শিখলে হয়। শরীরটা মজবুত করা দরকার।
বিপিনের কাছে যেয়ো। সে শেখায়।
আপনি শেখালে আরও ভাল হয়।
আমি সেই কবে করতাম। এখন ভুলেও গেছি বোধহয়।
আপনি শেখালে আমি খুব তাড়াতাড়ি শিখতে পারব।
হেমকান্ত সস্নেহে ছেলের দিকে একটু তাকান। তারপর বলেন, আচ্ছা দেখা যাবে।
হেমকান্তর কাছে শেখার একটা আলাদা আনন্দ আছে। কৃষ্ণকান্ত হঠাৎ টের পেয়েছে তার সংসার-উদাসীন বাবা সব ছেলেমেয়ের মধ্যে তাকেই একটু বেশি ভালবাসেন। কেন বাসেন তা সে জানে না। এই গম্ভীর মানুষটির কাছ থেকে তার স্নেহ-কাঙাল মন বারবার ওইরকম ভালবাসা চায়।
কৃষ্ণকান্ত কি হেমকান্তর মধ্যে তার মাকেই দেখতে চায়?
না, কৃষ্ণকান্ত তার মাকে চেনেই না। মাকে সে দেখতে চায় না তেমন করে। সে বাবাকেই চায়। পুরোপুরি বাবাকে।
কাল থেকে কি আমি মুগুর ভাঁজব, বাবা?
ক্ষতি কী? ওটাও ভাল অভ্যাস। তোমাকে একটু শিখিয়েছি না?
আজ্ঞে, হ্যাঁ।
মুগুর ঘোরালে কাঁধ আর হাতের পেশি শক্ত হয়। খুব ভাল অভ্যাস।
আপনি লাঠিখেলা জানেন?
জানতাম।
ছোরাখেলা?
হ্যাঁ, তুমি কি ওসবও শিখতে চাও নাকি?
হ্যাঁ।
কেন বলো তো?
এমনি। শিখে বাখা তো ভাল।
খাওয়ার মাঝখানে হঠাৎ সামনে এসে বসে চপলা। মাথায় ঘোমটা পুরোপুরি টানা নয়। গা থেকে সুবাস আসছে। ইভনিং ইন প্যারিস। শাড়িটা যথেষ্ট ঝলমলে। মুখে প্রসাধন। বাড়ির বউ নিশ্চয়ই। এত রাতে সাজে না কারণ না থাকলে।
হেমকান্ত সামান্য গম্ভীর হয়ে ভাত মাখতে থাকেন। খেতে রুচি নেই। শুধু মেখেই যান।
চপলা একটু প্রগ। কৃষ্ণকান্তকে প্রশ্ন করে, কী কথা হচ্ছিল রে? লাঠি ছোরা খেলবি?
হ্যাঁ, বউদি।
কেন? ডাকাতি করবি নাকি?
না, ডাকাত মারব।
তার জন্য বন্দুক শেখ। ছোরা লাঠির দিন আর নেই।
কৃষ্ণকান্ত বলে, স্বদেশিরা লাঠি ছোরার খেলা শেখে কেন তাহলে?
স্বদেশিদের ব্যাপারই আলাদা। তুই তো আর স্বদেশি নস!
হেমকান্ত উঠে পড়েন। বাইরে থেকে তার গাড়ুর জল ঢালার গব গব শব্দ হয়। কুলকুচো করছেন জোরে।
কৃষ্ণকান্ত তার বউদির মাদকতাময় মুখটির দিকে চেয়ে বলল, আমিও স্বদেশি হব।
এসব কে তোকে শেখাচ্ছে বল তো?
কে আবার শেখাবে? বলল তো এই লাইনগুলো কার? হায় সে কী সুখ এ গহন ত্যজি হাতে লয়ে জয়তুরী, জনতার মাঝে ছুটিয়ে পড়িতে, রাজ্য ও রাজা ভাঙিতে গড়িতে অত্যাচারের বক্ষে পড়িয়া হানিতে তীক্ষ ছুরি।
ও বাবা! বাংলা আবার কোনও জন্মে পড়েছি নাকি? তার ওপর আবার কবিতা। কার লেখা রে?
বলব কেন? তুমি খুঁজে বের করো।
লাইনগুলো বেশ ভাল। তবে স্বদেশি-স্বদেশি গন্ধ আছে।
তুমি শশীদাকে চেনো?
শশীদা আবার কে?
আমাদের বাড়িতে যে স্বদেশি লোকটা লুকিয়ে ছিল।
চিনব কী করে? তখন তো আমি এখানে ছিলাম না। কেন সে কী করেছে?
দারুণ লোক। বরিশালে একটা সাহেব মেরেছিল।
ওঃ! দারুণ কাজ তো!
দারুণ নয়?
শুনেছি একজন নিরীহ পাদরিকে খুন করেছিল। নিরীহ মানুষকে মারা তো খুব বীরত্বের কাজ।
লোকটা ছিল স্পাই।
ওসব মারার পর বানিয়ে বলেছে।
তুমি কিছু জানো না।
আমি অনেক জানি। সাহেবরা এখনও সপ্তাহে তিন-চারদিন আমাদের বাড়িতে ডিনার খায়।
তোমরা মুরগি খাও?
খেলে কী?
এঃ মা।
ওঃ, খুব বৈষ্ণব হয়েছিল তোরা, না? তোর বড়দাও তো খায়।
খায়?
খায় মানে? ঠ্যাং চিবোতে বসলে জ্ঞান থাকে না।
দাঁড়াও, বাবাকে বলে দেব।
দিস। কিছু হবে না। আমরা ছেলেবেলা থেকে মুরগি খাই। বাবা বনমোরগ মেরে আনত, আমরা বেঁধে খেতাম।
ঘেন্না করে না?
ঘেন্নার কী রে বাঁদর? মুরগি কি অখাদ্য?
তোমাদের জাত যায় না?
আমরা তো সাহেব।
সাহেবরা আমাদের শত্রু।
তোর মাথা।
একশোবার শত্রু!–বলে আচমকা চেঁচিয়ে ওঠে কৃষ্ণকান্ত। তার মুখ-চোখে ক্রোধবহ্নির হলকা।
চপলা একটু অবাক হয়ে চেয়ে থাকে।
কৃষ্ণকান্ত বউদির দিকে চেয়ে ছিল। চোখের ভিতর থেকে যে হলকা বেরিয়ে আসছিল তার, তা হঠাৎ স্তিমিত হয়ে গেল। চমৎকার একটু হেসে সে বলল, এসব বাবাকে বোলো না।
চপলার বিস্ময় তখনও কাটেনি। বলল, তুই কী রে?
আমি আবার কী?
এইমাত্র তোর চেহারাটা কেমন অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল। আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
কৃষ্ণকান্ত লজ্জা পায়। মাথা নামিয়ে হাসে।
চপলা হঠাৎ বলল, তোর রাগ তো সাংঘাতিক। বড় হয়ে মানুষ খুন করবি না তো?
না। শুধু ইংরেজ।
চপলা একটু ইংরেজ-প্রেমিক। কিন্তু এই বালক দেওরটির সঙ্গে তার আর তর্ক করার সাহস হল। কৃষ্ণকান্তর চোখের আগুনের কথা সে ভুলতেও পারল না। অনেক রাত্রি পর্যন্ত সে বার বার অন্যমনস্ক হয়ে গেল। কী দেখল সে কৃষ্ণকান্তর মধ্যে? কী?
কয়েক দিনের মধ্যেই কৃষ্ণকান্ত প্রবল বেগে মুগুর ঘোরাতে লাগল, নানাবিধ ব্যায়াম শুরু করে দিল। যে মনোযোগ, নিষ্ঠা ও একাগ্রতার সঙ্গে সে এসব করে তা দেখে হেমকান্ত অবাক। খুশিও। তার অন্য ছেলেদের মধ্যে এ জিনিস নেই। তার নিজের মধ্যেও নেই।
হেমকান্তর শরীরেও কি নবযৌবন এল? তিনি ইদানীং যে জবুথবু ভাবটা অনুভব করছিলেন তা এক লহমায় কেটে গেল কৃষ্ণকান্তর পাল্লায় পড়ে।
ভোরবেলা কাক ডাকার আগেই তিনি ওঠেন। কৃষ্ণকান্তকে ডাকতে হয় না। তার ভিতরে যেন নির্ভুল এক ঘড়ি টিক টিক করে সর্বদা। হেমকান্ত উঠে রোজই দেখতে পান, কৃষ্ণকান্তও উঠে তৈরি হচ্ছে।
বাপ-ব্যাটায় তারপর বেরোন দৌড়তে। দৌড়লে দম বাড়ে, ফুসফুস শক্তিশালী হয়, সারা শরীরে রক্তের সঞ্চালন ঘটে। শেষ রাত্রির অন্ধকারে নদীর ধারের রাস্তা ধরে দৌড়বার সময় একটা পরিশ্রুত জগন্ধময় বাতাস এসে ঝাপটা দেয়। শরীরের কোষে কোষে ঢুকে যত পাপ-তাপ দূষিত জিনিস শুষে নিয়ে যায়। বড় ভাল লাগে হেমকান্তর।
