সেই অবস্থাতেই সে লক্ষ করে রেমির তেঁ-এটে খচ্চর ভাইটা একলাফে কয়েক হাত সরে গেল।
বমিটা বেরিয়ে যাওয়ায় খানিকটা ভাল লাগল ধ্ৰুবর। নিজের বমির সামনেই বসে বইল সে। গাড়লের মতো। মাথাটা সামান্য ঘুরছে। তবে হালকা লাগছে।
আত্মীয়স্বজন বড় কম আসেনি। এতক্ষণ বাইরে অনেকে ঘোরাঘুরি করছিল, জটলা পাকাচ্ছিল। এখন কেউ নেই। কয়েকটা গাড়ি শুধু দাঁড়িয়ে আছে।
বলতে কী, ধ্রুবর আজ একটু একা লাগছে। বহুকাল এরকম একা বোধ করেনি সে। কেন এমন মনে হচ্ছে?
ধ্রুব তার অপ্রকৃতিস্থ মাথায় ব্যাপারটার একটা ব্যাখ্যা খুঁজতে থাকে। মনে হচ্ছে, রেমির সঙ্গে তার জাগতিক সম্পর্ক ছিঁড়ে যেতে বসেছে বলেই বোধহয় এই একা বোধ। রেমি যদি মরে যায় তা হলে কাল থেকে তার সব বন্ধন গেল। না, একথা ঠিক, রেমি বেঁচে থাকতেও তার কোনও বন্ধন ছিল না। কিন্তু বড় স্টিম লঞ্চের পিছনে বাঁধা গাধাবোটের মতো লেঙুর তো ছিল। স্টিম লঞ্চ হয়তো টেরই পায় না গাধাবোটকে, কিন্তু তবু থাকে তো। এবার সেটুকুও যাচ্ছে। চমৎকার। ধ্রুবর বরং খুশি হওয়ার কথা।
ধ্রুব খুশি যে একেবারেই হচ্ছে না তা নয়। বন্ধনমুক্তি কার কাছে না সুখের! তাছাড়া ভাগ্যবানেরই বউ মরে। কিন্তু তবু একা বোধটাও বড় স্পষ্ট।
ধ্রুব সঁাড়ানোর একটা চেষ্টা করল। কিন্তু হাঁটুর জোড় খুলতে চাইল না। এরকমই হওয়ার কথা। পেটে অঢেল মদ। কিন্তু নেশাটা কেটে গেছে। কিন্তু মদ তো তার ক্রিয়া করবেই। নেশা হয়নি বলেই বরং দ্বিগুণ ক্রিয়া করবে। শোধ নেবে শরীরের নানা জায়গায় ছোবল মেরে। তাই নিচ্ছে।
বাড়ি ফিরে যেতে পারে ধ্রুব। কিন্তু জানে ফিরে গিয়ে ঘুমোতে পারবে না। একা ঘরে আজ তার গা ছমছম করবে। বাড়ি আজ বড় ফাঁকা। প্রায় সবাই এখানে চলে এসেছে।
ধ্রুব একটা বড় শ্বাস ফেলল। নেশা করে বহুবার পথে-ঘাটে পড়ে থেকেছে। তাতে লজ্জা নেই তার। সে তো কিছু টের পায় না তখন। কিন্তু এরকম পরিপূর্ণ সচেতন অবস্থায় রাস্তায় শুয়ে পড়া কি সম্ভব? তার এখন ভীষণ ইচ্ছে করছে শুয়ে একটু চোখ বুজে থাকে।
শোবে? একটু দ্বিধা করে ধ্রুব। তারপর সামান্য হাসল। লোকলজ্জা সংকোচ এসব বিসর্জন দিতে তার দ্বিধা থাকা উচিত নয়।
বমির জায়গাটা থেকে সামান্য সরে গিয়ে ধ্রুব দেয়াল ঘেঁষে টানটান হয়ে শুয়ে পড়ল ফুটপাথে।
আঃ! ভারী আরাম পেল সে। শীত করছিল একটু। সেটা কিছু নয়। ফুটপাথে হাজার হাজার মানুষ কলকাতায় রাত কাটায়। আজ সচেতনভাবে ফুটপাথে শুয়ে নিজেকে তাদের সঙ্গে এক করে ভাবতে পেরে ভারী রোমাঞ্চ হল তার। চমৎকার!
মাথার নীচে আড়াআড়ি ডান হাতখানা রেখে সে চিত হয়ে আকাশের দিকে তাকাল। ফুলঝুরির মতো আলোর কণা ছড়িয়ে আছে আকাশময়। মেঘ নেই, কুয়াশা নেই। রাত্রি চলেছে ভোরের আলোর দিকে। রেমি কি রাতটা কাটাতে পারবে।
এই সুন্দর রাত্রিটিতে ধ্রুবরও খুব মরে যেতে ইচ্ছে করছে। কোনও কারণ নেই। এমনি। এখন হঠাৎ ফুটপাথে শুয়ে মরে গেলে কেমন হয়?
একটা কুকুর খুব সন্তর্পণে তার বমিটা শুকছে। সন্দেহভরে তাকে একটু চেয়ে দেখো ধ্রুব কুকুরটাকে তাড়ায় না। ওকেও তো টিকে থাকতে হবে। থাক।
ধ্রুব চোখ বোজে। তার ঘুম আসছে।
জামাইবাবু!
উঁ!–ধ্রুব চোখ খুলে বুকের সামনে দুটো পা দেখতে পায়। অনেক উঁচুতে যেন মাথাটা।
শুয়ে আছেন কেন?
এমনি। ভাল লাগছে।
আপনি কি খুব বেশি অসুস্থ?
কেন? জেনে কী হবে?
বলুন না।
আমি অসুস্থ হলে তো তুমি খুশিই হও। তাই না?
আমি হই। কিন্তু দিদি হয় না।
তার মানে?
আমার দিদি আপনাকে বড় ভালবাসত। ডেসপাইট ইয়োর ইভিল ডিজাইনস।
তাই নাকি? হবে। আমি ভালবাসার কথা বেশি জানি না।
আপনার জানার কথাও নয়। যারা পায় তারা মর্ম বোঝে না। আপনার যন্ত্রণাটা কি খুব বেশি?
না। এখন ব্যথাটা নেই। আমাকে একটু ঘুমোতে দাও।
এখানে ঘুমোবেন কেন? কাছেই আপনাদের গাড়ি আছে। ব্যাকসিটে গিয়ে শুয়ে পড়ুন।
গাড়ির ব্যাকসিটে যে শোওয়া যায় তা আমি জানি। কিন্তু আমার এখানেই ভাল লাগছে।
আপনার রিলেটিভরা দেখতে পেলে রাগ করবে। তাতে তোমার কী? বললাম তো, আমার কিছু না।
দিদির কথা কী বলছিলে?
দিদি আপনাকে ভালবাসত। কাজটা ঠিক করত না। কিন্তু বাসত। অন্ধের মতো, বোকার মতো। দিদি যদি টের পায় আপনি ফুটপাথে শুয়ে আছেন আর আমি আপনাকে ওঠানোর চেষ্টা করছি না তাহলে দিদি খুব দুঃখ পাবে।
রেমি এখন সুখ-দুঃখের ওপারে।
জানি। তবু দিদির কথা ভেবেই আমার অস্বস্তি হচ্ছে।
আমাকে তোমার লাথি মারতে ইচ্ছে করছে না?
না। আমি ইতর নই। আপনি উঠুন।
আমি বেশ আছি, জয়। চমৎকার।
ডাক্তার ডাকব?
না। ডাক্তার কী করবে? আমি একটু ঘুমোই।
জয়ন্ত দ্বিধাভরে দাঁড়িয়ে রইল।
ধ্রুব চোখ বুজল। টের পেল জয়ন্তর রবারসোলের জুতো মৃদু শব্দে সরে যাচ্ছে।
ঘুম এল ঝাঁপিয়ে। যেন একরাশ জল এসে ড়ুবিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে গেল তাকে। রেমির ট্রেন আসছে না।
সে মৃদুস্বরে বলল, আমার জুতো হারিয়ে গেছে। কিনে দেবে?
গমগমে পুরুষকণ্ঠ বলে, জুতো! সে তো তোমার পায়েই আছে।
রেমি অবাক হয়ে দেখে, ওমা! তাই তো! কী চমৎকার একজোড়া লাল চপ্পল তার পায়ে! মাখনের মতো নরম।
চপ্পলের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ চমকে ওঠে রেমি! এ মা গো! রক্ত! রক্ত গড়াচ্ছে যে! চটির রং লাল বটে, কিন্তু রক্তের লাল!
রেমি চেঁচিয়ে উঠে চটিজোড়া পা থেকে ছেড়ে ফেলবার চেষ্টা করছিল। ভীষণ ঝাঁকুনি লাগছিল শরীরে।
