সে কি ভুল বকছে? রেমি আবছা ক্ষীণ চোখের আলোয় ছায়া-ছায়া কিছু লোককে দেখতে পায়। অপারেশন থিয়েটার? হ্যাঁ, তাই তো! তবে এতক্ষণ সে কোথায় ছিল? কত দূরে?
আবার কি চলে যাবে রেমি? অস্ফুট এক অভিমানে সে বলে, তুমি আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিলে ওগো? কোথায়? রাজার সঙ্গে আমার বিয়ে দেবে বলে? শুনেছ কখনও নিজের বউকে কেউ অন্যের সঙ্গে বিয়ে দেয়?
হ্যাঁ, পাগল ধ্ৰুব একদা তা-ই করেছিল।
বেড়াতে যাওয়ার নাম করে ধ্রুব রেমিকে বের করে আনল বাড়ি থেকে। ট্যাকসিতে তুলে সাঁ করে নিয়ে এল ওয়েলিংটন স্কোয়ারের কাছে একটা বাড়িতে।
ঠিক বাড়ি নয়। একটা রহস্যজনক আস্তানা। পুরনো একটা বাড়ির দোতলায় রেমিকে নিয়ে উঠল ধ্রুব। খুব নোংরা পরিবেশ। পচা তরকারি খোসা, রোদ না লাগা দেয়াল, নর্দমা ইত্যাদির মিশ্র গন্ধে গা ঘুলিয়ে ওঠে।
লোকজন কেউই প্রায় ছিল না। দোতলার বারান্দার শেষপ্রান্তে একটা ঘর। সেই ঘরে রাজা ম্লানমুখে বসে আছে।
রেমি রাজাকে দেখেই আঁতকে উঠে বলে, এ আমাকে কোথায় আনলে তুমি?
ধ্রুব কঠিন স্বরে বলে, জায়গাটা খারাপ নয়, রেমি। তোমাকে মানায়।
তার মানে?
এখানে যতটা নোংরামি তার চেয়ে ঢের বেশি নোংরামি তোমার মনে।
কী বলছ ওসব? আমি যা করেছি শুধু তোমার জন্য।
জানি। বিশ্বাসও করি। কিন্তু তা করতে গিয়ে এ বেচারাকে ড়ুবিয়ে দিয়েছ।
রেমি রুখে উঠে বলে, আমি কাউকে ডোবাইনি।
ওকে জিজ্ঞেস করো ও তোমার প্রেমে পড়ে গেছে কি না।
সে দোষ আমার নয়।
তুমি ওকে প্রশ্রয় দিয়েছ। প্রেম-প্রেম খেলা খেলেছ। আমি এ খেলা অপছন্দ করি।
রেমি হঠাৎ পাগলের মতো চেঁচিয়ে উঠল, না! না! না! না!
ধ্রুব তার মুখ চেপে ধরল জোরালো হাতে। বলল, খবরদার চেঁচাবে না।
রেমি এক ঝটকায় মুখটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, একসোবার চেঁচাব। তুমি এ কাণ্ড কেন করছ তা কি আমি জানি না?
কী জানো?
তুমি শ্বশুরমশাইয়ের ওপর শোধ তুলতে চাও।
তার মানে?
উনি আমাকে ভালবাসেন। খুব বেশি ভালবাসেন। আমাকে ওর কাছ থেকে দূর করে দিয়ে তুমি ওঁকে জব্দ করতে চাও। আমি জানি! সব জানি।
আশ্চর্য এই, ধ্রুব এই কথা শুনে মিইয়ে গেল। তারপর মুচকি একটু হাসল।
০৫৩. একটা পঙক্তি
একটা পঙক্তি কৃষ্ণকান্ত আজকাল প্রায়ই আপনমনে বিড়বিড় করে আওড়ায়। হতো বা প্রান্সসি স্বর্গং, জিত্ৰা বা ভোক্ষসে মহীম। সংস্কৃত শেখা তার কাছে এক নতুন জগতের দরজা খুলে যাওয়ার মতো। এক গহিন চির-প্রদোষের স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে আছে। কত ফুল, কত না লতানে গাছ, মহীরুহ। গায়ে কাঁটা দেয়। ব্যাকরণের বেড়াজাল সে অনায়াসে টপকাতে পারে ওই অসম্ভব রূপময় জগতে প্রবেশ করার তীব্র তৃষ্ণায়। বৃক্ষমূলের বেদিতে বসে আছেন ঋষিরা। জ্ঞান ও উপলব্ধির স্নিগ্ধ মহিমা তাদের মুখমণ্ডলে। যেখানে মায়ামুগ্ধ হরিণ শকুন্তলার আঁচল চিবিয়ে খায় স্নেহবশে। ন্যগ্রোধ, ইজুদি, বহ্বাস্ফোট কত শব্দ কৃষ্ণকান্তর বুকের মধ্যে নানা রকম বিস্ফোরণ ঘটাতে থাকে। কিন্তু কোনও কোনও পঙক্তি তার বুকের মধ্যে গতিময় তিরের মতো এসে আমূল গেঁথে যায়। যদি মরো তো স্বর্গলাভ করবে, যদি জেতো তো ভোগ করবে পৃথিবীকে। এই পঙক্তির মধ্যে লুকোনো এক জাদু তাকে ভিন্নতর কাজে উত্তেজিত করে অনবরত।
মনুপিসি শুধু তাকে সংস্কৃতই শেখায় না। মাঝে মধ্যে এমন সব কবিতার লাইন মুখস্থ করিয়ে দেয় যা দামামার শব্দ তুলে দেয় রক্তে। হায় সে কী সুখ এ গহন ত্যজি, হাতে লয়ে জয়ত্রী, জনতার মাঝে ছুটিয়ে পড়িতে, রাজ্য ও রাজা ভাঙিতে গড়িতে, অত্যাচারের বক্ষে পড়িয়া হানিতে তীক্ষ্ণ ছুরি। জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস ঘটনার কথা এখনও লোকের মুখে মুখে ফেরে। কৃষ্ণকান্ত সেই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ শুনে নিয়েছে মনুপিসির কাছে, মাস্টারমশাইয়ের কাছে। তার শরীর অস্পষ্ট অনির্দিষ্ট প্রতিশোধস্পৃহায় শিহরিত হয়।
তাছাড়া আছে শশিভূষণ। সে বরিশালের জেলে বন্দি। মামলা উঠবে শিগগিরই। হয়তো ফাঁসি হয়ে যাবে। কিন্তু শশিভূষণের স্মৃতি কিছুতেই তাড়াতে পারে না কৃষ্ণকান্ত। কয়েকদিন তাদের বাড়িতে ছিল লোকটা। অসুস্থ, সংজ্ঞাহীন। তবু সেই লোকটার মুখে এমন এক সর্বস্ব পণ রাখা মরিয়া ভাব ছিল যা সহজে ভুলতে পারে না সে। ভুলতে অবশ্য চায় না।
একদিন এই শহরেও বিলিতি কাপড়ে বহ্ন্যূসব হয়ে গেল। পুলিস গুলি চালিয়েছিল। কয়েকজন মরেছে। কৃষ্ণকান্ত সময়মতো খবর পায়নি। পেলে যেত। গিয়ে পুলিসদের ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ে হাতের রাইফেল কেড়ে নিত। উলটে গুলি চালাত দুম দুম।
সিদ্ধান্ত নিতে খুব বেশি দেরি হল না কৃষ্ণকান্তর। একদিন সন্ধেবেলা সে রঙ্গময়িকে বলল, মনুপিসি, আমি স্বদেশি করব।
রঙ্গময়ি চোখ কপালে তুলে বলে, বলিস কী? তাহলে যে তোর বাবা শয্যা নেবে।
শয্যা নেবে কেন?
স্বদেশি করা কি চাট্টিখানি কাজ রে! জেল আছে, মারধর আছে, ফাঁসি-গুলি আছে।
আমি তো ভয় পাই না।
তুই দামাল ছেলে, তাই ভয় পাস না। কিন্তু তোর বাবা যে পায়।
তুমি বাবাকে বোলো না। আমি লুকিয়ে করব।
রঙ্গময়ি সস্নেহে হেসে বলে, আচ্ছা করিস। বয়স হোক।
কত বয়স?
অন্তত কুড়ি-একুশ।
ততদিন বসে থাকতে হবে?
না, ততদিন তৈরি হতে হবে।
তৈরি হতে হয় আবার কীভাবে?
সে অনেক আছে। স্বদেশিদের ট্রেনিং হয়, জানিস না? শরীরটাকে মজবুত করে তুলতে হয়, অনেক লেখাপড়া আছে, লাঠিখেলা ছোরাখেলা শেখা আছে। বন্দুকের টিপ ঠিক করতে হয়। এ হল একরকম স্বদেশি। আর-একরকম আছে, যারা অহিংসার পথে চলে। চরকা বোনে, কাপড় পোড়ায়, অসহযোগ করে। তারা মার খায়, কিন্তু মারে না। যেমন গাঁধীজি।
