ধ্রুব দাঁতে দাঁত পিষে বলল, শোনো। কেষ্ট চৌধুরীর মতো নোংরা লোক যা করতে পারে তাই করছে। তার হাতের সুতোর টানে তোমরা নাচছ। কিছু না জেনে, না বুঝে।
রেমি স্খলিত গলায় বলে, কেষ্ট চৌধুরীটা আবার কে?
কেন? তোমার শ্বশুর কৃষ্ণকান্ত! চেনো না!
উনি কী করেছেন?
কী না করেছেন? একজন ভদ্রলোকের পক্ষে যা কিছুতেই সম্ভব নয়, তা উনি অনায়াসে করতে পারেন। হাসিমুখে। বোধহয় পলিটিক্স না করলে কোনও মানুষ এরকম ভয়েড অফ সেনটিমেন্টস হতে পারে না। লোকে জানে উনি পুরনো মূল্যবোধে বিশ্বাসী, রক্ষণশীল। লোকেরা গাড়ল।
রেমি শঙ্কিত হয়ে বলে, উনি কী করেছেন তা বলবে তো?
তোমাকে বলে লাভ নেই। তুমি বিশ্বাস করবে না। রাজাকে তোমার সঙ্গে জুটিয়ে দিয়েছেন উনিই।
উনি?
তুমি বোকা। তোমাকে ঠকানো বা ভোলানো খুব সোজা।
রেমি বিশ্বাস করতে পারছিল না। বারবার ঠোঁট কামড়ে শুকনো মুখে আপনমনে বলছিল, উনি! উনি!
ধ্রুব একটা পাগলা রাগের চোখে রেমির দিকে চেয়ে থেকে বলল, তুমি এখন আমাকে বলো, রাজাকে বিয়ে করতে চাও?
রেমি এক পা পিছিয়ে গিয়ে অসহায় গলায় বলে, তুমি আমাকে ভালবাসো না কেন?
সেটা কোনও ফ্যাক্টর নয়। কাউকে ভালবাসা আমার পক্ষে অসম্ভব। কথাটার জবাব দাও। ওকে বিয়ে করবে?
আমি জানি না।
কেন জানো না?
ভেবে দেখিনি।
ধ্রুব কোনওদিন যা করেনি, হঠাৎ রেমিকে দুহাতে ধরে প্রচণ্ড দুটো ঝাঁকুনি দিল। সেটা মার নয় ঠিকই, কিন্তু মারের চেয়েও বেশি। সেই অসম্ভব জোরালো কঁকুনিতে মাথা ঘুরে চোখে অন্ধকার দেখল রেমি।
ধ্রুব তাকে ছুড়ে বিছানায় ফেলে দিয়ে বলল, আমি তো তোমাকে পাসপোর্ট দিয়েই রেখেছি। যার সঙ্গে খুশি প্রেম করো, ডিভোর্স চাও তো তাও সই। সব ঠিক। কিন্তু তার মধ্যে ফাঁকিবাজি আমার সহ্য হয় না। ইউ মাস্ট বি অনেস্ট। ভেরি অনেস্ট।
আমি কী করেছি?—রেমি ফোঁপাতে ফোঁপাতে জিজ্ঞেস করে।
তুমি রাজাকে নষ্ট করেছ। ওর ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দিয়েছ। ওকে লোভ দেখিয়ে নাচিয়ে, আশা দিয়ে তারপর একদিন ছোলাগাছি দেখাতে চাইছ।
তোমাকে কে বলেছে এসব?
আমি জানি। যে দু-একজন লোকের আমি আগাপাশতলা জানি, যাদের চোখের দিকে তাকালেই সব বুঝতে পারি, সেই অল্প কয়েকজনের মধ্যে তুমিও পড়ে।
রেমি কাঁদছিল। কিন্তু কে জানে কেন, তার বুকে একটুও দুঃখ বা জ্বালা ছিল না। বরং কান্নার সঙ্গে তার গা শিহরিত হচ্ছিল বারবার। সে বলল, আমি কী করব তুমি বলে দাও।
আমি! আমি কেন বলতে যাব?
আমি যে কিছু বুঝতে পারি না। বড্ড বোকা।
কে বোকা?
আমি। আমাকে তো তুমি সবসময় বলল, বোকা।
ধ্রুব একটুও হাসল না। মুখটা যেমন থমথমে ছিল তেমনি থমথমেই হয়ে রইল। কয়েক পলক রেমির দিকে স্থির চেয়ে থেকে সে বলল, বোকা সেটা বড় অপরাধ নয়। বড় অপরাধ হল ডিজঅনেস্টি। তুমি অসৎ হয়ে যাচ্ছ। চালাকি করছ। ধ্রুব চৌধুরীকে পটানোর জন্য রাজার সর্বনাশ করছ।
ওর সর্বনাশ হবে না।
অলরেডি হয়ে গেছে। কাল ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। জলে ডোবা মানুষের মতো ফ্যালফ্যালে মুখ, ভীষণ আনমনা, বোগা। লক্ষণগুলো আমি চিনি। ফঁদ পাততে গিয়ে বেচারা নিজেই ফঁদে পড়ে গেছে।
আমি ওর সঙ্গে কখনও সেভাবে মিশিনি। যেভাবেই মেশো, তুমি যুবতী এবং বলতে নেই বোধহয় সুন্দরীও। তোমার সঙ্গটাই তো যে-কোনও পুরুষের পক্ষে বিপজ্জনক। এখন কেসটা অত্যন্ত সিরিয়াস দাঁড়িয়ে গেছে। তোমাকে এবার একটা ডিসিশন নিতে হবে।
আমি পারব না। তোমার পায়ে পড়ি।
নিজে না পারো কেষ্ট চৌধুরীর পরামর্শ নাও। সেই তো তোমার গার্ডিয়ান অ্যানজেল।
আমি পারব না।
পারতে হবে, রেমি। আমাকে জব্দ বা বশ করার জন্য তোমরা তিনজন জেনে বা না জেনে যা করেছ তার সমাধানও তোমাদেরই করতে হবে।
কী সমাধান?
উকিলের কাছে যাও। ডিভোর্সের মামলা করো। আমি ছেড়ে দেব। তারপর তোমাকে বিয়ে করতে হবে। রাজাকেই।
রেমি উথলে উঠে বলে, এ জীবনে পারব না। তার চেয়ে আমাকে মেরে ফেলো। পায়ে পড়ি, মেরে ফেলল।
তুমি কি ওয়ান-ম্যান উওম্যান, রেমি?
আমি আর কাউকে চাই না, আর কিছু চাই না। শুধু তোমাকে।
ধ্রুব মাথা নেড়ে বলল, তুমি কী চাও বা না চাও সেটা বড় কথা নয়। ইউ মাস্ট ফিনিশ ইয়োর কেস।
আমাকে তাড়িয়ে দেবে?
না। তোমাকে রাজার হাতে ছেড়ে দেব। তোমাকে আমি অনেস্ট হতে শেখাব।
আমি তো ওকে চাই না।
চাইতে হবে, রেমি। ওকে পাগল করলে কেন তবে?
সারা রাত কত কাতর অনুনয়-বিনয়, কত পায়ে ধরাধরি। ধ্রুব এক ইঞ্চি জমি ছাড়ল না।
০৪৯. এক তীব্র, যন্ত্রণাময় অশ্বখুরধ্বনি
এক তীব্র, যন্ত্রণাময় অশ্বখুরধ্বনি শুনতে পাচ্ছিল শচীন। বুকে তার ঘনিয়ে উঠছে ব্যথা। অস্ফুট শব্দ করে পাশ ফিরল সে। তারপরই সজাগ হয়ে চোখ মেলল।
কোথাও আলোর রেশমাত্র নেই। অবোধ কঠিন গভীর এক অন্ধকার। ঘোড়র পায়ের শব্দ এখনও দৌড়চ্ছে। সে শব্দ তার বুকের ভিতরে। শব্দ তার হৃৎপিন্ডের।
শচীনের সামনের অন্ধকার রূপময় হয়ে যেতে লাগল। বহুরঙা এক ময়ূর পেখম ধরেছে যেন। সেই রং আরোপিত হচ্ছিল এক প্রতিমায়। চপলা।
তার স্বল্পকালের জীবনে সে আর কোনও মেয়েকে দেখেন যার সঙ্গে চপলার তুলনা হতে। পারে। জবুথবু শাড়িতে মোড়া মেয়েদেরই এতকাল দেখেছে সে! চপলা শাড়ি পরে, সিঁদুর দেয়, ঘোমটা টানে, সবই ঠিক কথা। কিন্তু তার ব্যাকগ্রাউন্ড অন্যরকম। সে ঘোড়া এবং সাইকেলে চাপতে জানে, চালাতে পারে রাইফেল। চমৎকার ইংরিজিতে কথা বলতে পারে। ইংরেজদের সঙ্গে বহু ডিনার খেয়েছে সে। তবু সব ছেড়েছুড়ে বাঙালির গৃহস্থঘরের বউ হতেও তার বাধেনি।
