প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে লোহার বেড়ার ধারে রেমি একটু দাঁড়ায়। দেখতে পায়, একটা শেয়াল সেই শিশুদেহটি মুখে করে একটা জলা থেকে উঠে আসছে। রেমিকে দেখে শেয়ালটা থমকে দাঁড়ায়। চোখে চোখ রাখে। তারপর অপরাধীর মতো চোখ নামিয়ে নিয়ে হেঁটে চলে যেতে থাকে।
রেমি এবার আর চেঁচায় না। চেঁচানো বারণ।
রেমি বিষণ্ণ গলায় বলল, নিয়ে গেল।
গমগমে পুরুষকণ্ঠ বলে, ঢিল মারছি, দাঁড়াও।
আতঙ্কে রেমি বলে, না থাক। শেয়ালটা পাগল।
তাতে ভয় কী? আমরা বেড়ার মধ্যে আছি।
তবু থাক। আমরা তো চলেই যাব।
যাব কী করে? টিকিট হয়নি যে।
কেন?
টিকিটবাবু নেই।
তা হলে কী হবে?
দেখি, যদি টিকিটবাবু আসে। নইলে এখানেই রাত কাটাব আমরা।
লোকে নিন্দে করবে না?
এখানে লোক নেই। শুধু শেয়ালেরা থাকে।
শুধু শেয়াল! মা গো!
আর কিছু বলল না রেমি। দাঁড়িয়ে রইল। সামনে লাল আকাশ।
বাইরে দেয়ালে পিঠ রেখে দুজনে তখনও দাঁড়িয়ে।
ধ্রুব আর জয়ন্ত।
জয়ন্ত বলছিল, আমি দিদির সম্পর্কে সব খোঁজখবর রাখি, জামাইবাবু।
কী খবর বলো তো?
দিদিকে আপনি নষ্ট করার চেষ্টা করেছিলেন।
তাই নাকি?
সব জানি। নইলে রাজার সঙ্গে ওকে নিয়ে কথাটা উঠত না।
তোমার দিদিকে তোমার চেয়ে আমি একটু বেশি চিনি।
চেনারই কথা। কিন্তু আপনি সত্যিই তো আর দিদিকে চেনার চেষ্টা করেননি। আমার দিদি একটু সরল, হয়তো বোকাও। আপনাকে ঠিকমতো বুঝতে পারেনি। ও কী করে বুঝবে যে, ইউ হ্যাভ ইভিল ডিজাইনস! তাই কাজটা আপনার কাছে সহজ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যদি দিদি তখন একবারও আমাকে জানাত, তা হলে–
তা হলে কী?
তা হলে আপনি আজ এত সুস্থ স্বাভাবিক থাকতেন না। দিদিকেও মরতে হত না।
জয়ন্ত, আজ অনেক কথা হয়েছে। থাক।
আপনার সঙ্গে আমাদের এমনিতেও সম্পর্ক বিশেষ ছিল না। দিদি যদি মরে যায় তা হলে একেবারেই থাকবে না। আমি তো আপনার পরোয়া করি না।
এসব শুনে ধ্রুবর কোনও প্রতিক্রিয়া হচ্ছিল না। রাগ, দুঃখ, অনুতাপ কিছুই নয়। কিন্তু তার খুব অদ্ভুত একটা কথা মনে হচ্ছিল। রেমি যদি মরে যায় তবে নীচের ঘরে একা থাকতে তার কি ভূতের ভয় করবে? এমন নয় যে, ধ্রুবর ভুতের ভয় আছে। কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, এবার ভূতের ভয় হতেও পারে। রেমি মৃত্যুর পর বোধহয় মাঝে মাঝে এসে হানা দেবে স্বপ্নে। গলা টিপে ধরতে চাইবে কি?
ধ্রুব নড়তে পারছিল না আর-একটা কারণেও। তার পিঠের দিকে মেরুদণ্ডের নীচে দুপাশে একটা তীব্র ব্যথা টের পাচ্ছিল সে। নড়তে গেলেই সেই ব্যথা বর্শার ফলার মতো মাজা ভেদ করতে চায়। সেই সঙ্গে তলপেটটা বড্ড ভারী লাগছে।
ধ্রুব অস্ফুট একটা যন্ত্রণার শব্দ করল। জয়ন্ত একবার ফিরে দেখল তাকে।
কিছু বললেন?
না। আমার কোমরে একটা ব্যথা হচ্ছে।
হচ্ছে?–বলে জয়ন্ত একটু হাসে।
হাসছ কেন? এটা কি মজার কথা?
না, আপনার যে যন্ত্রণা-টন্ত্রণা একটু-আধটু হচ্ছে এটা জেনে নিশ্চিন্ত হলাম। আপনার কিছু হোক, খুব খারাপ কিছু এটা আমি আন্তরিকভাবে চাই।
ধ্রুব মুখটা একটু বিকৃত করল। না, তার রাগ হচ্ছে না। খুব শীত করছে তার।
জগাদা বেরিয়ে এসে চারদিকে চেয়ে হঠাৎ তাকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে আসে।
এখানে দাঁড়িয়ে কী করছ?
কী করব আর? দাঁড়িয়ে আছি।
ওটা কে? বউদিমণির ভাই না?
জয়ন্ত বলল, হ্যাঁ। কেন? আমি থাকলে অসুবিধে আছে কিছু?
জগা স্থির চোখে জয়ন্তকে একটু মেপে নিয়ে বলে, অসুবিধে আমাদের কেন হবে? বলছিলাম, দাঁড়িয়ে না থেকে ভিতরে গিয়ে বসতেও পারেন।
না, বেশ আছি। দিদি মরলে বাড়ি চলে যাব।
বাঃ, ভাইয়ের উপযুক্ত কথা বটে।
হ্যাঁ। আগে কখনও শোনেননি তো এরকম কথা! এবার শুনে নিন।
শুনছি ভাই। আমি হলাম জগা। সবাই চেনে। সম্পর্কটা এরকম না হলে ব্যাপারটা অন্যরকম হয়ে যেত।
আপনি যে জগা তা জানি। একজন পলিটিক্যাল উন্মাদের ভাড়া কবা গুন্ডা। কিন্তু তা বলে অত রুস্তমি দেখাচ্ছেন কেন? আমি আপনাদের মতো লোককে কেয়ার করি না।
জগা স্থির নেত্রে কিছুক্ষণ জয়ন্তকে লক্ষ করে। তার হাত-পা কঠিন হয়ে ওঠে। তবে নিজেকে সে খুব সামলে রাখে।
ধ্রুবর দিকে চেয়ে জগা বলে, তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?
একটা ব্যথা হচ্ছে।
চলো, ভিতরে গিয়ে বসবে।
না, জগাদা। ঠিক আছি।
ব্যথাটা খুব বেশি হচ্ছে বুঝতে পারছি। তুমি তো সহজে কাতরাও না।
খুব নয়। সহ্য করতে পারব। ওদিককার কোনও খবর আছে?
না। কেউ কিছু বলছে না। কর্তাবাবু খুব কাঁদছেন। ওই যে হোমিয়ো ডাক্তার এসে গেছে। যাই।
একটা নীল গাড়ি এসে থেমেছে। একজন বুড়ো মানুষ লাঠিতে ভর করে নামছিলেন।
ধ্রুব এক পলক দেখেই বিরক্তিতে চোখ সরিয়ে নিল। রেমি মৃত্যুর দিকে কতটা এগিয়ে গেছে তা জানে না ধ্রুব। তবে এটা জানে, এখন ছোট ছোট মিষ্টি ও সুস্বাদু হোমিয়োপ্যাথির বড়ি দিয়ে লড়াইটা চালানো যাবে না।
জগা খুব শ্রদ্ধার সঙ্গে ডাক্তারকে ধরে ধরে ভিতরে নিয়ে গেল।
ধ্রুবর কোথাও একটু বসতে ইচ্ছে করছিল। বুকের মধ্যে যে একটা চাপ বাঁধা হাঁসফাস ভাব সেটা বায়ুজনিত। একটু বমি করলে চাপটা কমে যেতে পারে। কোমরের ব্যথাটাও। তার স্বাভাবিক শরীর চমৎকার। সহনশীল, চটপটে, শক্তপোক্ত। এইসব ব্যথা-বেদনা ইত্যাদি আনে মদ্যপান। আজকের দিনটায় খেলেই ভাল হত।
লোকলজ্জা ধ্রুবর বড় একটা নেই। সে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেয় এবং ধীরে ধীরে ফুটপাথে উবু হয়ে বসে। গলায় আঙুল চালিয়ে হড়াৎ করে খানিকটা জল তুলে দেয়।
