সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, শশিভূষণের মামলা উঠতেও দেবি নেই। হেমকান্ত তাকেই শশিভূষণের উকিল হয়ে বরিশাল পাঠাবেন বলে স্থির করেছেন। অথচ সেই মামলার প্রস্তুতি হিসেবে যেসব আরগুমেন্ট সাজানো উচিত ছিল তা আজও করে উঠতে পারেনি শচীন।
বাড়ির লোকের সঙ্গে সে ভাল করে কথা বলতে পারে না। বড্ড অন্যমনস্ক থাকে। তিনবার ডাকলে সাড়া দেয়। এরকম চলতে থাকলে সে অচিরেই ধরা পড়ে যাবে। কী লজ্জা!
সুফলা একদিন বলেই ফেলল, দাদা কেবল বুঝি চৌধুরীদের কুটনি মেয়েটার কথা ভাবো!
তোকে কে বলল? ফাজিল!
সুফলা গোঁজ হয়ে বলে, ভীষণ পাজি, জানো না তো?
আমি মামলা-মোকদ্দমার কথা ভাবি। ওসব ভাববার সময় কই?
ওদের বাড়ির বউ আমাদের বাড়ি আসে, জানো?
একটু কেঁপে উঠে শচীন বলল, আসে! কখন?
রোজ দুপুরের দিকে। তুমি বেরিয়ে গেলে।
কী চায়?
কী আবার চাইবে! ধরেবেঁধে তোমার সঙ্গে বিশাখার বিয়ে দিয়ে তবে ছাড়বে।
আমি বিয়ে করলে তো!
তুমি ওবাড়ি যাও, সবাই তো জানে।
সে যাই কাছারির কাজে। টাকা দেয়।
টাকা দিলেই কী? ওবাড়ির চৌকাঠও ডিঙোনো উচিত নয়।
তোকে এত পাকা কথা শেখাচ্ছে কে?
সুফলা সাহস করে দাদাকে অনেকটা বলেছে। এবার ভয় পেয়ে চুপ করে গেল।
বউঠান এসে কী বলে?—শচীন জিজ্ঞেস করে।
কিছু বলে না। ধানাই-পানাই গল্প করে মার সঙ্গে। আসল মতলব তো আমরা জানি।
জানিস তো জানিস, খবরদার দুম করে অপমান-টপমান করে বসিস না যেন। যা কুঁদুলি তোরা!
আমরা অপমান করব কেন? আমরা কি ওদের মতো যে লোককে মানুষ বলে মনে করি না!
সেদিন বিকেলে দেখা হল চপলার সঙ্গে। রোজই কাছারির কাজ শেষ হলে নীচের তলার একটা ঘরে তার সঙ্গে দেখা হয় চপলার। ব্যাপারটা দৃষ্টিকটু হয় কি না তা ভেবে দেখার চেষ্টা করেনি শচীন। আর ভাবতে ভাল লাগে না।
সে চপলাকে জিজ্ঞেস করল, আপনি যে আমাদের বাড়িতে প্রায়ই যান তা তো বলেননি কখনও আমাকে?
চপলা বিষণ্ণ গলায় বলল, কী সুন্দর সংসার আপনাদের! ভারী শান্তি, শ্রী। এরকম বাড়িতে যে কেন বিশাখা যেতে চায় না তা আমার মাথায় ঢোকে না।
০৫০. এত ভয় রেমি জীবনেও পায়নি
এত ভয় রেমি জীবনেও পায়নি, মাতাল ধ্রুবকে সে ততটা ভয় পেত না, যতটা পেল এই পাগল ধ্রুবকে। নির্বিকার মুখে যে পুরুষ তার বিয়ে করা বউকে অন্য পুরুষের সঙ্গে ঘর করার পরামর্শ দেয় এবং মৌলিক সততার দোহাই পাড়ে তার পাগলামি সম্পর্কে সন্দেহ থাকতে পারে না।
সেই রাতে ধ্রুব ঘুমোল না, কাঠের মত শক্ত হয়ে বসে রইল চেয়ারে। মশার কামড় খেল। অনেক। সামনে খোলা একখানা বই। একটা লাইনও পড়ছিল না সে। রেমি বিছানায় পড়ে রইল চুপ করে। রাত দশটা নাগাদ জগা এসে খোঁজ নিয়ে গিয়েছিল তার। সাড়ে দশটা নাগাদ খাওয়ার জন্য ডাক এসেছিল। তারা দুজন নড়েনি।
খুব ভোরবেলায় ধ্রুব বই বন্ধ করল। হাই তুলে উঠে বাইরে বেরোনোর পোশাক পরল।
রেমি ধড়মড় করে উঠে বলল, কোথায় যাচ্ছ?
একটু জগিং করে আসি। শরীরটা ফিট রাখতে হবে।
তুমি কোথাও চলে যাবে না তো!
গেলেই বা ক্ষতি কী? আজ থেকে আমি তোমার কেউ নই।
কথাটা অনেকবার বলেছ। আর বোলো না।
আচ্ছা বলব না। তুমি ঘুমোও।
তুমি কোথায় যাচ্ছ? পালাবে না তো!
না। আমার জীবনের প্রথম ও শেষ ঘটকালির জন্য এখন কিছুদিন কলকাতায় থাকব। তোমাদের ব্যাপারটা হয়ে গেলে কিছুদিনের জন্য উধাও হতে পারি।
রেমি এই পাগলামির কী জবাব দেবে? ভয়ে চুপ করে রইল।
ধ্রুব জগিং করতে গেল, না আর কোথাও, তা বোঝা যাচ্ছিল না। কারণ দুপুর গড়িয়ে যাওয়ার পরও তার ফেরার নাম নেই।
সাধারণত রেমি ধ্রুবর জন্য অপেক্ষা না করেই খেয়ে নেয়। উদ্ধৃঙ্খল পুরুষের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া শক্ত, মানাতে গেলে প্রাণ যায়। তাই রেমি তার সময় মতো ভাত খেয়ে নেয়। ধ্রুব তার সময় মতো ফেরে, কখনও খায়, কখনও খায় না।
কিন্তু রেমি আজ খেল না, অপেক্ষা করতে লাগল।
দুপুরে এবং রাত্রে কৃষ্ণকান্তর খাওয়ার সময়ে রেমি উপস্থিত থাকে। এটা রেওয়াজ। আজ রেমি ওপরে না উঠে নীচের ঘরে চুপচাপ শুয়ে ছিল। মাঝে মাঝে কাঁদছে। বুক জ্বলছে জ্বালায়।
জগা এসে দুপুরে দরজায় টোকা দিয়ে বলল, বউদি, ওপরে যাও। বড়কর্তা ডাকছে।
এই একজনের ডাক রেমি কখনও উপেক্ষা করতে পারে না। সম্ভবত কৃষ্ণকান্ত খেতে বসেছেন এবং বউমাকে না দেখে উদ্বিগ্ন।
রেমি যথাসাথ্য নিজের মুখ থেকে অনিদ্রার ক্লান্তি ও কান্নার চিহ্নগুলি মুছে ফেলবার চেষ্টা করল লঘু প্রসাধন দিয়ে। বড় করে সিঁদুরের টিপ পরল, ঘোমটাটা একটু বেশি করে টানল আজ, তারপর ওপরে গেল।
ধোঁয়া-ওঠা গরম ভাত এবং ফুটন্ত ঘি ছাড়া কৃষ্ণকান্তর চলে না। সেরকমই দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু বউমাকে না দেখতে পেয়ে কৃষ্ণকান্ত ভাতে হাত দেননি। ফলে গরম ভাত ঠান্ডা হয়েছে, ঘি জুড়িয়ে গেছে।
কৃষ্ণকান্ত উদ্বেগের গলায় জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে মা? শরীরটা কি ভাল নেই?
রেমি ভাতের থালাটা চোখের পলকে জরিপ করে নিয়ে হাত বাড়িয়ে থালাটা তুলে নিয়ে বলল, ভাত ঠান্ডা হয়ে গেছে। আমি আবার গরম ভাত নিয়ে আসছি।
কৃষ্ণকান্ত খুশি হয়ে একটা বড় খাস ছাড়লেন।
ফুটন্ত ঘি দিয়ে গরম ভাত মেখে প্রথম গ্রাসটি মুখে তুলে কৃষ্ণকান্ত বললেন, আমার বাবার একবার কী হয়েছিল জানো?
কী বাবা?
মাত্র পঁয়তাল্লিশ-ছেচল্লিশ বছর বয়সে তাকে একবার বুড়ো হওয়ার বাতিকে পেয়েছিল। সে সাংঘাতিক বাতিক। দিন রাত মৃত্যুচিন্তা করতেন। কথাটা বললাম কেন জানো?
