আমার যে রেস্টুরেন্টে খেতে ঘেন্না করে।
ভাল রেস্টুরেন্টে যাব। ঘেন্না করবে না।
তোমার অন্য কোনও মতলব নেই তো!
না। কী মতলব থাকবে?
সকালে আমাকে বিশ্রী অপমান করে গেছ। সারা রাত কষ্ট দিয়েছ।
তবু তোমার মন বিদ্রোহী হচ্ছে না?
হচ্ছে না আবার! খুব হচ্ছে।
তার লক্ষণ কোথায়?
কী লক্ষণ দেখতে চাও?
একটা বিস্ফোরণ। মাইরি দেখাবে?
পারব না, যাও।
০৫১. কুঞ্জবনে আর এসো না
কুঞ্জবনে আর এসো না বুঝলে?
কেন বলো তো!
এটা তোমার জায়গা ছিল। একা একা বসে ভাবতে। আমি ঠাট্টা করে নাম দিয়েছিলাম কুঞ্জবন। কৃষ্ণ থাকত, কিন্তু রাধা আসত না। আজকাল রাধা আসে, কৃষ্ণও থাকে। তুমি পালাও।
এসব কী হচ্ছে, মনু? আমার যে হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে।
সেইজন্যই তো তোমাকে সাবধান করছি। পৃথিবীর অনেক ঘটনা সম্পর্কেই তো তুমি চোখ বুজে থেকেছ এতকাল। এটাও চোখ বুজে এড়িয়ে যাও। কিন্তু এ তো আমার পরিবারের কলঙ্ক, মনু।
তা জানি। কিন্তু তোমার বা আমার কিছু কবার নেই।
কেন নেই?
যদি বাধা দাও তবে মরিয়া হয়ে একটা কিছু করে ফেলবে।
কী করতে পারে বলো তো!
আত্মহত্যা করতে পারে। পালিয়ে যেতে পারে।
তা বলে চুপ করে থাকতে হবে?
অন্য কেউ হলে আমি চুপ করে থাকতে বলতাম না। তুমি বলেই বলছি। তুমি শান্ত, ভাবুক মানুষ। এসব সামাল দেওয়া তোমার কাজ নয়।
তার মানে তুমি আমাকে অপদার্থ ভাবো।
যা ভাবি তাই ভাবি। এখন তো নতুন করে ভাবতে পারব না।
হেমকান্ত কিছুক্ষণ গম্ভীর বিষণ্ণ মুখে বসে থেকে বললেন, আমি সত্যিই অপদার্থ, মনু।
তুমি কী তা তো এ জন্মে সবটা জানা যাবে না। তবে যাই হও, তুমি যেমনটি, ঠিক তেমনটিই থেকো।
তা না হয় থাকলাম, কিন্তু ওদের যে রোখা দরকার, মনু। তুমি একটা কিছু করতে পারো না?
রঙ্গময়ি মাথা নেড়ে বলে, না গো। তুমিও পারো না, আমিও পারি না। আমাদের সেই জোর নেই।
কেন নেই?
বোঝো না? একটু তলিয়ে দেখো, বুঝতে পারবে।
হেমকান্ত যথাসাধ্য তলিয়ে দেখলেন, কিন্তু বুঝতে পারলেন না। বললেন, আমি বুঝতে পারছি, মনু।
সোজা তো।
বুঝিয়ে দাও।
তোমার আর আমার সম্পর্ক নিয়েও লোকের সন্দেহ আছে।
হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, লোকের মন বড় নোংরা, মনু।
সে তুমি যাই বলো, কথাটা তো সত্যি। তাই তুমি বা আমি কারও নৈতিক চরিত্র নিয়ে কথা বলতে পারি না। যদি বলি তবে ওরাও আমাদের বিরুদ্ধে আঙুল তুলে বলবে, তোমরা কি সাধু?
বলবে বলছ?
নিশ্চয়ই বলবে। বিশাখা একদিন বুঝি শচীনকে আলতো করে কী একটু বলেছিল চপলাকে নিয়ে। শচীন উলটে বিশাখাকে চোটপাট করেছে। বলেছে, চৌধুরীবাড়ির অনেক কেচ্ছাকাহিনি আছে।
বিশাখা বলেছিল তা হলে?
একটু বলেছিল। কিন্তু বেচারাকে অপমান হতে হয়েছে।
ওরা কতদূর এগিয়েছে, মনু?
আমি কি আড়ি পাতি নাকি যে জানব?
তুমি জানো। বলছ না।
খুব বেশি জানি না। তবে হাবভাব দেখে মনে হয় শচীন আর চপলা দুজনেই একটু বেশি বেপরোয়া। কাউকে গ্রাহ্য করছে না। করবেও না।
কনককে একটা খবর পাঠাব?
তুমি বোকা।
কেন?
কনকের কিছুই করার সাধ্য নেই। তাকে আমি চিনি। চপলা ওকে যেমন ভেড়া বানিয়েছে, ও তেমন ভেড়াটি হয়েই থাকবে। তুমি যদি ওর বউয়ের নামে ওকে কিছু বলল, ও বিশ্বাস করবে না। উলটে বরং তোমার ওপর রেগে যাবে।
কিন্তু কলকাতা যাওয়ার আগে কনকের সঙ্গে নাকি বড় বউমার ঝগড়া হয়েছিল?
হয়েছিল। তাতে কি প্রমাণ হয় যে, কনক পুরুষসিংহ? আর চপলা ওর ক্রীতদাসী?
তা বলছি না। ঝগড়া হয়েছিল কেন জানো?
তোমার মেনিমুখো ছেলে বউ ছাড়া থাকতে পারে না। তাই বউকে টানাটানি করেছিল যাওয়ার জন্য। চপলা যেতে চায়নি বলে ঝগড়া। কিন্তু সেই ঝগড়ায় কার হার হয়েছে তা তো দেখছই!
বিষণ্ণ হেমকান্ত গম্ভীর মুখে বললেন, হুঁ।
সংসারটা হল কাঁথার উলটো পিঠের মতো। সামনেটা বেশ নকশাদার, সাজানো গোছানো সিজিল মিছিল। কিন্তু উলটোপিঠে যত সুতোর গিট, উলটোপালটা ফেঁড়। তোমার তো তলার দিকটা দেখবার দরকার নেই। যা হচ্ছে হোক।
শচীনকে যদি বরখাস্ত করি?
রঙ্গময়ি একটু হেসে বলে, তাতে তোমারই ক্ষতি। সে তোমার বিষয়-সম্পত্তি যক্ষের মতো আগলাচ্ছে। তাকে তাড়ালে আবার পাঁচ ভূতে লুটে খাবে। তাছাড়া লাভও নেই। বরখাস্ত করলে ওদের রোখ আরও বাড়বে। বেহেড হয়ে এমন কাণ্ড করে বসবে যে, তুমি মুখ দেখাতে পারবে না।
খবরটা কতদূর রটেছে জানো?
রটেছে। ভালই রটেছে। এসব কি চাপা থাকে?
আমার ধারণা, তুমি ইচ্ছে করলে এর মীমাংসা করে দিতে পারো! তোমার তো অনেক বুদ্ধি।
আমার ওপর তোমার অনেক বিশ্বাস। কিন্তু বললামই তো আমি সরাসরি কিছু করতে পারি না। আমার মনেও তো পাপ।
হেমকান্ত সামান্য উম্মার সঙ্গে বললেন, তোমার মনে পাপ থাকবে কেন মনু? তুমি এমন কী অন্যায় করেছ?
অন্যায় নয়? ও বাবা, কত কলঙ্ক আমার!
হেমকান্ত মাথা নেড়ে বললেন, আমাকে যা-তা একটা কিছু বোঝালেই যে আমি বুঝব অত বোকা আমি নই, মনু। আমি বিপত্নীক, তুমি এখনও কুমারী। যদি চাই তো আমরা বিয়ে করতে পারি। তাতে কোনও নৈতিক অপরাধ হয় না, বিশ্বাসঘাতকতাও হয় না, পাপও হয় না। বরং অরক্ষণীয়া কন্যাকে উদ্ধার করার পুণ্যই হয়। আমাদের সঙ্গে ওদের তুলনা করছ কেন? চপলা ঘরের বউ, ছেলেমেয়ের মা, সে আর তুমি কি এক?
রঙ্গময়ি হেমকান্তর কথায় মাথা নিচু করে লাজুক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ মৃদু হেসে বলল, খুব বুদ্ধি হয়েছে আজকাল, না?
