সে বলল, বেশই তো! কী করবে? মারবে? মারো না!
মারাই উচিত।
বলছি তো মারো। মারো না!
আমি হঠাৎ হাসিয়া ফেলিয়া বলিলাম, মার খাওয়ার অত শখ কেন?
তুমি আমাকে মারলে আমি খুশি হই। মেরে ফেললে আরও খুশি।
এ কাজ আর কোরো না। বাড়ি যাও।
কিশোরী সপাটে আমার মুখের উপর বলিল, রোজ করব। রোজ আসব। রোজ দেখব।
আমার বিস্ময়ের ঘোর আর কাটিতে চায় না। এই মেয়েটি কি উন্মাদ হইয়া গিয়াছে? সামান্য গরিব ঘরের মেয়ে, ইহার তো অত তেজ থাকিবার কথা নহে।
মনুষ্যচরিত্র আমি কোনওকালেই তেমন অনুধাবন করি নাই। আমার কাজে বেশিরভাগ মানুষের অস্তিত্বই গৌণ। তাহারা কখন, কেন কীরূপ আচরণ করে তাহা লইয়া আমি বিশেষ মাথা ঘামাই না। কিন্তু এই কিশোরী আমাকে ভাবাইয়া তুলিল। আমি ইহার মধ্যে স্বাভাবিকতার অভাব লক্ষ করিতেছিলাম, কিন্তু কারণটি অনুমান করিবার সাধ্য ছিল না।
তবে তাহার বাবাকে আমি পরদিন জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনার কন্যাটির মধ্যে কোনও অস্বাভাবিক মানসিকতা আছে কি?
আজ্ঞে, না তো!
সে কি খুব তেজি স্বভাবের মেয়ে? তাও নয়।
বরং স্বভাব নই। কেন বলুন তো?
আমি তাকে হঠাৎ লক্ষ করলাম। সে একটু অদ্ভুত আচরণ করছে। তার প্রতি একটু লক্ষ রাখবেন।
বিবাহযোগ্যা কন্যার দায়গ্রস্ত পিতা ভয় পাইয়া বলিলেন, আজ্ঞে নিশ্চয়ই রাখব। তবে আমি দুবেলা গায়ত্রী জপ করি, অখাদ্য-কুখাদ্য খাই না, নিত্য পূজা-পাঠ আমার বৃত্তি। আমার বংশে কেউ পাগল হবে এটা অস্বাভাবিক ব্যাপার।
আমি একটু হাসিলাম। বলিলাম, তবু লক্ষ রাখবেন।
আচ্ছা।–বলিয়া তিনি চলিয়া গেলেন।
কয়েকদিন পর আমার ভাই আসিয়া আমাকে এক অদ্ভুত ঘটনার কথা বলিল।
তাহা সবিস্তারে লিখিতে চাই না। এইসব পারিবারিক ঘটনার লিখিত বিবৃতি থাকা ভাল নয়।
তবে নলিনী যাহা বলিল তাহা আমাকে চমকাইয়া দিল।
আমি বলিলাম এই মেয়েটির একটি অস্বাভাবিক আচরণ আমিও লক্ষ করেছি।
কীরকম?
মেয়েটি সেদিন আমাদের শোওয়ার ঘরে উঁকি মারতে গিয়ে গাছ থেকে পড়ে যায়।
তারপর?
আমি তাকে শাসন করতে গিয়ে ফ্যাসাদে পড়ে যাই। সে উলটে আমাকে শাসন করে দিল। নলিনী সবিস্তারে কাহিনিটি আমার কাছে শুনিল। সে স্বদেশি করা মানুষ, প্রায় সাধু বৈরাগী। সংসারের কোনও মোহ তার নাই। কিন্তু তাই বলিয়া সে বাস্তববোধ-বর্জিত নয়। ধৈর্য ধরিয়া আমার অভিজ্ঞতার কথা শোনার পর সে বলিল, রোগটি আমি অনেক আগেই ধরেছিলাম।
কীসের রোগ?
দাদা, এ দেহের রোগ নয়। রোগটা মনের।
আমি সরল বিশ্বাসে বলিলাম, আমারও তাই বিশ্বাস। মেয়েটা পাগল।
নলিনী হাসিল। বলিল, পাগল বটে। তবে সে পাগলামি অন্যরকম।
কীরকম?
চিত্তদৌর্বল্যের পাগলামি।
সে আবার কী?
দাদা, এ মেয়েটিকে তুমি কখনও আঘাত কোরো না। এর মনে ব্যথা বা দাগা দিয়ো না।
ওসব বলছিস কেন?
এ মেয়েটি তোমাকে তার জীবনের মধ্যে একটা অত্যন্ত বড় জায়গা দিয়েছে।
আমাকে! আমাকে!
নিজেকে তুমি যত তুচ্ছই ভাবো, কারও কারও কাছে তুমিই হয়তো দেবতার মতো মহান।
০৫২. খুব নরম খুব সবুজ ঘাস
রেমি খুব নরম খুব সবুজ ঘাসের ওপর দিয়ে হাঁটছে এখন। পা ডুবে যাচ্ছে কোমল সব স্পর্শের মধ্যে। শিউরে উঠছে গা। চারদিকে কী গভীর সবুজ সব টিলা। মাঝখানে একটা স্বপ্নের মতো অবিশ্বাস্য সুন্দর উপত্যকা। এত সুন্দর যে বিশ্বাস হয় না, ভয় করে। এরকম জায়গায় তো কখনও আসেনি আগে রেমি। কে নিয়ে এল তাকে!
পাশে পাশে একজন পুরুষ হাঁটছে। খুব কাছে। খুব গা ঘেঁষে। টের পাচ্ছে রেমি, কিন্তু তার মুখের দিকে সে তাকায় না। যেন জানে কে। কিংবা যেন জানতে নেই কে। কেউ একটা হবে। তবে পুরুষটির গায়ে কোনও গন্ধ নেই। তার কোনও ছায়া নেই। রেমি তবু নিশ্চিন্ত। এরকমই যেন হওয়ার কথা।
এত সুন্দর জায়গা তবু তারও কি একটু দোষ থাকতেই হবে? না থাকলে হত না? উপত্যকার ঢাল বেয়ে, নরম ঘাস মাড়িয়ে যেখানে এসে পৌঁছল রেমি, সেখানে একটা ছোট নদী। আঁকা বাঁকা। কিন্তু তাতে একটা রক্তিম স্রোত বয়ে যাচ্ছে। একটা ঝোপের ধারে পড়ে আছে একটি প্রাণ-প্রতিম শিশুর নিথর দেহ।
রেমি থেমে সামান্য ভয়ের একটা শব্দ করল। অমনি একটা পুরুষ হাত এসে চেপে ধলল তার মুখ। সেই হাতে সিগারেটের তীব্র গন্ধ। না, সিগারেট নয়। অ্যালকোহল? না, অন্য কিছু।
রেমি লোকটার মুখের দিকে তাকাল না। নদীর দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। উলটো দিকে হাঁটতে লাগল। পাশাপাশি গা ঘেঁষে পুরুষটিও।
রেমি বলল, ট্রেন আসতে এত দেরি করছে কেন?
পুরুষের গলাটা গমগম করে বলে উঠল, আজ দেরি হবে।
কোথা দিয়ে ট্রেন আসবে তা জানে না রেমি। এখানে তো কোনও রেল লাইন নেই, স্টেশন নেই। তবু বলো।
না, আছে। ভাবতে না ভাবতেই সে দেখল, একটা ছোট্ট প্ল্যাটফর্ম। লাল মোরমে ছাওয়া। অনেক কৃষ্ণচূড়া ফুল গাছ থেকে লাল মোরমে ঝরে পড়ে আছে। একটা সবুজ টিউবওয়েল। কোনও মানুষ নেই। যাত্রী নেই। পয়েন্টসম্যান বা কুলি নেই। স্টেশনের রঙিন ঘর থেকে অবিরল টরেটক্কার শব্দ আসছে।
খুব নির্বিকার মনে রেমি ধীরে ধীরে পুরুষটির পাশাপাশি পায়চারি করতে লাগল মোবমের ওপরে। এ মা, সে জুতো বা চটি পরে আসেনি আজ! খালি পায়ের নীচে মোবমের দানা কিরকির করছে। সুড়সুড়ি দেয়।
সে সরাসরি তাকায় না। কিন্তু পাশ-চোখে লক্ষ করে, তার সঙ্গী পুরুষটি আকাশের দিকে চেয়ে আছে। চেয়ে থাকারই কথা যেন। রেমি নিজেও আকাশের দিকে তাকায়। সেখানে রক্তমেঘ। সমস্ত দিগন্ত জুড়ে ছড়িয়ে আছে ভয়াবহ লাল। এত লাল রং কোথাও জড়ো হতে আর দেখেনি রেমি।
