কিন্তু সেই আলো আমাকে উজ্জ্বল করে নাই। বিষয় করিয়াছে।
এই কিশোরী কন্যাটির ভবিষ্যৎ কী? আমিই বা কী করিব?
সেইদিন রাত্রে সুনয়নী বলিল, চিঠিটা নিয়ে আমি খোঁজখবর করেছি।
বুক কাপিয়া উঠিল। বলিলাম, ও, তা কী জানলে?
ঝি-চাকররা কেউ কিছু বলতে পারছে না। তবে—
তবে আবার কী?
থাক গে। তোমার শুনে কাজ নেই।
বলিয়া সুনয়নী হঠাৎ আমাকে জড়াইয়া ধরিয়া হি হি কবিয়া হাসিতে লাগিল।
কী হল?
তোমার দিকেও তা হলে মেয়েরা নজর দেয়?
আমি বলিলাম, না না।
শোনো, আমি বরং খুশিই হয়েছি।
তার মানে?
অনেক ভেবেচিন্তে দেখলাম, তুমি তো একদম সাধু মানুষ। ন্যালাখ্যাপা গোছের। মেয়েরা তোমাকে বরং এড়িয়েই চলে। একটা মেয়ে যে নজর দিয়েছে তাতেই বোঝা যায় তার চোখ আছে।
এই কথায় খুশি হওয়া উচিত, না রাগ করা উচিত, তাহা বুঝিতে পারিলাম না। চুপ করিয়া রহিলাম।
সুনয়নী বলিল, রাগ করলে?
না তো!
চিঠিটা পেয়ে তুমি একটু খুশিই হয়েছ, না?
না। চিঠিটা আমাকে লেখা কি না তাই তো জানি না।
তোমাকেই গো, আর সাধু সেজো না।
সন্দেহ আছে।
আমাকে কেন ডাইনি বলল বলো তো।
বলুক না, কথায় তো ট্যাকস নেই।
আমি কিন্তু খুব ভেবেছি।
কী ভাবলে?
আমাকে ডাইনি কেন বলল? হিংসে থেকে।
দূর! ওসব ভেবো না।
আমার খুব ইচ্ছে করে মেয়েটার সঙ্গে আলাপ করি।
আবার ভাবছ?
খুব ভাবছি। ঠিক ওকে খুঁজে বের করব দেখো।
কী দরকার?
বললাম যে, তোমাকে সে ভালবাসুক তাতে ক্ষতি তো নেই। কিন্তু আমি ওর কী ক্ষতি করেছি?
আমি হাই তুলিলাম।
ওকে পেলে খুব সাজাব। কনের মতো। নিজেও সাজব। তারপর আয়নায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দেখব কে বেশি সুন্দর। যদি আমি হারি—
আঃ সুনয়নী!
সুনয়নী আজ বড় প্রগম্ভ। আকুলভাবে আমাকে আলিঙ্গন করিয়া কহিল, আমার সঙ্গে ও পারবে না।
কে পারবে না?
ও। রূপের পাল্লায় হেরে যাবে। দেখো।
কী যে হল তোমার!
আজ আমাকে একটু আদর করো। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।
০৫৬. হাতে-পায়ে খিল ধরল রেমির
হাতে-পায়ে খিল ধরল রেমির। এত দুর্বল লাগছে শরীর যে, রাজা চলে যাওয়ার পর সে আবার শুয়ে পড়ল। অবেলায় খেয়েছে বলেই কি? বুকে বায়ুজনিত একটা চাপ, ব্যথা। একটু জল খেলে হত। কিন্তু উঠতে ইচ্ছে করছে না। কিছু করতে ইচ্ছে করছে না।
কথাটা ধ্রুবকে কি জানাবে? সে যে রাজার সঙ্গে বম্বে চলে যাচ্ছে একথাটা কি জানানো উচিত নয়?
না। তাই কি হয়! একটু আগেই তো সে ভেবেছিল ধ্রুবকে ছেড়ে খুব দূরে কোথাও তার চলে যাওয়া দরকার। তবে জানাবে কেন? তা ছাড়া ধ্রুবর তো আর-একজন বউ হবে। সে কি খুব সুন্দরী? খুব?
ঘুম পাচ্ছে, কিন্তু ঘুম আসছে না। ভারী অদ্ভুত অবস্থা। চোখের পাতা ভারী, হাই উঠছে বারবার। মাথায় ঝিমঝিমুনি, তবু স্নায়ুগুলি এত টান-টান স্পর্শকাতর যে সামান্য শব্দে, সামান্য অনুভূতিতে চমকে উঠছে। চটকা ভেঙে যাচ্ছে বারবার। সে কি কারও জন্য অপেক্ষা করছে মনে মনে? কার জন্য? একটু ভেবে দেখল রেমি। না তো! সে কারও অপেক্ষা করছে না। কেউ তো আসার নেই। তবে?
সন্ধের মুখে দরজায় ঠক ঠক। উঠতে ইচ্ছে করল না রেমির। শুধু জিজ্ঞেস করল, কে? কী চাও? বউদিমণি, আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে?
না। তবে টায়ার্ড লাগছে। কেন?
বড়বাবু জিজ্ঞেস করতে পাঠালেন।
বলল গিয়ে একটু পরে যাব।
না গেলেও চলবে। বড়বাবু বেরিয়ে যাচ্ছেন। শুধু জানতে পাঠালেন।
আচ্ছা। বোলো আমি টায়ার্ড।
রেমি চুপ করে পড়ে রইল। তার শ্বশুর বড় বেশি বিচক্ষণ। আর বিচক্ষণ বলেই রাজা যখন এই ঘরে ছিল তখন বাইরে মোতায়েন রেখেছিলেন জগাকে। ঘটনাটা ঘোট, কিন্তু মনে থাকবে রেমির। এতটা না করলেও উনি পারতেন। হয়তো রেমির ভালর জন্যই করেন। তবু আজ ব্যাপারটা ভারী দৃষ্টিকটু লেগেছে রেমির। এই পাহারা অনাবশ্যক। এই বাড়ির সঙ্গে তার সম্পর্ক এখন ছিড়বার মুখে।
