রেমি একটা করুণ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, আমি সত্যিই বোকা।
কেন বলো তো!
আমার ধারণা ছিল, তোমার কুট্টিদা বোধহয় কখনও কোনও মেয়ের দিকে মনোযোগ দেয়নি।
এ ধারণা কী করে হল?
কী জানি কী করে! তবে আমি এ বিষয়ে এত নিশ্চিন্ত ছিলাম যে কখনও জানতেও চাই নি।
কুট্টিদার মতো সুপুরুষ আর স্মার্ট ছেলেদের প্রেম না হওয়াই তো আশ্চর্যের বিষয়।
সে আমি জানি। তবে মনে করতাম, মেয়েরা গন্ডায়-গন্ডায় ওর প্রেমে পড়লেও ও কখনও কারও প্রেমে পড়েনি। মেয়েদের সম্পর্কে এত উদাসীন।
ভুল ধারণা।
এ মেয়েটা কে জানো না তাহলে?
না। তবে খোঁজ নেব।
রেমি মাথা নেড়ে বলে, থাক গে, নিয়ো না।
কেন?
আমার তেমন ভাল লাগবে না জেনে। থাক গে।
তোমাকে আর-একটা কথা বলব।
কী গো?
দুটো মস্ত মস্ত লোক টেবিলের দুধারে বসে খুঁটি চালছে। এ ওকে মাত করার চেষ্টা করছে, ও একে। আমরা দুজন দুই খুঁটি। এটা বুঝতে পারছ?
তো! বুঝবার চেষ্টা করো। তুমি বা আমি দুজনের কেউই এ খেলায় কোনও ইমপরট্যান্ট ফ্যাক্টর নই। চাল দেওয়ার জন্য আমাদের কাজে লাগানো হচ্ছে মাত্র। এবার বুঝতে পারছ?
রেমি মৃদু একটু হেসে বলল, বেশ কথা বলো তুমি। শোনো, অবেলায় খেয়ে শরীরটা আইঢাই করছে। আমি একটু আধশোয়া হয়ে তোমার কথা শুনি? কিছু মনে কোরো না।
আরে না। শোও। আমি যাই।
তুমি যে কথাটা শেষ করোনি। শেষ করো আগে।
বলছিলাম দুজনের মাঝখানে পড়ে অকারণে কষ্ট পাচ্ছ কেন?
কী করব?
বেরিয়ে এসো।
তারপর?
তারপর আমি আছি।
তুমি!–আধশোয়া রেমি ফের উঠে বসে, আবার সেই কথা।
কথাটা কি খারাপ? অন্যায়?
তা বলিনি। বললাম যে তোমাকে-আমাকে নিয়েই এত গণ্ডগোল। আবার তো গণ্ডগোল লাগবে।
না রেমি, আসলে তুমি বাইরের গণ্ডগোলকে তেমন ভয় পাও না। তোমার মনটা এক জায়গায়। আটকে গেছে। নানা সংস্কার কাজ করছে। কিন্তু লাভ নেই। কুট্টিদা কোনওদিনই বোধ হয়–
কথাটা শেষ করল না রাজা। ভদ্রতাবশে।
কিন্তু রেমি মনে মনে বাক্যটা পূরণ করে নিল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, আজও একটু আগে দূরে কোথাও চলে যাওয়ার কথা ভাবছিলাম। খুব ভাবছিলাম। আমার বোধ হয় ওর কাছ থেকে একটু দূরে থাকা দরকার।
ফর দি টাইম বিয়িং? তাতে লাভ নেই। চি
রকাল দূরে থাকব?
ভেবে দেখো।
ভেবেছি। চিরকাল দূরে থাকতে হলে মরতে হয়।
ওঃ বাবা। তাহলে আমার প্রস্তাব ফিরিয়ে নিচ্ছি। আর যাই করো, মরো না।
আমি মরলে খুব ক্ষতি হবে?
আর কারও না হোক আমার হবে। ভীষণ ক্ষতি হবে।
কেন? আমি তো তোমাকে কিছুই দিইনি।
দাওনি। সবাই কি দেওয়ার প্রত্যাশা করে?
বালিকার মতো সরল অকপট গলায় রেমি বলে, তুমি আমাকে ভালবাসো তা আমি খুব গভীরভাবে টের পাই। এত ভালবাসলে কেন?
এসব তো পুরনো কথা। জবাব চাও কেন?
জবাব চাইনি তো! শুধু প্রশ্ন করলাম। আমাকে কী করতে বলো তুমি এখন?
কুট্টিদার ওপর তোমার মোহ কবে কাটবে?
মোহ কি আর আছে? বুঝতে পারছি না। বোধ হয় কেটেই গেছে।
তাহলে এবার থেকে আমার কথা একটু মনে কোরো রোজ।
মনে করি তো! রোজ তোমাকে ভাবি। ভাবতে ভাল লাগে।
বানিয়ে বলছ না তো!
আমি বানাতে জানিই না।
তাহলে, শোনো। কুট্টিদা আজ গদাধরের আড্ডায় তোমাকে নিয়ে গিয়েছিল আমার হাতে তুলে দেওয়ার জন্য।
জানি। কাল সারা রাত এসব কথাই বলেছে। ও কি জেলাস?
না, মোটেই নয়। তুমি চলে গেলে ওর কিছু যায় আসে না।
তাই হবে।
এই ঘটনার পরও ওর সঙ্গে বসবাস করতে তোমার অপমান লাগবে না?
ভীষণ অপমান লাগছে। বড় জ্বালা। বড় ঘেন্না।
যদি মোহভঙ্গ হয়ে থাকে রেমি, ভাল করে ভেবে দেখো, তাহলে আমি তোমাকে একদিন নিয়ে যাব।
তাতে সব মিটে যাবে?
মনে হয় যাবে না। তবে আমরা বেঁচে যাব।
আমাকে ভাবতে একটু সময় দাও।
সময় নিশ্চয়ই দেব। আমাকেও ভাবতে হবে। এতদিন ব্যাপারটা ছিল খেলার মতো। এখন তো তা থাকছে না।
শশুরমশাই? উনি কী করবেন?
কিছু করবেন নিশ্চয়ই। জানি না।
ওঁকে তুমি ভয় করো না?
ভীষণ ভয় করি, রেমি। চিরকাল করে এসেছি।
ওঁর রি-অ্যাকশন কী হবে?
উনি আমাদের খুন করতে লোক পাঠাবেন হয় তো।
তাহলে?
সেইটেই ভেবে দেখতে হবে। কাউন্টার স্ট্র্যাটেজি।
থাক, রাজা। বিপদ ডেকে এনো না। আমার যেমন কাটছে কেটে যাবে।
রাজা থমথমে মুখ করে খানিকক্ষণ বসে রইল। তারপর বলল, আমি খুব কাপুরুষ নই, রেমি।
জানি। কিন্তু অন্যায় সাহসও ভাল নয়। ওঁর অনেক ক্ষমতা।
হ্যাঁ, সেও ঠিক। মন্ত্রিত্ব যাওয়ার পর উনি এখন আবার আগের মতো গুণ্ডাদের সর্দারি করছেন। সব খববই রাখি।
তাহলে এসব প্লান না করাই ভাল।
তুমি এভাবে শুকিয়ে যাবে?
আমি হয়তো বেশিদিন বাঁচব না। কোনও কোনও গাছ আছে, এক জায়গা থেকে উপড়ে নিয়ে অন্য জায়গায় লাগালে বাঁচে না।
তুমি বোধহয় আমার বিপদের কথা ভেবে এসব বলছ।
তা নয় গো। শুধু তুমি আমি নয়, বিপদ সকলের। অনেক কেলেঙ্কারি।
তা যা হওয়ার হয়েই গেছে। তবে চৌধুরীবাড়িতে কেলেঙ্কারির অভাব নেই। এ বাড়ির বউ মেয়ে ছেলে সকলেরই ইতিহাস আছে।
রেমি একটু হেসে বলল, তাই বলেই কি আমারও কেলেঙ্কারি করার অধিকার জন্মায়?
তা নয়। বললাম, তুমি এ ব্যাপারে পাইয়োনিয়ার নও।
রেমি কিছুক্ষণ বিবশ হয়ে চেয়ে রইল। আপনমনে একটু মাথা নাড়ল। তারপর বলল, আমি একটা জিনিস কিছুতেই বুঝতে পারি না, জানো?
কী?
তুমি কি বলতে পারো ও আমাকে কেন ভালবাসে না?
রাজা ভ্রুকুটি করল। প্রশ্নটা শুনে সে খুশি হল না। একটু বিরক্তির সঙ্গে বলল, ওসব জটিল প্রশ্নের জবাব জানি না। কুট্টিদার মধ্যে ভালবাসা-ফাসা নেই, বুঝলে! একদম নেই।
