রেমি স্নিগ্ধ চোখে শ্বশুরের মুখের দিকে একবার দৃষ্টিক্ষেপ করে চোখ নামিয়ে নেয়।
কৃষ্ণকান্ত একটু মজা পাওয়ার হাসি হেসে বললেন, বাবা ছিলেন খুব নিষ্কর্মা লোক। সারাদিন বসে-টসেই থাকতেন আর খুব ভাবতেন, যারা কাজ করে না এবং বৃথা চিন্তা করে তাদের বুড়োমিতে পেয়ে বসে খুব অল্প বয়সেই। আমার ভয় হচ্ছে আমাকেও না আবার ওই বুড়োমিটা চেপে ধরে।
আপনি তো আর নিষ্কর্মা নন, বাবা।
তা নই। আর নই বলেই এই বুড়ো বয়সেও আমাকে বুড়োমিতে পায়নি এতদিন। কিন্তু এবার মন্ত্রিত্ব চলে গেলে মা, একটু নিষ্কর্মার মতোই লাগবে নিজেকে।
মন্ত্রিত্ব ছাড়াও তো আপনি কত কাজ করেন।
করি বই কী মা। কিন্তু ব্যাপারটা কী জানো, মন্ত্রী আছি বলেই সেই সুবাদে পাঁচটা কাজ জুটে যায়। গদি গেলে তখন আর কে পোঁছে বলো? কাজকর্ম কমে গেলে বাজে চিন্তা এসে জোটেই।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন কৃষ্ণকান্ত।
রেমি একটু সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে বলল, আপনার কাজ একটু কমাই উচিত বাবা, যা খাটছেন, আমার তো ভয় হয় অসুখ করবে বুঝি।
দূর পাগলি, কাজ করলে কখনও অসুখ করে? শরীরটা ভগবান দিয়েছেন কাজ করার জন্যই, বসে থাকার জন্য নয়। এটাকে নিংড়ে যত পারি কাজ আদায় করে নিলে তবেই শরীর ধারণ করার। একটা মানে হয়। নইলে বৃথা শরীর পুষে রেখে লাভ কী?
কৃষ্ণকান্ত খুব সামান্যই খান। কিছুদিন হল মাছ মাংস খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। ঘি-মাখা ভাত শেষ করেই অন্যসব পদ সরিয়ে রেখে দুধ আর কলা দিয়ে ভাত মাখতে মাখতে একটু হেসে বললেন, তুমি আমার মা বলেই একটা কথা আজ তোমাকে বলতে ইচ্ছে করছে। আমার বাবা হেমকান্ত চৌধুরী সম্পর্কে তুমি কিছু শুনেছ? কোনও গুজব?
রেমি শুনেছে। কিন্তু মুখে তা স্বীকার না করে নিপাট ভাল মানুষের মতো বলল, না তো বাবা। কৃষ্ণকান্ত মুখটা গম্ভীর করে বললেন, শোনাটাই স্বাভাবিক ছিল। তোমাকে বলেই বলি মা, তার একবার পদস্খলন হয়েছিল।
রেমি সিটিয়ে রইল লজ্জায়।
কৃষ্ণকান্ত রেমির দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে দূরাগত এক চোখে সামনের দিকে চেয়ে আস্তে আস্তে বললেন, পঁয়তাল্লিশ-ছেচল্লিশ বছর বয়সে যে কোনও স্বাস্থ্যবান পুরুষেরই পূর্ণ যৌবন থাকে। তিনি নিজেকে বুড়ো ভাবতে শুরু করেছিলেন বটে, কিন্তু সত্যিই তো তা নয়। বিপত্নীক, সুপুরুষ এবং খুব সজ্জন প্রকৃতির এই মানুষটির পদস্খলন ঘটল সেই বয়সে। সকলেই অবাক হয়ে গিয়েছিল। ছিছিক্কারও পড়ে গিয়েছিল চারদিকে। কিন্তু আমি তার কোনও দোষ দেখতে পাইনি। আজও, এতদিন পরেও অনেক বিচার, অনেক বিশ্লেষণ করে মনে হয়েছে, কাজটা আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে যেমনই দেখাক, তার দিক থেকে প্রয়োজন ছিল।
রেমি কিছু বলল না। টেবিলের ওপর আঙুলের দাগ দিতে থাকল। কৃষ্ণকান্ত ধীরে ধীরে বললেন, জীবনে এক-আধবার পদস্খলন অনেকেরই ঘটে কিন্তু তা দিয়ে লোকটার বিচার করে মূর্খরা। বুঝলে মা!
প্রসঙ্গটা কেন উত্থাপন করেছেন কৃষ্ণকান্ত তা যেন আচমকাই বুঝতে পারল রেমি৷ বুঝে কেঁপে উঠল ভিতরে-ভিতরে।
কৃষ্ণকান্ত ভারী মোলায়েম গলায় বললেন, হেমকান্তর নিলে যারা করে বেড়াত তাদেরও খবর আমি রাখতাম। তারা কেউই খুব নিষ্কলঙ্ক ছিল না। কিন্তু মানুষের ধর্মই হল, নিজের দোষ টপকে অন্যের দোষ দেখা।
রেমি মৃদুস্বরে শুধু বলল, ঠিকই তো।
কৃষ্ণকান্ত দুধভাতটুকু অনেকক্ষণ নাড়াচাড়া করছিলেন। হঠাৎ নির্বিকার গলায় জিজ্ঞেস করলেন, তোমার সময় কেমন কাটছে মা?
ভালই তো।
খুব ভাল যে নয় সে আমি জানি। আর সেইজন্যই রাজাকে বলেছিলাম তোমাকে একটু গান-টান শেখায় যেন। তা রাজা আসে তো?
রেমির ভিতরটা ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল। শরীরের সমস্ত তন্ত্রীতে বয়ে গেল একটা ঝড়। মাথা নিচু রেখে সে প্রাণপণে নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করতে করতে বলল, মাঝে মাঝে।
মাঝে মাঝে? কেন সে কি খুব নবাবপুর হয়েছে নাকি? তাকে আমি বলেছি পারলে রোজ যেন আসে। গান শেখাবে, একটু কম্প্যানিও দেবে। আমাদের দামড়াটা কবে কোথায় যায়, কবে আসে তার তো ঠিক নেই। তোমার সময় কাটে কী করে?
রেমি তার অদ্ভুত চোখ দুখানা তুলে কৃষ্ণকান্তকে একপলকে দেখল। বাপের বাড়ি খুব বেশি দূর নয় তার, বিয়েও এমন কিছু বেশিদিন আগে হয়নি, তবু বাপের বাড়ির লোকেরা যে তার পর হয়ে গেছে, দূরত্বটাও বেড়ে গেছে অনেক, তার কারণ এই মানুষটি। রেমি জানে লোকটা বড় সোজা নয়। ঝানু কূটনীতিক, দোষে গুণে তৈরি হওয়া মানুষ, কিন্তু এই মানুষটির মধ্যে এক অগাধ গভীর দিঘির মতো আশ্রয় আছে তার। সে এও বোঝে, এ লোকটার মা ডাকের মধ্যে কোনও চাতুরি নেই, কৃত্রিমতা নেই। মা কীভাবে ডাকতে হয় তা মাতৃহীন এই লোকটা সত্যিই শিখেছিল।
রেমি মৃদু একটু হেসে বলল, রাজা ব্যস্ত মানুষ। ওর অনেক ফাংশন থাকে। রেডিয়ো প্রোগ্রাম থাকে। ফিলমের কাজ থাকে।
জানি। কিন্তু সেসব ওর জন্য করে দিল কে? কার খুঁটির জোরে এখন করে খাচ্ছে তা জানো?
না তো বাবা!
সেটা তো বলবে না, প্রেস্টিজ যাবে যে! তাছাড়া কৃতজ্ঞতার ল্যাঠাও তো আছে। যাক গে, রাজা পারলে আমি আর কাউকে গানের মাস্টার রেখে দেব। ভাল করে শেখো। একটা কিছুতে মনপ্রাণ ঢেলে দাও।
আপনি আমার জন্য এত ভাবেন কেন বাবা?
আমি না ভাবলে কে ভাববে বলো। আমার স্বার্থও তো আছে। বুড়ো বয়সে একটি মায়ের মতো মা পেয়েছি। কিন্তু দামড়াটার দোষে বুঝি আমার মা তিষ্ঠোতে না পেরে শেষ পর্যন্ত পালায়। সেই ভয়েই তো তোমাকে এত বাঁধবার চেষ্টা।
