আমি তো পালাতে চাই না বাবা!
চাইবে কেন মা? তুমি চঞ্চলা হলে এ বাড়ির লক্ষ্মীও চঞ্চলা হবেন। আমি জানি একদিন তুমি এক খুঁটোয় বাবা ব্যাটাকে বাঁধতে পারবে। আমি সেই আশাতেই বেঁচে আছি।
রেমি মাথা নিচু করে রইল। দুই চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল পড়ছিল অবিরল।
কৃষ্ণকান্ত অন্যমনস্ক ছিলেন বলেই বোধহয় ব্যাপারটা লক্ষ করলেন না। কিংবা লক্ষ করলেও লক্ষ করার ভান করলেন। ধীর গলায় বললেন, আমার আরও দুটো ছেলে আছে, কিন্তু তাদের সম্পর্কে আমি খানিকটা নিশ্চিন্ত। বড়জন মিলিটারি, ত্যাজ্যপুত্র, তার কথা ভেবে লাভ নেই। ছোটটা মোটামুটি নিরাপদ চরিত্রের ছেলে। আমার একমাত্র প্রবলেম তোমার স্বামীটিকে নিয়ে।
জানি বাবা।
তুমি তো জানবেই, মা। দামড়াটা আমার যত বড শই হোক, একথা বলতে হবে যে, ওর মতো স্বচ্ছ বুদ্ধি ও প্রাঞ্জল মন আমার অন্য দুই ছেলের নেই। কিন্তু কেন যেন ব্যালান্সড় হল না। কোথায় চরিত্রের মধ্যে একটা ভারসাম্যের অভাব রয়ে গেল। তাই না?
হ্যাঁ।
ওকে কি তোমার পাগল বলে মনে হয়? উন্মাদ পাগল না হলেও প্রচ্ছন্ন পাগল?
প্রচ্ছন্ন পাগল কথাটা রেমি এই প্রথম শুনল। কান্নার মধ্যেও একটু হাসি পেল তার। মাথা নেড়ে শুধু হা জানাতে পারল সে। কথা বলতে পারল না।
কৃষ্ণকান্তও একটু ম্লান হেসে বললেন, এই পাগলামির কোনও চিকিৎসাও তো নেই। এখন ওর সমস্ত রোখটা গিয়ে পড়েছে তোমার ওপর। তোমাকে যন্ত্রণা দিচ্ছে, কষ্ট দিচ্ছে।
রেমি ম্লানমুখে বলল, মেয়েরা তো কষ্ট করার জন্যই জন্মায়। তাতে কিছু নয় বাবা। তবে একটা জিনিস আমি সইতে পারি না।
কৃষ্ণকান্ত উদ্বিগ্ন হয়ে বলেন, কী সইতে পারো না? দামড়াটা কি গায়ে হাত-টাতও তোলে নাকি? চাবকে আমি ওর–
রেমি আর্তস্বরে বলে, না না, তা নয়।
তা হলে কী?
আপনি দেখবেন বাবা, আমাকে যেন এ বাড়ি থেকে কেউ জোর করে তাড়িয়ে না দেয়।
তোমাকে তাড়াবে?–কৃষ্ণকান্ত হতভম্বের মতো বলেন, তোমাকে? কার এত বুকের পাটা?
আপনি অত অস্থির হবেন না।
কে তোমাকে তাড়াতে চেয়েছে? ওই দামড়াটা? রাজু? ওরে রাজু? দেখ তো মেজদাদাবাবু ঘরে আছে কি না! না থাকলে যেন এলেই আমার সঙ্গে দেখা করে।
রেমি তটস্থ হয়ে বলে, আমি তো বলিনি যে আপনার ছেলে আমাকে তাড়াতে চেয়েছে।
ভদ্রলোকের মেয়েরা কি সব কথা মুখে আনতে পারে! দামড়াটা যে এত ছোটলোক হয়ে গেছে। আমার তা জানা ছিল না। আর যাই করে বেড়াক মনটা চওড়া ছিল।
উনি বলেননি।
তা হলে কে? বলো, তার নাম বলো। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে তাকে এ বাড়ির পাট গোটাতে হবে।
রেমি এই বিস্ফোরক পরিস্থিতিতেও হেসে ফেলে।
হাসছ মা? হাসির কারণ কী?
আপনার অকারণ উতলা হওয়া দেখে।
কেউ কিছু বলেনি তোমাকে?
না। আমি বলছিলাম এমন পরিস্থিতি যাতে না হয় যে, আমাকে এ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয়।
সেটা কেন হবে বলো তো! হতে কি পারে না?
কৃষ্ণকান্ত কিছুক্ষণ থম ধরে বসে রইলেন। তারপর হঠাৎ বললেন, ঠিক আছে। আমি আজই উকিল ডাকছি। এই বাড়ি তোমার নামে লিখে-পড়ে দিই। তারপর আর এ বাড়ি ছাড়ার কোনও প্রশ্নই উঠবে না।
রেমি ভয় পেয়ে বলল, না না, তার দরকার নেই।
তুমি আমাকে বারবার নিরস্ত করছ কেন মা?
আপনি তো আছেন বাবা। আমার আর ভয় নেই।
আমি চিরকাল থাকব না। তখন?
আপনি না থাকলে এই ভূতের বাড়িতে কি আমিই থাকতে পারব?
কৃষ্ণকান্তর চোখ ছলছল করে উঠল। কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলেন না। তারপর দুধভাতের শেষ অংশটুকু রেখেই উঠে গেলেন আঁচাতে।
রেমি হাফ ছেড়ে বাঁচল। ভালবাসারও দমবন্ধ করা এক আক্রমণ আছে। সে তার শ্বশুরের কাছ থেকে যা পেয়েছে তা আর কারও কাছ থেকেই কখনও পায়নি। এরকম একমুখী গভীর স্নেহের কোনও অভিজ্ঞতা ছিল না বলে তার আজ দমবন্ধ লাগছিল এতক্ষণ।
রেমি দুপুরে এক কাপ কফি খেয়ে অপেক্ষা করতে লাগল নীচের ঘরে। ধ্রুব আসুক, একসঙ্গে খাবে।
খিদে, ক্লান্তি, নিদ্রাহীনতায় রেমির শরীর বড় অবশ লাগছিল। কেন যে এই কারাগারে নিজেকে আবদ্ধ রেখেছে এতদিন তা কিছুতেই যুক্তি দিয়ে বোঝে না সে। শ্বশুরের স্নেহ তো গৌণ ব্যাপার। যাকে নিয়ে সম্পর্ক রচিত হয় সেই মূল মানুষটাই যদি আড় হয়ে থাকে, যদি পাগল হয়, স্নেহহীন হয়, তবে এক কোটি মানুষের ভালবাসাও তো মূল্যহীন। তবু রেমি কে আছে? কোন যুক্তিগ্রাহ্য কারণে?
রেমি ভেবে দেখেছে যুক্তির পথ দিয়ে সব সময়ে তো হাটে না মানুষ। তার মন অনেক সময়েই অদ্ভুত আচরণ করতে থাকে। কিছুতেই তাকে বাগে আনা যায় না।
দুর্বল শরীর জুড়ে কখন নেমে এল ঘুম, রেমি টের পায়নি। ধ্রুবই তাকে জাগাল।
ওঠো ওঠো।
ধড়মড় করে উঠে পড়ে রেমি, কী হয়েছে গো?
কিছু হয়নি। মুখ অত শুকনো কেন?
শুকনো?–বলে রেমি নিজের মুখে একটু হাত বুলিয়ে বলে, কোথায় শুকনো? তুমি এতক্ষণে এলে?
এইমাত্র।
খাওনি তো?
না।
চলো, খাবে চলো। আমি আজ তোমার জন্য বসে আছি।
আমার জন্য? কেন?
ইচ্ছে হল, তাই। চলো, আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে।
ধ্রুব একটু হাসল। তারও মুখ শুকনো। হাসিটা ভাল ফুটল না। একটা হাই তুলে বলল, খাব। তাড়া কীসের?
তোমার নেই। আমার আছে।
চলো, আজ বাইরে কোথাও খাওয়া যাক।
ওমা! কেন?
এখন তিনটে বাজে। এই অবেলায় ঠাকুর-চাকরদের উদ্বস্ত করার দরকার কী? ওরা একটু বিশ্রাম নিচ্ছে নিক না।
ওদের উদ্ব্যস্ত করব কেন? আমি বুঝি পারি না!
বাড়ির একঘেয়ে খেতে ভাল লাগে না। চলো, বাইরে যাই।
