যাবে না?
না। যতদিন বউঠান নেই ততদিন না।
লোকে কী বলে রঙ্গময়ি? তোমার আর আমার মধ্যে ভালবাসা আছে?
তাই বলে, লোকে তো জানে না যে, কথাটা কত বড় মিথ্যে!
ব্যথিত ও বিমর্ষ হেমকান্ত উঠে দাঁড়ালেন। শরবিদ্ধ হরিণের মতো কাতর একটা শব্দ করে বললেন, আমার বুকের বাঁ দিকটা বড় ব্যথা করছে, রঙ্গময়ি। আমাকে একটু ধরে নিয়ে ঘরে পৌঁছে দাও।
০০৪. ধ্রুব
খবরটা কতখানি গুরুতর তা বুঝতে খানিক সময় নিল ধ্রুব। ফ্যালফ্যাল করে জগার মুখের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, মরে গেছে?
না। তবে অবস্থা খুব খারাপ।
কতটা খারাপ?
আমি অত জানি না। তবে বাবু ফিরে এলে তার কাছে গিয়ে শুনে আসতে পারো।
তুমি আসল খবরটা লুকোচ্ছো না তো!
আরে না। তেমন খারাপ খবর হলে কি আর বাসা এত চুপচাপ থাকত?
রেমির বাপের বাড়িতে খবর দেওয়া হয়েছে?
হ্যাঁ, তারা সব নার্সিংহোম-এ আছে।
আমারও কি একবার যাওয়া দরকার?
জগা বলে, গেলে বোধহয় ভালই করতে। তবে তোমার যা অবস্থা দেখছি তাতে গিয়ে আবার একটা কেলেঙ্কারি বাঁধাবে। তার চেয়ে রাতটা কাটিয়ে দাও। সকালে যেয়ো।
ততক্ষণ যদি রেমি না বাঁচে?
আমরা তো খবর নিচ্ছিই। লতু টেলিফোনের সামনেই বসে আছে। তা ছাড়া গেলেও দেখা করতে তো আর পারবে না। দেখা করা একদম বারণ করে দিয়েছে ডাক্তার।
ধ্রুব একটা চেয়ারে বসে পড়ে।
খুবই চিন্তিতভাবে দুহাত জড়ো করে তাতে থুতনির ভর রেখে কিছুক্ষণ শূন্য চোখে চেয়ে থাকে সামনের দিকে। তারপর বলে, তুমি আজ রাতটা আমার ঘরে শোবে জগাদা?
কেন?
শোও না, খবরটা শোনার পর থেকে গা-টা কেমন ছমছম করছে।
জগা অবাক হয়ে বলে, কীসের ছমছম?
রেমি আমাকে পছন্দ করে না, জানোই তো। যদি আজ রাতে রেমি মরে যায় তবে ঠিক ওর ভূত আমার গলা টিপতে আসবে।
জগা কানে আঙুল দিয়ে বলে, ছিঃ ছিঃ, এ কী কথা তোমার মুখে! অমন অলক্ষুনে কথা বলতে আছে?
ধ্রুব বলে, তুমি জানন না তাই বলছ। ও যে আমাকে কী ভীষণ ঘেন্না করে।
তা বলে জ্যান্ত মানুষটাকে ভূত বানাবে?
তুমি শোবে কি না বলো।
শোবোখন। কিন্তু তোমরা লেখাপড়া শিখে কী হলে বলল তো!
ধ্রুব বিবর্ণ মুখে একটু কাঠ কাঠ হাসি হেসে বলে, বই-পড়া বিদ্যে জীবনে কোনও কাজে লাগে। এ তো জানোই জগাদা। থিওরেটিক্যালি আমি ভূতে বা ভগবানে বিশ্বাস করি না, কিন্তু ইন প্র্যাকটিস অন্য ব্যাপার।
তাই তো দেখছি। রাতে কিছু খাবে তো? নাকি খেয়ে এসেছ?
খাওয়া? ও বাবা খাওয়ার কথা ভাবতেই পারি না।
রাতে তো প্রায় দিনই খাচ্ছ না। কাজটা ঠিক হচ্ছে না। শুকিয়ে যাবে।
ধ্রুব ঠ্যাং ছড়িয়ে বলে, তুমি বরং আলমারিটা খুলে দেখো। একটা ব্র্যান্ডির বোতল আছে। চার আঙুলের মতো ঢেলে দাও।
জগা চোখ গোল করে বলে, আরও খাবে?
নইলে ঘুম আসবেনা। অমনিতেই আজ নেশা জমেনি, একটা হুজ্জোত বেঁধে গিয়েছিল। তারপর রেমির এই খবর।
হুজ্জোত বাঁধালে কেন?–জগা ভ্রু কুঁচকে তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে বলে।
ধ্রুব মাছি তাড়ানোর মতো হাত নেড়ে বলে, সে অনেক ব্যাপার।
বাবুর নাম তুমিই ডোবাবে।
ধ্রুব মুখের একটা বিকৃতি ঘটিয়ে বলে, কেন, সেটা বাবা নিজে পারে না?
তার মানে?
যা সব করে বেড়াচ্ছে তাতে নিজের নাম নিজেই ডোবাবে। ছেলের দরকার হবে না।
জগা অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলে, আজ কী হয়েছিল?
কালুর দোকানে একটু গণ্ডগোল, তেমন কিছু নয়।
কতটা গণ্ডগোল?
বললাম তো। বেশি নয়।
দেখো কুট্টি, আমার কাছে লুকিয়ো না।
ধ্রুব হঠাৎ উঠে তার ট্রাউজারস ছাড়তে ছাড়তে বলে, পায়জামাটা কোথায় দেখো তো। শোবো। মাথা ঘুরছে।
জগা কথাটার জবাব দেয় না। তবে এক ধরনের বিপজ্জনক জ্বলজ্বলে চোখে ধ্রুবর দিকে চেয়ে বলে, যা কিছু করে বেড়াচ্ছো তা বাপের খুঁটির জোরেই। না হলে এতদিনে কয়েকবার জেল খেটে আসতে হত, তা জানো?
ধ্রুব ছাড়া প্যান্টটা একটা লাথি মেরে উড়িয়ে দেয়। সেটা গিয়ে দরজার কাছে পড়ে। গায়ের আঁটো পুলওভারটা খুলতে গিয়ে বগলের কাছ বরাবর আটকে গেল। জগার দিকে ঘুরে সে বলে, একটু টেনে খুলে দাও তো।
জগা একটা প্রকাণ্ড হাত বাড়িয়ে এক হ্যাঁচকাটান মেরে সোয়েটারটা খুলে আনে। সোয়েটাবটা খুলে আসে বটে, কিন্তু হ্যাচকা টানে টাল খেয়ে অবলম্বনহীন ধ্রুব দুটো হাত ওপর দিকে তুলে অসহায়ভাবে পড়ে একটা কাতর শব্দ করে। জগা হাত বাড়িয়ে তাকে আর-একটা হ্যাচকা টানে তুলে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে বলে, বাপের নাম বংশের নাম ডোবাতে এ বাড়ির ছেলে হয়ে তোমার লজ্জা করে না, কিন্তু আমরা চাকর হয়েও তোমার কাণ্ড দেখে লজ্জা পাই।
ধ্রুব একটু হাঁফাচ্ছিল। মাথাটা দুহাতে চেপে ধরে বলল, ওঃ। এত কথা বলো কেন? একটু ব্র্যান্ডি দাও, নেশাটা পুরো না হলে আমার মাথাধরাটা ছাড়বে না।
চাবিটা দাও।
কীসের চাবি?
লোহার আলমারির। তাইতেই তো ব্র্যান্ডি আছে বললে।
ওঃ সেই চাবি। ওই চেস্ট অফ ড্রয়ার্সের ওপরের ড্রয়ারটা দেখো।
জগা গিয়ে ড্রয়ার খুলে চাবিটা বের করে নেয়। তারপর ধ্রুবর দিকে চেয়ে বলে, আমি যাচ্ছি। খেয়ে আবার আসব। ততক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে।
ধ্রুব তাড়াতাড়ি ওঠার চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। জগা দরজা খুলে বেরিয়ে যায়। বাইরে থেকে দরজাটা টেনে দেয় সাবধানে।
ধ্রুব আতঙ্কিত চোখে দরজাটার দিকে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ। অবোধ দৃষ্টি। তারপর ফাঁকা ধরটার চারদিকে চায়। হঠাৎ খুব শীত করতে থাকে তার। নাভির কাছ থেকে একটা কাঁপুনি উঠে আসছে। সে গিয়ে কাঠের ওয়ার্ডরোব খুলে একটা বোয়া পায়জামা বের করে খুব কষ্টে পরে নেয়। গায়ে একটা আলোয়ান জড়ায়। তারপর দরজা খুলে বেরোয়। আস্তে আস্তে দোতলার সিঁড়ি ভেঙে উঠতে থাকে। নেশাটা খুব একটা টের পাচ্ছে না এখন।
