লাকড়ির ঘর থেকে ধূলিধূসর বিস্মৃত কয়েকখানা লাঠি বেরোল। চমৎকার পাকা বাঁশের লাঠি, পেতলে বাঁধানো গাঁট। মুছে-টুছে তেল-চকচকে করে ভোলা হল সেগুলোকে। তারপর একদিন ভিতরের উঠোনে মালকোঁচা মেরে লাঠি হাতে লাফ দিয়ে নামলেন হেমকান্ত।
ঠকাঠক লাঠির শব্দে বাতাস গরম হয়ে ওঠে। হেমকান্তর রক্ত চনমন করতে থাকে। বিস্মৃত বিদ্যা আবার ফিরে আসতে থাকে তার কাছে। প্রথম যৌবনের মতোই এখনও দ্রুত চলছে তার পা, হাত। তেমনি বিদ্যুৎবেগে ঘোরাফেরা করছে চোখ। নিজের সক্ষমতা দেখে তিনি নিজেই অবাক।
আরও অবাক, যখন দেখেন কৃষ্ণকান্ত স্বভাব-লাঠিয়ালের মতো এক-এক লহমায় লাঠির এক-একটা কৌশল চমৎকার শিখে নিচ্ছে। চোখে সেই তগত দৃষ্টি, যা সাধকদের থাকে। তবে বৈরাগ্য ও নিস্পৃহতা নয়। চোখে একধরনের ধিকিধিকি আগুন আছে কৃষ্ণকান্তর।
অদ্ভুত! অদ্ভুত! মনে মনে বারবার বলেন হেমকান্ত। তার বিস্ময়ের ঘোর আর কাটতেই চায় না। এক পরিপূর্ণ আনন্দে তার হৃদয় মথিত ও ব্যথিত হতে থাকে।
কয়েকদিন পর এক সন্ধেবেলা কৃষ্ণকান্তর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। লোক-লস্কর চারদিকে ছুটল। হেমকান্ত চিন্তিতভাবে পায়চারি করছিলেন বারান্দায়। হঠাৎ কী খেয়াল হতে তিনি ধীরে ধীরে গিয়ে নলিনীর পরিত্যক্ত ঘরে হাজির হলেন।
দরজাটা ভেজানো। খুব সন্তর্পণে দরজাটা ঠেলে ঢুকলেন তিনি। তারপর থমকে দাঁড়ালেন। নলিনীর ঘর এখনও যেমনকে তেমনই আছে। সেই চৌকি, টেবিল, চেয়ার, দেয়ালে পাবনার ঠাকুরের সেই ছবি। নলিনী তার শিষ্য ছিল।
চৌকির ওপর চুপ করে বসে আছে কৃষ্ণকান্ত। শিরদাঁড়াটা সোজা। চোখ মুদ্রিত। ধ্যানস্থ। মশা ঘেঁকে ধরেছে তাকে। কিন্তু সে বোধহয় টেরই পাচ্ছে না।
হেমকান্ত মৃদুস্বরে ডাকলেন, কৃষ্ণ!
কোনও জবাব নেই।
হেমকান্ত দরজাটা ভেজিয়ে এসে চৌকিতে বসলেন। ছেলের মুখোমুখি। তারপর মেরুদণ্ড সোজা করে চোখ বুজলেন।
০৫৪. একটু মায়া কি অবশিষ্ট ছিল
একটু মায়া কি অবশিষ্ট ছিল ওর বুকে! পাখি পুষলেও তো লোকের মায়া হয়। বোধহয় সেইরকমই কিছু হবে। রেমি তো এদের বাড়ির দাড়ের ময়না ছাড়া কিছুই নয়। অদৃশ্য এক শিকল ঠুনঠুন করে। রেমি টের পায়। চলে যেতে উড়ে যেতে বাধা নেই। তবু পারে না রেমি। শিকল। কীসের যেন শিকল।
ধ্রুব এক সর্বনাশের মুখে, এক গহ্বরের ধারে ঠেলে নিয়ে গিয়েও ফেলে দিল না শেষ অবধি। সেই নোংরা ঘর, অদ্ভুত পরিবেশ আর রাজার বিবর্ণ মুখ ভুলতে পারল না রেমি। তার বুকে উঠে আসছে বমির ভাব। হাত-পায়ে ঝিঝি ধরার মতো অবশ ভাব। উপোসি শরীর দুর্বল। মাথা বোধবুদ্ধিহীন, ফাঁকা।
ধ্রুব তার দিকে তাকিয়ে বইল কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ যেমন এসেছিল তেমনি রেমির হাতটা ধরে একটা টান দিয়ে বলল, চলো।
রেমি কিছু প্রশ্ন করল না। পিছু পিছু নেমে এল। ট্যাকসিতে একটাও কথা বলল না ধ্রুব। বাড়ির দরজায় তাকে নামিয়ে দিয়ে সেই ট্যাকসিতেই কোথায় উধাও হয়ে গেল।
রেমি ঘরে এল। নীচের ঘরে। এ ঘর তার নয় আর। ধ্রুবর। চুপচাপ ঘরে কিছুক্ষণ বসে রইল রেমি। জীবনের সংকট-সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারাটা ভীষণ জরুরি ব্যাপার। কিন্তু রেমি কোনওদিনই এই জরুরি ব্যাপারটা পেরে ওঠেনি।
আবছা ঘরে বহুক্ষণ বিবশ হয়ে বসে রইল সে। বুকজোড়া ভয়, উৎকণ্ঠা, দ্বিধা। মাথায় এলোমেলো হাজার চিন্তা।
বহুক্ষণ ধরে তার একটা কথাই বার বার মনে হচ্ছিল। কিছুদিনের জন্য তার কোথাও চলে যাওয়া দরকার। কাছাকাছি নয়। একটু দূরে কোথাও। আবার যদি সমুদ্রের ধারে যায় তাহলে বেশ হয়। সঙ্গে কেউ থাকবে না। এল।
যত সময় যাচ্ছিল ততই তার এই প্রয়োজনটা তীব্র হয়ে উঠছিল। ধ্রুবর কাছ থেকে কিছুদিনের জন্য তার দূরে সরে যাওয়া উচিত। শিকলটা ঠুনঠুন করে বাজবে, এই বাড়ি থেকে দূরে গিয়ে সে বোধ করবে এক আশ্চর্য বিরহ, তবু তার যাওয়া দরকার। ধ্রুবকে ফিরে পেতে হলে তাকে হারানো দরকার, নিজেরও দরকার হারিয়ে যাওয়া।
একথা সত্য, ধ্রুব তাকে ভালবাসে না। কখনও-সখনও দাঁড়ের ময়নাকে নিয়ে খেলা করেছে বটে, কিন্তু ভালবাসেনি। ভালবাসাবাসি নেই বলেই তাদের মধ্যে দাম্পত্য কলহ নেই, ভুল বোঝাবুঝি নেই, মান-অভিমান নেই, পরস্পরকে দখলের চেষ্টা নেই।
না, ভুল ভাবছে রেমি। ধ্রুবর নেই, কিন্তু তার আছে। ধ্রুবকে সে বহুবার বোঝানোর চেষ্টা করেছে। যে, তার জন্য একবুক ভালবাসা টলটল করে রেমির বুকে। কিন্তু ধ্রুব তত আঁজলা পাতল না কোনওদিন। পাতবেও না। তার পিপাসা নেই।
না, দূর, খুব দুর কোথাও তাকে যেতেই হবে। ধু ধু এক দূরত্বের ব্যবধান গড়ে তুলতে হবে।
অনেকটা জল খেয়ে রেমি শুয়ে রইল বিছানায়। একটা বাচ্চা এসেছিল তার পেটে! আজ সেকথা মনে পড়ল। না, তার রাগ হল না। চোখে জল এল। সেই ভ্রুণহত্যার মধ্যে শুধু নিষ্ঠুরতাই ছিল না, ছিল কুট সন্দেহ। এত অন্যায় এত অবিচার ওই একটিমাত্র লোক তার ওপর করেছে যা সারাজীবনে আর কেউ করে উঠতে পারবে না।
দূরে যাবে? হঠাৎ শিহরিত হয় রেমি। সে তো ইচ্ছে করলেই এক অনতিক্রম্য দূরত্ব রচনা করতে পারে ধ্রুবর সঙ্গে! ইচ্ছে করলেই পারে। আর কিছু না হোক খুঁজলে একটু বিষ সে কি এ ঘরেই পেয়ে যাবে না?
রেমি উঠল। খুঁজতে লাগল।
কিছু অচেনা ওষুধপত্র আছে। টিউবে কিছু অয়েন্টমেন্ট। যদি খেয়ে নেয় তাহলে অসুস্থ হতে পারে। মরার নিশ্চয়তা নেই।
