চপলা সম্পর্কে এটুকু ছিল শচীনের প্রাথমিক মুগ্ধতা। তারপর জল আরও গড়াল, যখন সে এই মহিলার অসামান্য মুখশ্রী ভাল করে লক্ষ করল একদিন।
একথা ঠিক, চপলা একটু লঘু স্বভাবের মেয়ে। ইয়ার্কি ঠাট্টা তার ভীষণ প্রিয়। চিমটি দিয়ে কথা বলতেও সে ওস্তাদ। কিন্তু ওটুকু শচীনকে আরও পেড়ে ফেলেছে।
নিজের শাসে মৃদু কম্পন টের পায় শচীন। দুই সন্তানের মা, চৌধুরীবাড়ির বউ চপলার প্রতি তার সমস্ত সত্তার একমুখী স্রোত দুরন্ত এক গতিতে নিয়ে চলেছে তাকে। উজান বাইবার শক্তি তার নেই। সে ভেসে যাচ্ছে এক অমোঘ লক্ষ্যে। নিয়তির নির্দেশে।
বুকের মধ্যে ঘোড়ার তীব্র দৌড় টের পায় শচীন। বুক ব্যথিয়ে ওঠে যন্ত্রণায়। মাঝরাতে আজকাল প্রায়ই তার এইরকমভাবে ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম আসেও না বড় সহজে। কাটাছেড়া তন্দ্রার মধ্যে সারাক্ষণ হানা দেয় চপলার মুখ। এক প্রলয় বাতাসে ভেঙে পড়েছে প্রতিরোধের দ্বার। কী করবে শচীন?
তার ভিতরকার বুদ্ধিমান ও বিবেচক উকিলটি মাঝে মাঝে তাকে সাবধান করে দেয়, কুল ভাঙবে, মর্যাদা নষ্ট হবে, কোথাও ঠাই হবে না তোমাদের। নিষিদ্ধ ফলের দিকে হাত বাড়িয়ো না।
নিষিদ্ধ ফল? শচীন যেন অবাক হয়ে ভাবে, চপলা কেন নিষিদ্ধ ফল হতে যাবে? নিষিদ্ধই যদি, তবে অত সুন্দর কেন? অত দুষ্টু কেন? কেনই-বা অত গা-ঘেঁষা?
শচীনকে নিজের জন্য কখনওই চিহ্নিত করত না চপলা, ননদের জন্যই নির্দিষ্ট রেখেছিল তাকে। কিন্তু সবসময়ে কি সব হিসেবমতো ঘটে?
শচীন যতদূর দেখতে পায়, তাদের দুজনের মধ্যে বিদ্যুৎ খেলেছিল সেই জলসায়। শচীন তার গাঢ় গভীর গলায় গজল গাইতে গাইতেই দেখল, চপলার মুখে-চোখে এক অদ্ভুত অপার্থিব মুগ্ধতার ভাব নেমে এসেছে কখন। চোখদুটিতে গভীর সম্মোহন। চোখের ফাদে সেই যে ধরা পড়ল শচীন, তারপর থেকে কেবল ছটফট করে ভিতরটা।
চপলা তেমন ভাল গান জানে না। বলতে কী, তার খাকতি হয়তো ওই একটাই। তবু কয়েকটা রবীন্দ্রসংগীত শুনিয়েছিল সেদিন। রূপমুগ্ধ শচীনের সে গান খারাপ লাগেনি।
পরদিন শচীনের কাছে কাছারিঘরে এসে হানা দিল চপলা। কর্মচারীরা তটস্থ। চপলা বলল, কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করে ওপরে আমার ঘরে আসুন।
শচীনের লুব্ধ মন এই আমন্ত্রণের ভালমন্দ বিচার করল না। ভিতরে এক শিহরিত আনন্দের উজ্জীবক স্পর্শ তার চোখ-মুখকে উজ্জ্বল করে দিল। সে বলল, যাব।
সেদিন সন্ধ্যায় চপলার ঘরে আর কেউ ছিল না। শুধু চপলা আর শচীন।
চপলা একটু সেজেছিল। ফ্রিলওলা খুব আধুনিক ব্লাউজ তার গায়ে এবং ঝলমলে একটা শাড়ি।
পরিপাটি বাঁধা খোঁপা। মুখে কিছু প্রসাধন এবং গায়ে দামি সুগন্ধ।
চপলা বিনা ভূমিকায় বলল, উকিল হয়ে পচে মরবেন কেন? জীবনে উন্নতি করার ইচ্ছে হয় না আপনার?
শচীন এই আচমকা কথায় সামান্য নাড়া খেয়ে বলল, কেন? ওকালতি কি খারাপ?
খারাপই তো। প্রেস্টিজ পেতে হলে ব্যারিস্টার হতে হয়। পারবেন না?
উকিল পাত্র কি আপনার ননদের পছন্দ নয়?
ননদকে টানা কেন আবার! আমার নিজের পছন্দ নয়।
শচীন একটু প্রগম্ভ হয়ে সাহস করে বলল, আপনার তো আর পাত্রের চিন্তা নেই। থাকলে আমিই প্রথম ক্যান্ডিডেট হতাম।
চপলার সঙ্গে বউদি-দেওর সম্পর্কে এরকম ইয়ার্কি চলতে পারে বটে, কিন্তু চপলা একথায় কেমন যেন হয়ে গেল। কিছুক্ষণ কথা না বলে দুটি চোখ পেতে রাখল শচীনের মুখের ওপর।
তারপর চোখ সরিয়ে নিয়ে খুব চাপা গলায় বলল, আমার জীবনটা খুব সুখের নয় শচীনবাবু।
আবহাওয়াটা হঠাৎ ভারী হয়ে ওঠায় শচীন বিব্রত বোধ করতে থাকে।
চপলা একটা ডেকে রাখা কয়েকটা পত্রপত্রিকা নাড়াচাড়া করতে করতে বলে, এ জায়গায় বিয়ে করার একটুও ইচ্ছে ছিল না আমার। কথা ছিল, বিলেত যাব, ব্যারিস্টারি পড়ব বা আই সি এস কমপিট করব। বাবা রাজি থাকলেও শেষ অবধি মা আর ঠাকুমা বেঁকে বসে। কিছুই হল না। একদম জলঘট হয়ে রইলাম।
শচীন মিনমিন করে বলে, তা কেন?
জলঘট নয়? আমার স্বামী দেখতে কার্তিকঠাকুর হলে কী হয়, একদম আনস্মার্ট। ভাল করে কথা বলতে জানে না। জমিদারনন্দনরা যেরকম হয় ঠিক তেমনি। না লেখাপড়ায় ভাল, না আর কিছুতে। আমি অনেক কষ্টে খানিকটা মানুষ করার চেষ্টা করেছি। ইচ্ছে ছিল বাবাকে বলে ওর বিলেত যাওয়ার ব্যবস্থা করি। কিন্তু ভেবে দেখলাম, পাঠিয়ে লাভ নেই। সাহেবদের দেশে গিয়ে শুধু কয়েকটি কু-অভ্যাস নিয়ে আসা ছাড়া ওর দ্বারা আর কিছু হবে না।
শচীন মৃদু একটু হাসল বটে, কিন্তু তারপর বিষণ্ণ গলায় বলল, কনকদা ঠিক আগের মতো নেই। আগে কীরকম ছিল? আরও খারাপ?
না। ঠিক খারাপ নয়। এমনিতে ভালমানুষ, কিন্তু একগুঁয়ে ধরনের।
আহা, আর সার্টিফিকেট দিতে হবে না। আমার চেয়ে ভাল তো কেউ জানে না। এক কথায় বোকা আর জেদি।
শচীন কী আর বলবে, মাথা চুলকোল একটু।
চপলা বলল, আমি একটু ঠোঁটকাটা। স্পষ্ট কথা বলতে ভালবাসি। কিছু মনে করবেন না।
না, না।
পান্তাভাতের মতো পুরুষমানুষের ঘর করতে কবতে আমার ভিতরটা মরে যাচ্ছে। এই যা দেখছেন ভালমানুষ বউ সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছি এটা আমার ছদ্মবেশ। সারাজীবন কি ছদ্মবেশ পরে কাটিয়ে দেওয়া যায়! সবসময় মনে হচ্ছে আমি অন্য এক নারীচরিত্রে অভিনয় করে যাচ্ছি মাত্র।
শচীনের বুকের ধকধকানিটা শুরু হল এ সময়ে। সে বুঝতে পারছিল, চপলা তাকে একটা কিছু বলতে চায়। এ হল তারই ভূমিকা। সেই চরম কথাটা কী তাও সে আন্দাজ করতে পারে। একই সঙ্গে বুকের মধ্যে তীব্র চিনচিনে আনন্দ ও ভয় হচ্ছিল তার। দুঁদে উকিল হয়েও সে কথা খুঁজে পাচ্ছিল না। শুধু বলল, সে তো ঠিক কথা।
