চপলা বলল, এত অল্প বয়সে ওকালতি করা কি আপনাকে মানায়! সুন্দর ওই চেহারায় কালো কোট প্যান্ট পরে মক্কেলদের পিছন পিছন ঘোরা আমি একদম সইতে পারি না। তার চেয়ে ব্যারিস্টার হয়ে আসুন। ব্যারিস্টারের প্রেস্টিজই আলাদা।
শচীন একটু অবাক হয়। মনের গহনে এরকম একটা ইচ্ছে যে তার ছিল না তা নয়। কিন্তু ইচ্ছেটাকে খুঁচিয়ে দেওয়ার কেউ ছিল না। গরিবের ছেলে ওকালতি পাশ করে কিছু পয়সার মুখ দেখেই ভেবেছিল, জীবনে এর চেয়ে বেশি আর কী চাওয়ার থাকতে পারে? এই তো চূড়ান্ত সফলতা! কিন্তু কারও কারও চোখে ওকালতিটাও যে যথেষ্ট না মনে হতে পারে এটা সে ভাবেনি। এখন ভাবল। তার মনে হল, বুদ্ধিমান ও উদ্যোগী ছেলেদের কোথাও থেমে যাওয়া উচিত নয়। তাদের উন্নতির পথ দূরপ্রসারী। বিশেষ করে চপলার মতো মেয়ের মন রাখার চেয়ে সৎকর্ম আর কী আছে?
শচীন বলল, ব্যারিস্টারি পড়তে অনেক টাকা লাগে। আমরা কিন্তু তত বড়লোক নই।
জানি। ওই কারণেই তো মুখপুড়ি আপনাকে বিয়ে করতে রাজি হয়নি। কিন্তু আমার মনে হয়, চেষ্টা যারা করে তাদের টাকার অভাব কোনও বাধা নয়।
আমি ব্যারিস্টার হলে আপনি খুশি হন?
হই। ভীষণ খুশি হই।
আপনার ননদের সঙ্গে বিয়ে হবে না জেনেও?
বিয়ে যে হবেই না একথা কে বলল?
হবে বলছেন?
হতেও তো পারে। বিয়ের ব্যাপারে কত অঘটন ঘটে। আমাকে দেখছেন না? আমার কি কনককান্তির মতো ভেড়ার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার কথা!
রক্ষণশীল পরিবারের ছেলে শচীন একটু চমকে উঠল। সে কখনও তার আত্মীয় বা পবিচিত মহলে কোনও মহিলাকে স্বামীর নাম উচ্চারণ করতে শোনেনি। তার সঙ্গে ভেড়া বিশেষণ তো নয়ই।
শচীন জবাব দিচ্ছে না দেখে চপলা আবার জিজ্ঞেস করে, বলুন না! আমার মতো সব দিক দিয়ে চৌকস মেয়েকে কি এ সংসারে মানায়? একটু পান থেকে চুন খসলেই এদের জাত যায়। আমার এত রেসট্রিকশন ভাল লাগে না বলেই কলকাতায় পালিয়ে গেছি। কিন্তু গেলে কী হবে! যাকে নিয়ে জীবন সেই তো জলঘট। কাজেই বিয়ের কথা কিছু বলা যায় না। বিশাখার সঙ্গেও আপনার একদিন হুট করে বিয়ে হয়ে যেতে পারে।
বোধহয় নয়।
কেন নয়?
শচীন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, আর বোধহয় তা হয় না।
কারণটা কী? হঠাৎ এমন কী ঘটল?
ঘটেছে বউঠান। আপনি বুঝবেন না।
হঠাৎ চপলা তীব্র রহস্যময় এক কটাক্ষে শচীনকে বিদ্ধ করে বলল, একেবারেই যে বুঝিনি তা নয়।
শচীন মুখ আড়াল করল।
বেচারা! অত লাজুক হলে কি চলে? একটু সাহসী হতে হয়। ডাকাতি করতে গিয়ে চোরের মতো হাবভাব ভাল নয়।
একথায় শচীনের ফরসা রঙে রক্তিমাভা দেখা দিল।
শচীনের অবস্থা দেখেই বোধহয় চপলা দয়া করে তাকে রেহাই দিতে বলল, আজ গান শোনাবেন!
শচীন সেদিন গানের মধ্যে ঢেলে দিয়েছিল নিজেকে।
শেষ হলে চপলা এক পেট খাবার খাওয়াল তাকে। বলল, উকিল যে এমন গায়ক হতে পারে জানা ছিল না।
কেন? উকিলরা কি গাধা?
তাই বললাম বুঝি! বলছিলাম উকিল পেশাটার সঙ্গে গান যেন ভারী বেমানান।
ব্যারিস্টার হয়ে গান গাইতে হবে তা হলে!
চপলা দৃঢ় স্বরে বলল, হ্যাঁ। মনে রাখবেন ব্যারিস্টার বা আই সি এস কিছু একটা আপনাকে হতেই হবে। আমি জানি আপনি পারবেন।
সেদিন এই পর্যন্ত।
তারপর জল আর-একটু গড়িয়েছে। কতদূর গড়িয়েছে তা হিসেব করা শচীনের অসাধ্য। সে নিজের মনের কথা বলতে পারে। এক পাগল প্লাবনে ভেসে গেছে বিশাখা, ভেসে গেছে জমিদার শ্রীকান্ত রায়ের মেয়ে। তার মনের মধ্যে এখন শুধু একটিমাত্র মুখ। সকাল থেকে গভীর রাত অবধি সেই মুখ একবারের জন্যও অস্ত যায় না। ঘুম ভেঙে যায় বারবার। এক অশ্বখুরধ্বনি মথিত করে শচীনের বুক। সর্বনাশের নেশায় নাচে হৃৎপিণ্ড।
শচীন অনেকটা জল খেল ঘটি থেকে। তারপর মশারি তুলে বাইরে এসে জানালার ধারে দাঁড়াল। জানালার ধার থেকেই আমরাগানের শুরু। সেখানে ঝুপসি আঁধার। অজস্র জোনাকি জ্বলছে। ঝিঝি ডাকছে সুতীব্র ঝালায়। আচমকা শেয়াল ডেকে উঠল দুরে। দমকা এক বাতাসে টিনের চালে ঘষটান খেয়ে গেল সুপুরির পাতা। আকাশে মেঘ চমকাল। বৃষ্টি আসবে। মেঘ ডাকছে দূরে কোথাও।
শচীনের মনে হচ্ছিল তার গা ভরে জ্বর এসেছে বুঝি। চোখে জ্বালা। এক-একবার তার মনে হচ্ছে, এ কী করছে সে? একটা সংসার ভেসে যাবে, দু-দুটি অবোধ শিশু পড়বে ভীষণ বিপাকে, তাছাড়া তাকেও তো ভেসে পড়তে হবে সব বন্ধন ছেড়ে। চেনা মানুষের কাছে মুখ দেখানোর জো থাকবে না। এ কি সম্ভব? এ কি উচিত হবে?
কিন্তু ক্ষণকালের জন্য মাত্র এইরকম যুক্তিশীল আচরণ করে তার মন। পর মুহূর্তেই একটা আবেগ ভিতরকার সব নীতিবোধের চৌকাঠ ডিঙোয়, বেড়া ভাঙে, সীমানা লঙঘন করে। কী করবে শচীন?
তালি এক হাতেও বাজছে না। শচীন তবু অবিবাহিত, পিছুটান ছাড়লেও খুব বেশি কিছু যাবে আসবে না। উকিল মানুষ, যেখানেই হোক পসার পাবেই। কিন্তু চপলাকে ছাড়তে হবে তার বহুগুণ বেশি। তবু চপলার ভিতর তেমন কোনও দুর্ভাবনা নেই।
শচীন খবর পেয়েছে, কনককান্তিকে কলকাতায় রওনা করে দিয়েছে চপলা। নিজে থেকে গেল। এই থাকার অর্থও খুব স্পষ্ট আর উত্তেজক।
শচীন যে সঠিক কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পেরেছে তাও নয়। তার মাথা পাগল-পাগল, মন অস্থির। সবচেয়ে বড় কথা, চপলার সঙ্গে তো স্পষ্ট কোনও কথা হয়নি। শুধু আভাস ইঙ্গিত মাত্র। এখনও তারা আপনি থেকে তুমিতে নামেনি। এমনকী, শচীনের মতো পাগলামিও পেয়ে বসেনি চপলাকে। সে দিব্যি বাড়ির লোকের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলছে, শিশুদের পরিচর্যা করছে, সংসারের ধকল সামলাচ্ছে। মেয়েরা হয়তো পুরুষদের চেয়ে অনেক বেশি শক্ত হয়। এদিকে শচীন তার মামলার সওয়াল গুলিয়ে ফেলছে। দুটো মামলার শুনানি পিছিয়ে দিতে চেয়ে জজকে খোশামোদ করেছে।
