বিকেলে রাজা এল।
তখন এক আচ্ছন্নতায় আক্রান্ত রেমি পড়ে আছে বিছানায়। পেটে খিদে মরে একটা যন্ত্রণা হচ্ছে। বুকে উথাল-পাথাল। চোখ বুজে সে নানারকম দুঃস্বপ্ন দেখছিল।
টুকটুক করে দরজায় অনেকক্ষণ শব্দ হচ্ছিল। তবু চোখ খোলেনি রেমি। ভীষণ ক্লান্ত। শব্দটা স্বপ্নে হচ্ছে, না বাস্তবে, তা বুঝতে অনেকক্ষণ সময় নিল সে। তারপর ক্ষীণ গলায় বলল, কে?
আমি রাজা। একটু আসব?
রেমি চকিতে নিজের শরীরের দিকে চেয়ে দেখল। না, শাড়ি ঠিকই জড়ানো আছে, শায়া দেখা যাচ্ছে না। তবু আর-একটু গা ঢেকে সে উঠে বসল। মাথাটা ঘুরছিল খুব।
এসো।
রাজা ঘরে আসে। মুখখানা থমথমে গম্ভীর। রেমি রাজার দিকে এক পলক চেয়েই চোখ নামিয়ে নেয়। আজ রাজার সঙ্গে তার দেওর-বউদির সম্পর্কটা তেমন সহজ নেই। ভারী লজ্জা করছিল রেমির।
রাজা বিছানার মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসে বলল, খুব শুকনো দেখাচ্ছে তোমাকে। কিছু খাওনি বোধহয়!
রেমি মাথা নেড়ে বলল, না।
রাজা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আজ যা ঘটেছে সেটা এক্সট্রিম। তবে তুমি এটাকে অত সিরিয়াসলি নিয়ো না। কুট্টিদা যে পাগল তা তো এতদিনে বুঝেই গেছ। কী আর বলব।
রেমি মাথা নত করেই ছিল। সেইভাবেই নিজের করতলের দিকে চেয়ে বলল, ও আমাকে কোথায় নিয়ে গিয়েছিল জানো? ওটা কেমন জায়গা?
খুব খারাপ। আমরা ওটাকে গদাধরের আজ্ঞা বলে জানি। আর কিছু জানতে চেয়ো না। কোনও ভদ্রলোক জেনেবুঝে ওখানে নিজের বউকে নিয়ে যায় না।
তুমি তবে গিয়েছিলে কেন?
আমি! বলে একটু থমকায় রাজা। তারপর বলে, কুট্টিদার এই ঠেকটা বহুদিনের। আমাকে বারকয়েক কুট্টিদাই নিয়ে গেছে ওখানে। মাঝে মাঝে জলসা বসে। আমি গান গাইতে গেছি। আজ গিয়েছিলাম, কুট্টিদা একটা জরুরি কাজ আছে বলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছিল। গিয়ে বুঝলাম তা নয়।
ওটা কি ফুর্তি করার জায়গা?
তা ছাড়া আর কী! মধ্য কলকাতার টপ মন্তানরা ওখানে জড়ো হয় সন্ধেবেলায়। সারাদিন ফাঁকা থাকে।
আমার এত গা ঘিনঘিন করছে।
করতেই পারে। তবু তো তুমি সবটা জানো না।
আর জেনে কাজ নেই। তুমি বোসো, আমি বরং স্নান করে আসি।
আমি বসব না, বউদি। একটা কথা বলেই চলে যাব।
কী কথা?
রাজা কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে নিজের নখ দেখল। তারপর মুখ তুলে তার শ্রীময় মুখখানা ভরে একটা ভারী সুন্দর হাসি হাসল। বলল, তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা নিয়ে একটা কথা উঠেছে জানোই তো।
নতমুখী রেমি বলল, জানি। কিন্তু ওসব আজ থাক।
না, আমি সে কথা বলতে ঠিক আসিনি। অন্যদিকে আর-একটা রিলেশনও তৈরি হচ্ছে, তুমি বোধহয় তার খবর রাখো না।
কীসের রিলেশন?
কুট্টিদার সঙ্গে একজনের। মানে একটা মেয়ের।
রেমি এবার মুখ তুলল। তীব্র হয়ে উঠেছে তার চোখের দৃষ্টি। আর লজ্জা নেই, সংকোচ নেই, বরং প্রচণ্ড একটা তেজ ধক ধক করছে চোখে। তার উপোসি ক্ষীণ গলা থেকে বাঘিনীর চাপা গড়ড় হুংকার বেরিয়ে এল, বিশ্বাস করি না।
কেন করো না?
ওর নামে এর আগেও রটানো হয়েছিল। বাজে কথা।
কুট্টিদার আর সব দোষ থাকতে পারে, শুধু এই দোষটা নেই বলছ?
মেয়েদের সম্পর্কে ওর কোনও দুর্বলতা নেই।
ছিল না হয়তো। এখন হয়েছে। বিশ্বাস করো।
মেয়েটা কে?
আমি জানি না। দেখিনি।
শোনা কথা?
হ্যাঁ, কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য। কিন্তু একথা তোমাকে বিশ্বাস করতে বলছি না এখনই। প্রমাণ পেলে বিশ্বাস কোরো। আমি আর-একটা কথা বলতে চাই।
রেমির শ্বাস ক্রমে উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। হাত মুঠো পাকিয়ে যাচ্ছিল আপনা থেকেই।
রাজা বলল, অনেক কষ্ট পেয়েছ এদের কাছে। এ যুগের মেয়েরা এত সহ্য করে না। কেন কষ্ট পাচ্ছ তুমি?
কী করব?
কিছু একটা করো। অন্তত করার জন্য পজিটিভলি ভাবতে শুরু করো।
তুমি বোসো। আমি স্নানটা সেরে আসি। বড় গরম লাগছে।
রাজা বসল। রেমি গিয়ে বাথরুমে জলের তলায় বিছিয়ে দিল নিজেকে। কত জল যে ঢালল মাথায় আর গায়ে তার হিসেব নেই। অনেকক্ষণ উন্মাদ-স্নানের পর একটু শীত করছিল রেমির। হাত-পা থরথর করে কাঁপছে। কিছু ভাবতে পারছিল না রেমি, কিছু বুঝতে পারছিল না। মনে হচ্ছিল আরও আরও জল ঢেলে গেলে, আরও বহুক্ষণ স্নান করলে বুঝি সব সংকট কেটে যাবে, মনের অস্থিরতা ধুয়ে যাবে।
তা হল না। তবু অনেকটা শরীরের তাপ কমল।
এলোচুলে সে এসে বসল রাজার মুখোমুখি। ধ্রুব যেসব শক্ত বই পড়ে তারই একটা নিয়ে পাতা ওলটাচ্ছিল রাজা। রেমি আসার পর বইটা রেখে দিয়ে বলল, কিছু খেয়ে এসো। তাহলে ভাল। লাগবে।
রেমি কে জানে কেন রাজি হয়ে গেল। হয়তো খেলে এত খারাপ লাগবে না।
এ বাড়িতে খাবার-দাবারের অভাব নেই এবং বাঁধাধরা সময় বলেও কিছু নেই। রেমি গিয়ে এক গ্লাস দুধ খেল রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে। শক্ত খাবার খাওয়ার মতো রুচি নেই। দুধ খেতেও বমি পাচ্ছিল। তবু জোর করে খেল।
আশ্চর্য, বাস্তবিকই কিছুটা ভাল লাগছিল তার। লম্বা হলঘরের মতো ডাইনিং হল-এ সে কিছুক্ষণ পায়চারি করল। তারপর এক টুকরো মাছ দিয়ে এক মুষ্টি ভাতও খেয়ে নিল সে।
ঘরে আসতে রাজা ভারী সুন্দর করে হেসে বলল, তুমি যে আমার কথায় বাধ্য মেয়ের মতো খেয়ে আসবে এতটা ভাবিনি।
রেমি কথাটা গ্রাহ্য না করে বলল, তোমার কুট্টিদা সম্পর্কে কী বলছিলে যেন?
কী বলব বলল তো! যতটুকু জানি বললাম। এর বেশি জানি না।
তুমি কথাটা বিশ্বাস করো?
করি।
তোমার কুট্টিদার কি আগে কোনও প্রেম-ট্রেম ছিল?
ছিল, বউদি। তবে সেসব জানতে চাওয়া বোকামি।
