শচীন যেমন এসেছিল তেমনি চলে গেল হঠাৎ।
বিশাখা খানিকক্ষণ থম ধরে বসে রইল। তারপর স্বাভাবিক নারীধর্ম অনুসারে হাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগল।
শচীন আজ আর কাজে মন দিতে পারল না। উঠে পড়ল তাড়াতাড়ি। সাইকেলটা আস্তে চালিয়ে বার বাড়ি পার হয়ে ব্রহ্মপুত্রের ধার ঘেঁষে যেতে যেতে তার মনে হল, সে চমৎকারভাবে একটা পরিস্থিতি আজ সামাল দিয়েছে। কিন্তু শেষ অবধি পারবে কি?
চপলা, চপলা যে তার ধ্যান-জ্ঞান!
০৪৮. মানুষেরা ভীষণ অবুঝ
পৃথিবীর মানুষকে কিছুতেই সব কথা বোঝাতে পারবে না রেমি। মানুষেরা ভীষণ অবুঝ।
পদ্মপাতায় এক ফোঁটা জল গড়িয়ে যাচ্ছে এধার ওধার। কখন চলকে পড়ে কে জানে! ওই। ফেঁটাটুকু রেমির প্রাণ। নিঃশেষিত চেতনার একটু তলানি অবশিষ্ট আছে মাত্র। সেই চেতনাটুকুও নানারকম আজগুবি দৃশ্যে আবিল। রেমি এখন অনেক কিছুই মনে করতে পারছে না। এমনকী নিজেকেও তার সবটুকু মনে পড়ে না। কিন্তু তার আবছায়া চেতনার গভীর কুয়ার মধ্যে ঘোলা জলে বারবার যে মুখটা ছায়া ফেলছে সে মুখ সে অনেক দুঃখের মূল্যে চিনেছে। সহজে ভোলা যাবে না। সে মুখ ধ্রুবর।
তুমি কি নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাসী নও, রেমি?
হ্যাঁ, ভীষণ বিশ্বাসী।
তুমি কি ডিভোর্সের পক্ষপাতী নও?
নিশ্চয়ই পক্ষপাতী। অত্যাচারী স্বামীর হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার অধিকার কোন মেয়ে না চায়?
তুমি মদ্যপ, চরিত্রহীন, নিষ্ঠুর বা উদাসীন স্বামীদের সমর্থন করে না তো!
না। কক্ষনও নয়।
তা হলে ধ্রুবর ব্যাপারে তোমার সিদ্ধান্ত কী?
আমি ওকে জানতে চাই। জানতে চাই বলেই ওকে ছেড়ে যাইনি।
জানার কি কিছু বাকি ছিল আর?
ছিল। তোমরা বুঝবে না। ছিল। আমি বহুবার টের পেয়েছি, ওর মদের কোনও নেশা নেই সত্যিকারের। ওর মধ্যে সত্য কোনও নিষ্ঠুরতাও নেই।
তোমাকে কি ও কখনও ভালবেসেছে?
কী জানি! হয়তো বাসেনি। আমাকে কতবার অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রেখে কোথায় চলে গেছে। এমনকী অন্য পুরুষের সঙ্গে প্রেম করার জন্য উৎসাহ পর্যন্ত দিয়েছে।
এই কি স্বামীর কাজ? এটা কি ভালবাসা?
না। স্বীকার করছি, না।
তা হলে আর জানার বাকি ছিল কী? ও তোমার স্বামী হতে পারেনি কোনওদিন।
বলছি তো এসবই ঠিক। তবু ওর মধ্যে কী ছিল বলো তো, আমি যতক্ষণ ওর কাছে থাকতাম, মানে ও যতক্ষণ আমার কাছে থাকত ততক্ষণ আমি ভারী নিরাপদ বোধ করতাম। মনে হত, এবার আমি নিশ্চিন্ত।
ভুল রেমি। ওটা তোমার মনে হওয়া মাত্র। সত্যি নয়। ধ্রুব কোনওদিন তোমার নিরাপত্তার কথা ভাবেনি।
তা হলে আমার মনে হত কেন? ভুল? তা হোক না। এরকম কিছু ভুলই যদি আমার সারা জীবন অটুট থাকত তা হলেই আমার ছোট্ট জীবনটা কেটে যেত কোনওরকমে।
কাটল না তো!
না, ঠিক তা নয়। কেটে গেল। এই তো আমার বুক জুড়িয়ে যাবে একটু পরেই। কতই বা বয়স আমার! কেটে গেল তো!
মৃত্যুর আগে একবারও সত্যকে জানতে চাও না?
না। আমি কোনওদিন খুব বেশি জানতে চাইনি। না জানলেও চলে যায়।
তোমার সম্পর্কেও কিছু অপপ্রচার রয়ে গেল যে রেমি। রাজার সঙ্গে তোমার সেই প্রেম!
উঃ কী যে বলো না তোমরা!
কে বিশ্বাস করবে রেমি যে, নিতান্তই ধ্রুবকে আকর্ষণ করার জন্য তুমি রাজাকে অত প্রশ্রয় দিয়েছিলে!
কেউ করবে না। আমি মস্ত একটা ঝুঁকি নিয়েছিলাম।
তার ফল কী হল?
সবাই বিশ্বাস করল, রাজা আর আমি প্রেমে পড়েছি। কিন্তু যার বিশ্বাস হওয়ার কথা তারই হল না।
কে বলো তো! ধ্রুব?
হ্যাঁ। সারাজীবন সে আমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে। সবচেয়ে বড় কষ্ট কী জানো?
অবহেলা?
ঠিক। অবহেলা। সে বিশ্বাসই করল না যে, আমি রাজার প্রেমে পড়েছি। কিংবা বিশ্বাস করলেও পাত্তা দিল না তেমন। পুরুষ মানুষের দখলদার মন থাকে, দখলের জায়গায় অন্য কেউ হাত বাড়ালে সে গর্জে ওঠে। তবু ও গর্জাল না। আমাকে দখল করতে চায়নি তো কখনও, তাই। একেই তো অবহেলা বলে, না?
তুমি বড় নির্লজ্জ, রেমি। এই নারী স্বাধীনতার যুগে ওই মদ্যপ, দুশ্চরিত্র, নিষ্ঠুর ও অপ্রকৃতিস্থ ধ্রুবর সম্মোহন কাটাতে পারলে না। অবোধ মুগ্ধ হয়ে বইলে।
তা নয়। তা নয় গো। আমি জানতে চেয়েছিলাম, ওর মধ্যে কোনও রহস্য আছে কি না। ছেড়ে গেলে তো জানা হত না।
ছেড়ে তো যাওনি। জানতে পারলে কি?
না। ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেল। ছদ্মবেশ কিছুতেই খুলতে পারলাম না।
ছদ্মবেশ নয় রেমি। ধ্রুবকে সবাই জানে। ও যা, ও তাই। তুমি খামোকা ধানখেতে বেগুন খুঁজতে নেমেছিলে। ওর মধ্যে কোনও রহস্য নেই। ছদ্মবেশও নেই।
তবে কেন ওর চোখের মধ্যে আমি এক-এক সময়ে খুব গভীর একটা কিছু লক্ষ করতাম।
তোমার মনের ভুল, রেমি। যার প্রতি আমাদের দুর্বলতা থাকে তার মধ্যে আমরা নানা কাল্পনিক গুণ আরোপ করে নিই।
না, আমি মানি না। আমি যত বেশি ওকে টের পেতাম তেমন তো কেউ টের পেত না ওকে। তোমরা বুঝবে না গো।
অপাত্রে তোমার সব ভালবাসা গেল রেমি, তার চেয়ে রাজাকে একটু ভালবাসলে পারতে।
রাজাকে তো বহু মেয়ে ভালবাসত। কত রূপ, কত গুণ।
তুমি কেন পারলে না?
আমিও বাসতাম। তবে প্রেমিকের মতো নয়।
তবে কেমন?
যেমন ভাইয়ের ওপর বোনের ভালবাসা।
রাজা কিন্তু–
জানি। বোলো না গো।
তুমি টের পেতে রেমি?
পেতাম। প্রথম দিন থেকেই।
আর ধ্রুব তোমাকে পরপুরুষের সঙ্গে প্রেম করার উদার অনুমতি দিয়েছিল। তবু পারলে না?
বোকার মতো কথা বোলো না। মেয়েমানুষ কোনওদিন কখনও একজন ছাড়া দ্বিতীয় পুরুষকে ভালবাসতে পারে না। এমনকী এই নারী স্বাধীনতার যুগেও। যাদের দেখো অনেক পুরুষের সঙ্গে ঢলাঢলি করে বা একটা ছেড়ে তিনটে-চারটে বিয়ে করে তারা কাউকেই ভালবাসতে পারেনি কখনও ওরকম হয় না।
