তার বাবার লাইব্রেরি ঘরটা জিনিসে ঠাসা। চারদিকে লম্বা লম্বা বইয়ের আলমারি। মস্ত বড় ডেস্ক আর রিভলভিং চেয়ার। একটা ডিভান এবং তার সামনে একটা টুল! বসবার জন্য আরও গোটা চারেক গদি আঁটা চেয়ার রয়েছে। কয়েকটা টেবিলে রয়েছে বাঁকুড়ার ঘোড়া থেকে শুরু করে হরেক রকমের শিল্পকর্মের নিদর্শন। কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক জিনিসও রয়েছে। রিভলভিং চেয়ারটায় বসে লতু একটা বই পড়ছে। তার বয়স কুড়ির মধ্যে। চোখে চশমা, অত্যন্ত ফরসা রং, মুখশ্রীও সুন্দর। তবে মুখচোখ তার সবসময়েই ভীষণ সিরিয়াস এবং বিরক্তিতে ভরা। সে যে হাসে খুবই কম তা তার মুখের দিকে একবার তাকালেই বোঝা যায়। বোঝা যায়, এই পৃথিবী বা এই মানবীজন্ম সে একটুও পছন্দ করছে না।
ধ্রুব ঘরে ঢুকতেই লতু চোখ তুলে চাইল।
ধ্রুব তার বোন লতুকে যে ভয় পায় তা নয়, কিন্তু এর সামনে সে একটু অস্বস্তি বোধ করে। মেয়েটা যেন কেমনতরো। তা ছাড়া রেমির সঙ্গে লতুরই ভাব কিছুটা গাঢ়।
ধ্রুব শীতে কাঁপছিল। সেই কাঁপুনি তার গলাতেও প্রকাশ পেল, কিছু খবর আছে নাকি রে, লতু?
লতুর গলা খুবই নির্বিকার। বলে, অবস্থা ভাল নয়।
কী হয়েছে? আজ বিকেলেও তো নরমাল ছিল।
হেমারেজ। অপারেশন করা হতে পারে।
আমি একটু বসব এখানে?
বোসো।–বলে লতু দাদার দিকে একটু যেন তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতেই তাকায়, কখন ফিরেছ?
একটু আগে।–বলে ধ্রুব টেবিলের ওপর টেলিফোনটার দিকে ইশারা করে বলে, কতক্ষণ আগে লাস্ট খবরটা এসেছে?
আধ ঘণ্টা।
কে ফোন করেছিল?
বাবা।
কী বলল?
ওই তো যা বললাম। তুমি গিয়ে শুয়ে থাকে না। আমরা খবর নিচ্ছি।
কেন, আমি এখানে বসে থাকলে কি তোর অসুবিধে হবে?
না, তা হবে কেন?
তবে? ফোনটা আমাকে দে, আমি একটু কথা বলব।
লতু টেলিফোনটা ঠেলে এগিয়ে দিয়ে বলে, বলতে পারো, তবে লাভ নেই। বাবা ওখানে আছেন। খবর কিছু থাকলে উনিই টেলিফোন করবেন বলেছেন।
ধ্রুব তবু টেলিফোনটা তুলে নেয়। লতুর দিকে চেয়ে বলে, নার্সিংহোমের নম্বরটা বল তো।
লতু জবাব দেয় না, একটা প্যাড এগিয়ে দেয়। তাতে লাল পেনসিলে নম্বরটা লেখা।
ডায়াল করতে করতেই ধ্রুব টের পায়, সে কোনও খবর জানতে চায় না। রেমির জন্য চিন্তা করার অনেক লোক আছে। রেমিকে নিয়ে যে উদ্বেগ ও ব্যস্ততা চলছে তার মধ্যে নিজেকে ভেড়াতেও সে চাইছে না। সে চাইছে এই সময়টা একা ঘরে বসে ভয়ংকর সব চিন্তার আক্রমণ থেকে কিছুক্ষণ দূরে সরে থাকতে।
একটা মোটা গলা নার্সিংহোমের নামটা উচ্চারণ করল ওপাশ থেকে।
ধ্রুব খুব দায়িত্বশীল এবং উদ্বিগ্ন স্বামীর মতোই বলল, রেমি চৌধুরীর কনডিশন কেমন? কেবিন নম্বর ফাইভ।
একটু ধরুন।
কিছুক্ষণ চুপচাপ।
তারপর তাকে চমকে দিয়ে ভারী গলাটা বলে, হ্যালো।
বলুন।
কনডিশন একই রকম।
অপারেশন হবে?
হ্যাঁ। ওটিতে নিয়ে যাওয়া হবে কিছুক্ষণ বাদে।
খুব চিন্তার কিছু আছে কি?
ডাক্তাররা বলতে পারেন। আমাদের পক্ষে বলা সম্ভব নয়।
ডাক্তার মজুমদারকে একটু দিতে পারেন টেলিফোনে?
উনি এখন ভীষণ বিজি।
আচ্ছা শুনুন, রেমি চৌধুরীর একটা বাচ্চা হয়েছিল আজ বিকেলে। সেই বাচ্চাটা কেমন আছে?
বাচ্চা ভাল আছে।
আর ইউ সিয়োর?
হ্যাঁ।
থ্যাংক ইউ।
এতক্ষণ লতু একবারও দাদার দিকে তাকায়নি। বই পড়ছিল। এবার তাকিয়ে একটা হাই তুলে আবার বইয়ে মুখ গুঁজল।
ধ্রুবর একটু লজ্জা করছিল। রেমির জন্য যে তার কোনও উদ্বেগ আছে তা বোধ হয় লতু এখনও বিশ্বাস করে না। আর বসে থাকার মানে হয় না। ধ্রুব উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে দোতলার বারান্দাটায় দাঁড়ায়। দোতলায় গোটা সাতেক ঘব আছে। লাইব্রেরি ছাড়া আরও চার-পাঁচটা ঘরে আলো আছে! বাইরে থেকে বাড়িটাকে যতটা ঘুমন্ত পুরী মনে হয়েছিল ততটা নয়।
কিন্তু এখন ওইসব ঘরের কোনওটাতেই গিয়ে দুদণ্ড বসবার বা সময় কাটাবার উপায় নেই।
বোমা মেরে মাঝে মাঝে এই বাড়িটাকে উড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করে তারা সেটা পারছে না বলেই অন্যভাবে সে প্রতিশোধ তুলে নিচ্ছে।
তাতে কাজ হচ্ছে কি? বনেদি বাড়ি এবং ভি আই পি বাবার ভিত একটুও নড়াতে পেরেছে কি সে? ঠিক বুঝতে পারছে না।
ধ্রুব আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে নীচে। আসার পথে দু-একজন চাকরবাকর শ্রেণির লোকের সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে যায় তার। প্রত্যেকের মুখেই একটা উদ্বেগ ও গাম্ভীর্য লক্ষ করে সে। তবে তার সঙ্গে কেউই কথা বলে না বা অভিবাদনও করে না কোনওরকম। এ বাড়ির সবাই বুঝে গেছে, ধ্রুব ফালতু লোক।
নিজের ঘরের ভেজানো দরজাটার সামনে এসে ধ্রুব দাঁড়ায়। ঘরে ঢুকতে কেমন অস্বস্তি আর ভয়-ভয় করছে তার। আশ্চর্যের বিষয়, ভয়টা ভৌতিক। কিন্তু সেরকম ভয়ের কোনও কারণ ঘটেনি। রেমি এখনও মরেনি এবং হয়তো মরবেও না। তা হলে ভয়টা কীসের?
ধ্রুব খুব ভাল ব্যাখ্যা করতে পারছিল না ব্যাপারটা। শরীরের অবস্থা পরিষ্কার চিন্তা করার মতো নয়। আধখাচড়া নেশা করার ফলেই বোধহয় ভয়টা থাবা গেড়ে আছে মাথায়। নেশা না করলে বা পুরো নেশা করলে এরকম হয়তো হত না। এক অদ্ভুত শীতে তার শরীর এখনও থরথর করে। কাঁপছে, সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না।
দেয়ালে শরীরের ভর রেখে সে কিছুক্ষণ চোখ বুজে রইল। চোখ বুজতেই দেখতে পেল রেমির মুখ। নার্সিংহোমের বালিশে আধো-ড়ুবন্ত সেই মুখ শীর্ণ, সাদা এবং তৎসত্ত্বেও সুন্দর। চোখ বোজা, চোখের পাতায় একটা হালকা নীল ছোপ পড়েছে। ঠোঁট শুকনো। দৃশ্যটা দেখে শিহরিত হয় ধ্রুব। চোখ খোলে।
