বলছ একথা বিশ্বাস করতে?
বলছি। ভালবাসলে দোষঘাট অত ধরতে চায় না মানুষ। তুমিই না একটু আগে বললে যার ওপর দুর্বলতা থাকে তার ওপর মানুষ কাল্পনিক গুণ আরোপ করতে থাকে!
বলেছি।
তা হলে? স্বামীর শতেক দোষ থাক। বিবাহ মানে তো বহন। ঠিক সওয়া যায়, বয়ে নেওয়া যায়।
তুমি তো পারলে না।
কে বলল পারিনি! মরে যাচ্ছি বলে বলছ? সে তো মরতে হতই একদিন।
ধ্রুবকে তা হলে তুমি ভালবাসতে রেমি?
কী জানি! অত গর্ব করে বলতে পারব না যে, বাসতাম। তবে চেষ্টা করেছি। অন্য কোনও পুরুষকে ভাববার সময় যখন হল না, তখন বুঝে নাও, বাসতাম।
আর তার জন্য আর-একটা পুরুষকে ডোবালে?
না তো। রাজা ড়ুববে কেন? ভালবাসলেই কি ডোবে?
তুমি যে ড়ুবেছ।
আমি! সে ঠিক ডোবা নয়। তুমি বুঝবে না গো। আর যদি ড়ুবেই থাকি তা হলে বুঝে নিয়ে আমি ড়ুবতেই চেয়েছিলাম।
নানা তরঙ্গ আজ রেমিকে ওলটপালট করে দিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীতে তার শেষ কয়েকটি মুহূর্ত বয়ে যাচ্ছে। কৃপণের ধন। আর-একবার চেতনা ফিরল রেমির। মুখোশ পরা একটা লোক নিবিড় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে তার দিকে।
রেমি ভয়ে চেঁচিয়ে উঠতে গেল। গলার স্বর ফুটল না। অস্পষ্ট গোঙানির শব্দ হল শুধু। তারপর অন্ধকার হয়ে গেল চেতনা!
কেউ বাধা দিল না রাজা আর রেমিকে। ঠিক সদ্য প্রেমে পড়া উদ্দাম দুটি তরুণ তরুণীর মতো তারা বেরিয়ে পড়েছিল আনন্দের হাট লুট করতে। ছিল নৈকট্যের শিহরন, ছিল নারী ও পুরুষের মধ্যে প্রাকৃত আকর্ষণ, ছিল সুন্দরের প্রতি মুগ্ধতা। সব ছিল। ধ্রুবও ছিল নিষ্ক্রিয় ও উদার প্রশ্রয়দাতা।
তবু একদিন রাজা বলেছিল, বউদি, এক কোটি বছর তোমার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরলেও বোধহয় কেউ তোমার মন পাবে না।
রেমি অবাক হয়ে বলল, একথার মানে?
তুমি রিমোট কন্ট্রোলড এক রোবট মাত্র। তোমার নিজস্ব সত্তা নেই।
ও বাবা! কী সব ইংরিজিতে গালাগাল দিচ্ছ গো!
গালাগালই বটে। তোমার গায়ে লাগে?
গালাগাল দিলে লাগারই তো কথা।
না, লাগার কথা নয়। চৌধুরীবাড়ির বউদের চামড়া মোটা হয়ে যায়। তোমারও হয়েছে।
কেন বলল তো!
কী করে যে এত সহ্য করো জানি না।
রেমি মুখ টিপে হাসল একটু।
ব্যান্ডেলে বেড়াতে গিয়েছিল তারা। রাজার ফাংশন ছিল। একটু আগেই পৌঁছে তারা বিখ্যাত চার্চ দেখে গঙ্গার ধারে বসেছিল একটু। শীতকালের মন্দস্রোত নদী। আকাশে সাদা রোদ। ফাংশনের কিছু ছেলে পিছু পিছু ঘুরঘুর করছিল প্রথম থেকেই। রাজা তাদের অনেক করে বুঝিয়ে ভাগাল। তারপর হঠাৎ রেমির কাছে ঘন হয়ে বসে বলল, কেন বুঝতে চাইছ না রেমি?
কী বুঝতে চাইছি না?
এরকম ভাবে চলে না।
কীরকম হলে চলবে?
তোমার জীবনটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
কী করে বুঝলে?
ধ্রুবদা তোমাকে ভালবাসে না।
তবে কাকে বাসে?
তা জানি না। তবে তোমাকে বাসে না।
আমার তা মনে হয় না।
তার মানে! তোমার কী মনে হয়?
রেমি একটু লাল হয়ে বলে, তোমার কুট্টিদা যদি আমাকে না-ই ভালবাসে তবে অন্য কাউকেও বাসে না। কিন্তু যদি কোনওদিন কাউকে তার ভালবাসবার ইচ্ছে হয় তবে আমাকেই বাসবে।
এটা কি তোমার অন্ধ বিশ্বাস নয়?
না।
এই যে আমার সঙ্গে এত মিশছ ধ্রুবদার জেলাসি লক্ষ করেছ কখনও?
না। ও আমাকে লক্ষই করে না। অন্য কী যেন ভাবে।
তা হলে আমাকে স্কেপগোট বানিয়ে যে প্ল্যানটা তুমি কবেছিলে সেটা ফেল করল তো!
মনে তো তাই হচ্ছে।
তা হলে এসো একটা কাজ করি।
কী কাজ?
কুটিদার একেবারে মূলে একটা নাড়া দিই।
কীভাবে?
আজ বাড়ি ফিরে তুমি অ্যানাউন্স করো যে, কুট্টিদাকে ডিভোর্স করবে। তারপর আমাকে বিয়ে করতে চাও।
উদাসীন রেমি কিছুক্ষণ নদী দেখল।
তারপর মাথা নিচু করে বলল, বলব।
বলবে?
বলব। দেখো, ঠিক বলব। তবে তাতে কাজ হবে না।
তবু বোলো।
রাত্রে যখন রেমি ফিরল তখন ধ্রুব নীচের ঘরের বিছানায় আধশোয়া। এক পলক তাকিয়ে দেখল।
বলল, হঠাৎ এ ঘরে যে?
রেমি বলল, কেন? আসতে নেই?
তা আছে। তবে তোমার মান্যবর শ্বশুর দোতলায় যখন তোমার ঘর ঠিক করে রেখেছেন তখন সেখানেই তোমার থাকা ভাল।
আমি তোমাকে একটা কথা বলেই চলে যাব।
বলে ফেলো।
আমি ডিভোর্স চাইলে দেবে?
এক্ষুনি। কিন্তু হঠাৎ চাইছ কেন?
তুমিও তো চাও!
আমি!—ধ্রুব অবাক হয়ে বলে, কখনও চাইনি তো! তোমাকে বলেছি, ডিভোর্স নাও। নিজে চাইনি।
রহস্যময় এক আনন্দে শিহরিত রেমি তবু ঘাড় শক্ত করে বলল, এবার আমি চাইছি।
ধ্রুব একটু ঘরের বাতাসটা শুকল যেন। তারপর রেমির দিকে অপলক চোখে চেয়ে বলল, কথাটা কে শিখিয়ে দিয়েছে?
কে শেখাবে! আমিই তো বলছি!
বলছ, কিন্তু আন্তরিকতা নেই, ইচ্ছা নেই, আগ্রহ নেই। মুখস্থ করা বুলি।
রেমি খুব অবাক হল। ঠিক, ডিভোর্সের কোনও তাগিদ বা আগ্রহ তার ভিতরে নেই। সে মোটেই ধ্রুবকে ছেড়ে যেতে চায় না। রাজা কৌশলটা শিখিয়েছিল, সে সেইমতো আচরণ করে গেছে, কিন্তু সেটা ধ্রুবর বুঝবার কথা নয়। তা হলে বুঝল কী করে?
রেমি বলল, বুঝলে কী করে? তুমি কি অন্তর্যামী?
অন্তর্যামী সকলের ক্ষেত্রে নই। কিন্তু তোমার মতো বোকা আর দুর্বল মনের মেয়েকে বোঝা কিছু শক্ত নয়। কে শিখিয়েছে বলে তো! রাজা?
তাতে তোমার কী যায় আসে?
ধ্রুবর মুখটা আস্তে আস্তে রক্তিম হয়ে উঠছিল। কপালের দুপাশে দুটো শিরা ফুলে উঠল। রাগলে ওর ওরকম হয়, রেমি বহুবার দেখেছে। হাতের বইটা রেখে ধ্রুব সোজা হয়ে বসে বলল, ডিভোর্স দিলে রাজাকে বিয়ে করবে?
রেমি ক্রুদ্ধ ধ্রুবর দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারছিল না। পুরুষ মানুষ, বিশেষ করে ধ্রুবর মতো ধারালো চেহারার পুরুষ যখন আমূল রেগে ওঠে তখন তাদের স্পর্শ করে অলৌকিক কিছু। রেমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল, ধ্রুবর শরীরের চারদিকে সেই ফেটে পড়ার আগের দুরন্ত রাগ একটা ছটা বিকীর্ণ করছে। রূপ যেন দেহের সীমানা ভেঙে ফেলতে চাইছে। রেমির বাকরোধ হয়ে গেল। সে চোখ ফেরাতে পারছিল না।
