কঠিন পুরুষদের বোধহয় থাকেও না, না?
কে জানে। রাজার গলায় স্পষ্টই উদাসীনতা।
রেমি একটু বিষণ্ণ হেসে বলল, বরাবর ও আমাকে অন্য পুরুষের দিকে ঠেলে দেয়। নিজের বউকে কেউ পারে? বলো?
সেটা এতদিনে তোমার বোঝা উচিত ছিল।
কিন্তু একটা জিনিস ছিল। অন্য কোনও মেয়ের প্রতি দুর্বলতা ছিল না।
এখন হয়েছে।
মেয়েটাকে একটু দেখাবে? আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করে সে কেমন মেয়ে।
রাজা উঠে দাঁড়াল। বলল, দেখাতে পারব কি না জানি না। চেষ্টা করব।
নিশ্চয়ই খুব সুন্দর, তাই না!
সুন্দর কি না তা দেখার চোখ কি কুট্টিদার আছে? থাকলে তোমাকেই দেখতে পেত।
আমি আর কী এমন সুন্দর!
সুন্দর নও!
বলে রাজা আচমকা—ভীষণ আচমকা হাত বাড়িয়ে খামচে ধরে রেমিকে টেনে আনল নিজের কাছে। কয়েক মুহূর্তের বিভ্রম, সম্মোহন, প্রলয়।
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার বাইরে অনুচ্চ গলা খাঁকারির একটা শব্দ পাওয়া গেল। দরজায় মৃদু একটু করাঘাত।
রেমি ছাড়ানোর চেষ্টা করেনি নিজেকে। গায়ে শক্তি নেই। মন অবশ। রাজা নিজেই তাকে বিছানায় বসিয়ে দিল। তারপর গিয়ে দরজা খুলল।
চৌকাঠে দাঁড়িয়ে জগা।
কী চাও, জগাদা?
বউদি খেয়েছে কি না জানতে এলাম।
খেয়েছে।
ঠিক আছে, তোমরা গল্প করো।
জগা দরজাটা আবার টেনে দিয়ে গেল।
রাজা চাপা গরগরে গলায় বলে, স্পাই! স্পাই!
রেমি একটুও উত্তেজিত হল না। মৃদু স্বরে বলল, সব সময়েই কেউ না কেউ আমাকে পাহারা দেয়, তাই না?
আর তুমি সেটা সহ্য করো। কেন করো, রেমি?
রেমি মাথা নেড়ে বলল, আর করব না। আমাকে খুব দূরে নিয়ে যেতে পারবে?
কেন পারব না?
কোথায়?
বোম্বে।
বোম্বে? সেখানে কী?
আমি কলকাতা ছেড়ে দেব। বোম্বের ফিল্ড অনেক ভাল।
রেমি একটা যেন স্বস্তির শ্বাস ফেলে বলল, ঠিক আছে।
প্রমিস, রেমি?
রেমি হাসে, প্রমিস আবার কেন? কথাটা বিশ্বাস হচ্ছে না?
হচ্ছে। তবু তোমার ওপর থেকে ধ্রুব চৌধুরীর সব হিপনোটিজম এখনও কাটেনি হয়তো।
কেটে গেছে। যাওয়ার আগে আমি শুধু সেই মেয়েটাকে একবার দেখে যেতে চাই।
কুট্টিদার প্রেমিকাকে?
হ্যাঁ। তাকে একবার চোখের দেখা না দেখে পারব না।
০৫৫. স্ত্রী চরিত্র কতদূর রহস্যময়
স্ত্রীলোক লইয়া আমার জীবনে কোনওরূপ সমস্যা ছিল না। তাই স্ত্রী চরিত্র কতদূর রহস্যময় তাহা লইয়া ভাবিবারও অবকাশ হয় নাই। অল্প বয়সে সুনয়নীর সহিত বিবাহ হইয়া গেল। সুনয়নী যথেষ্ট সুন্দরী। দাম্পত্যজীবনে আমাদের দ্বন্দ্ব ছিল না। স্ত্রীলোক লইয়া কাজেই আমার আর শিরঃপীড়ার কারণ নাই।
কিন্তু স্ত্রীলোকেরা আমাকে সুখে থাকিতে দিবে কেন?
সেই কিশোরীর কাঠচাপা গাছ হইতে পতিত হওয়া এবং আমার সহিত কিছু অদ্ভুত বাক্যবিনিময় ঘটিবার পর একদিন লক্ষ করিলাম, সুনয়নী যেন গম্ভীর। কথা কহিতেছে না, চোখে চোখ রাখিতেছে, দেখা হইলেই মুখ ফিরাইয়া লইতেছে। রাত্রে শয্যায় সে অন্য দিকে পাশ ফিরিয়া ঘুমের ভান করিয়া নিশ্চুপ জাগিয়া থাকিতেছে, তাহাও টের পাইতাম। তবে অভিমান ভাঙাইবার অভ্যাস বিশেষ নাই বলিয়া আমি ঘটনাটিকে উপেক্ষা করিতে লাগিলাম।
কিন্তু নিশ্চেষ্ট থাকিব এমন উপায় কী?
একদিন ঘোর রাত্রে অনুভব করিনাম, সুনয়নী কাঁদতেছে। গুমরানো কান্না। খুব গভীর বেদনা হইতে উঠিয়া আসিতেছে। কান্না আমি সহিতে পারি না।
উঠিয়া তাহার গায়ে হাত রাখিয়ে বলিলাম, কী হয়েছে সুনু?
সে জবাব দিল না।
আরও কয়েকবার প্রশ্ন করিলাম। জোর করিয়া তাহার মুখ আমার দিকে ফিরাইবার চেষ্টা করিলাম। তেমন জোর করি নাই নিশ্চয়ই। সে মুখ ফিরাইল না।
আমি হাল ছাড়িয়া উঠিয়া পড়িলাম। পাশে শুইয়া কেহ কাঁদলে ঘুম হওয়া সম্ভব নহে! সেজবাতিটির পলিতা বাড়াইয়া একখানি কাব্যগ্রন্থ খুলিয়া বসিলাম।
অল্প পরেই সুনয়নী উঠিল। এলোচুল খোঁপা করিল। চোখ মুছিল। তারপর বলিল, তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।
বিরক্ত হইয়া বলিলাম, কথা আছে তো বললেই পারতে। কেঁদেকেটে ওরকম হয়রান হচ্ছ কেন?
সুনয়নী বলিল, কাঁদি কি আর সাধে?
কান্না আমি সইতে পারি না তুমি তো জানো!
কেঁদে উপায় কী বলো! মেয়েদের সবচেয়ে যেটা জোরের জায়গা সেখানেই যদি কেউ হাত দেয় তা হলে কী করব?
আমি না বুঝিয়া হাঁ করিয়া চাহিয়া থাকিয়া বলিলাম, ও আবার কী কথা? কী হয়েছে বলে তো!
সুনয়নী তাহার বালিশের তলা হইতে একখানি ভঁজ করা কাগজ বাহির করিয়া আমার হাতে দিয়া কহিল, পরশুদিন তোমার টেবিলের ওপর পেয়েছি। পড়ো।
খুলিয়া দেখিলাম গোটা-গোটা সুহাদ অক্ষরে লেখা, ও ডাইনি, ওকে যদি কখনও আর আদর করো তা হলে আমি মরব।
সম্বোধন নাই, ইতি নাই। শুধু এই কয়েকটি কথা। কে লিখিয়াছে সে সম্পর্কে আমার মনে সন্দেহ নাই। বুকটা একটু দুরুদুরু করিয়া উঠিল। সুনয়নীর চোখে চোখ রাখিতে পারিলাম না। বড় গ্লানি বোধ করিতেছিলাম। এ সেই উন্মাদিনী কিশোরীর কাজ।
কিন্তু সুনয়নীকে কথাটা বলা যায় না। কাজেই আমাকে মিথ্যাচার করিতে হইল। বলিলাম, এটা কে লিখেছে?
কী করে বলব?
এটার অর্থই বা কী?
অর্থ তো পরিষ্কার। আমি ডাইনি আর তুমি দেবদূত।
আমি মাথা নাড়িয়া কহিলাম, এ চিঠি যে আমাদের উদ্দেশেই লেখা এমন কোনও কথা নেই।
তা হলে তোমার টেবিলে রেখে গেল কেন?
সেইটেই বুঝতে পারছি না। কিন্তু এটা নিয়ে এত উত্তেজিত হওয়ারও কিছু নেই।
নেই? বেশ কথা তো! যে খুশি যা খুশি লিখে রেখে যাবে আর আমি সহ্য করব?
তা হলে কী করবে?
সেটা তুমি বলে দাও। চিঠিটা কে রেখে গেছে সেটা খুঁজে বের করতে হবে।
