আমি মারতে চাই।
সে জানি। তোর চোখ-মুখেই সে কথা লেখা আছে। কিন্তু মারলেই তো হল না। কোন পথটা ঠিক আগে সেইটে বিচার করতে হবে। তার জন্যই বয়স দরকার।
তোমার কাছে কোনটা ঠিক?
আমি মেয়েমানুষ, আমার কথা ছেড়ে দে। বড় হ, বোধবুদ্ধি পাকুক, তখন নিজের বোধবুদ্ধিমতো পথ বেছে নিবি। স্ত্রী বুদ্ধিতে চলতে নেই।
লাঠি ছোরা খেলা কার কাছে শেখা যায় বলো তো?
শেখানোর লোকের অভাব কী? বিপিনের কাছেই শেখ না!
বাবাকে বলে দেবে না তো!
বলব না। তবে তোর বাবাও এক সময়ে মুগুর ভাঁজত। তার কাছেও অনেক শেখার আছে।
কিন্তু বাবা কি শেখাবে?
সেটা বলে দেখতে পারি। অন্য কাউকে না হলেও তোকে হয়তো শেখাবে।
এক-আধদিন শিখিয়ে ছিল। তারপর আর গা করে না।
তোর বাবা লাঠিখেলা ছোরাখেলাও জানত এক সময়ে। আমি বলি, বাবার কাছেই শেখ। তোরও কাজ হবে, তোর বাবারও সময়টা কাটবে।
তুমি বাবাকে বলে দাও।
দেব।
আজই।
আচ্ছা বাবা, আচ্ছা। আজই।
এক্ষুনি চলো।
রঙ্গময়ি আতঙ্কিত হয়ে বলে, ও বাবা, এখন কি যেতে পারি! রাত হয়েছে।
রাত হয়েছে তো কী?
আমরা বাইরের লোক, হুটহাট অন্দরমহলে ঢোকা আমাদের বারণ।
কে বলেছে তুমি বাইরের লোক?
বাইরের লোক নই? বলিস কী রে! আমাদের তাড়িয়ে দেওয়ার পর্যন্ত কথা উঠেছিল।
সে তো বড়দা আর শচীনদা মিলে করেছিল। যত সব বদমাইশি।
ছিঃ। ও কী কথা? বদমাইশি আবার কী! গুরুজন না!
বদমাইশিই তো। বাড়ির সব লোককে তাড়িয়ে দিল না?
যা করেছে তা তোদের ভালর জন্যই।
ছাই ভাল! হরদা আমাকে কত গল্প বলত। পাগল লোক। তাকে তাড়াবে কেন? ওরা কি আমাদের আপন লোক নয়?
রঙ্গময়ি একটু ম্লান হেসে বলল, বেশ বাবা বেশ। সবাইকে আপন বলে ভাবা তো খুব ভাল। কিন্তু একটু বড় হলে বুঝবে, দুনিয়াটা অত ভাল নয়। সেইজন্যই তো তোকে বড় হতে বলি অত করে।
কী করে তাড়াতাড়ি বড় হওয়া যায় বলো তো। ব্যায়াম করে?
রঙ্গময়ি খুব হাসে। মাথা নেড়ে বলে, বড় কি জোর করে হওয়া যায় রে! যখন বয়স হবে তখন আপনা থেকেই বড় হয়ে যাবি। কসরত করতে হবে না।
একটা কথা বলবে, মনুপিসি?
কী কথা?
শচীনদার সঙ্গে কি ছোড়দির বিয়েটা হবে?
বোধহয় না।
কী করে বুঝলে?
যেভাবেই বুঝে থাকি না কেন, তোর তাতে কী দরকার? ওসব নিয়ে ভাববার দরকার নেই তোর।
বড় বউদি কিন্তু বলে, হবে।
রঙ্গময়ি অপ্রতিভ বোধ করতে থাকে। চপলার প্রসঙ্গটা তার কাছেও অস্বস্তিকর। সে বলল, বলুক গে।
তুমি দেখো, বড় বউদি বিয়েটা ঠিক দেবে।
আচ্ছা দেখব।
এখন চলো।
কোথায়?
বাবার কাছে।
কাল সকালে যাব।
না, এক্ষুনি।
তুই বড্ড জ্বালাস বাবা।
তুমি তো সবসময়েই বাবার কাছে যেতে আগে। এখন যাও না কেন?
বলিস না ওসব।— রঙ্গময়ি আতঙ্কিত গলায় বলে, লোকে কী ভাববে?
তাহলে চলল।
রঙ্গময়ি কিছুক্ষণ এই অত্যন্ত জেদি ছেলেটির দিকে চেয়ে থাকে। জেদটা ভাল না মন্দ তা বুঝবার চেষ্টা করে। তার মনে হয়, ছেলেটার মধ্যে আগুন আছে। কিন্তু আগুনটা কোথেকে এল? ওর বাবা তো ভেজা ন্যাকড়ার মতো মানুষ। মা ছিল আর পাঁচজন মেয়েমানুষের মতোই সাধারণ। কৃষ্ণকান্ত কি তবে তার কাকার আগুনটুকু পেল?
নলিনী যত না বিপ্লবী ছিল তার চেয়ে বেশি ছিল সন্ন্যাসী। ওই এক ধরনের মানুষ। সংসারের মাটি কিছুতেই গায়ে মাখে না। কৃষ্ণকান্ত ঠিক সেরকমও নয়।
রঙ্গময়ি হাত বাড়িয়ে কৃষ্ণকান্তর কপাল থেকে চুলগুলি সরিয়ে সেই দাগটা আবার দেখল। স্পষ্টতই রাজটিকা। কোনও ভুল নেই। নাসামূল থেকে চওড়া কপাল ভেদ কবে মাথা স্পর্শ করেছে গিয়ে। সরল ও সুস্পষ্ট। একটা গভীর তৃপ্তির স্বাদ ছাড়ে রঙ্গময়ি।
কী দেখলে, পিসি? রাজটিকা?
রঙ্গময়ি চাপা গলায় বলে, খবরদার! কাউকে বলবি না।
বলি না তো? তুমি বারণ করার পর থেকে কাউকে বলিনি। তুমি লম্বা চুল দিয়ে ঢেকে রাখতে বলেছিলে। তাই রাখি। তবে বউদি মাঝে মাঝে চুল পাট করে আঁচড়াতে বলে।
রঙ্গময়ি গর্জন করে বলে, শুনবি না।
কৃষ্ণকান্ত একটু ফচকে হাসি হেসে বলে, কেউ দেখে ফেললে কী হবে, পিসি? কিছু কি হয়?
তোদের তো শত্রুর অভাব নেই। কার মনে কী আছে! সুলক্ষণ দেখে হিংসায় জ্বলেপুড়ে হয়তো বিষই খাওয়াবে।
দুর! রাজটিকা কত ছেলের আছে!
তোকে বলেছে।
বলবে কেন? দেখি তো। ক্লাসের অনেক ছেলের কপালে রাজটিকা।
রঙ্গময়ি ঠাট্টা বুঝে হাসে। কৃষ্ণকান্ত আজকাল খুব ঠাট্টা-ইয়ার্কি শিখেছে। সে বলে, রাজটিকা অত সস্তা নয় রে। এখন যা। কাল সকালে তোর বাপকে যা বলার বলব।
রঙ্গময়ির কাছে পড়া শেষ করে প্রসন্নমনে হ্যারিকেন হাতে বাড়ি ফেরার সময় কৃষ্ণকান্তর আবার সেই পঙক্তিটা মনে পড়ে। মরলে স্বর্গে যাবে, বেঁচে থাকলে ভোগ করবে সমস্ত পৃথিবী, সুতরাং তোমার আদর্শ প্রতিষ্ঠায় প্রাণকে বাজি রাখো।
বার বাড়ির অন্ধকার মাঠে একটু দাঁড়ায় কৃষ্ণকান্ত। চরাচর নিজকুম। এই নির্জনতায় দাঁড়িয়ে সে অনেক বড় একটা কিছুটা অনুভব করে। সে তার স্বদেশকে টের পায়। তার মনে হয় এই ভারতবর্ষের জন্য তার কিছু করার আছে। তার গায়ে কাঁটা দেয়। ভিতরে ভিতরে এক অদ্ভুত অকারণ আনন্দ ঢেউ দিতে থাকে। সে সামান্য সংসারে বাঁধা থাকবে না। সে সামান্য মানুষ হয়ে বেঁচে থাকবে না। তার কপালে আছে জন্মগত রাজটিকা। সে একটা কিছু হবে। হবেই।
রাত্রিবেলা বাবার পাশে খেতে বসে কৃষ্ণকান্ত খুব কুষ্ঠিত স্বরে বলল, বাবা, আপনি নাকি অনেক ব্যায়াম জানেন?
হেমকান্ত একটু হাসলেন, কেন? তুমি শিখবে?
