সমস্যা তাঁর একরকম নয়। একটা বিষাক্ত সন্দেহ ইতিমধ্যেই তার ভিতরে সঞ্চার করেছে মনু। কী করবেন তা বুঝতে পারছেন না।
হেমকান্ত ঝুম হয়ে বসে রইলেন।
বিকেলে শচীন কখন কাছারিঘরে আসে তা আজকাল লক্ষ রাখে বিশাখা। ছাদটা আজকাল চপলার দখলে। তাই সে ছাদে ওঠে না। বাইরের দিককার দোতলা একটা ঘরের জানালা একটু ফাঁক করে দেখে।
শচীন সাইকেলটা বারান্দার গায়ে ঠেস দিয়ে রেখে ভিতরে ঢোকে। ঢোকবার আগে একবার ছাদের দিকে তাকায়। মুচকি একটু হাসে। ওই হাসিটাই গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দেয় বিশাখার। কাকে দেখে শচীন হাসে এবং কেন হাসে তা সে জানে।
চপলার সঙ্গে আজকাল সে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলে না। মুখ দেখাদেখিও প্রায় বন্ধ। কৃষ্ণকেও বউদির সঙ্গে মেলামেশা করতে বারণ করেছে সে। কিন্তু বোকা এবং জেদি কৃষ্ণকান্ত কারও কথা শোনার পাত্রই নয়।
একা একা জ্বলে মরছে বিশাখা।
আজ বিকেলে সে আর পারল না। চিকন নামে একটা নতুন বাচ্চা ঝি বহাল হয়েছে সবে। চালাকচতুর। তাকে ডেকে একটা চিঠি পাঠাল শচীনকে। লিখল, কাছারির পিছনের বাগানে একবার আসবেন এক্ষুনি? বড় দরকার।
বিকেলের আলো আজকাল সহজে মরতে চায় না বলে বিশাখা চিঠিটা পাঠাল সন্ধের মুখটায়। আলো-আঁধারি ভাবটা যখন ঘনিয়ে এসেছে, শঙ্খে ফু পডেছে, জ্বলে উঠছে দু-একটা ঘরের আলো, ঠিক তখন।
একটু সাজল বিশাখা। বেশি নয়। চোখের নীচে কাজল টানল। তারপর চুপিসাড়ে নেমে এল সিঁড়ি দিয়ে।
কুঞ্জবনটা হেমকান্তর সম্পত্তি। তবে সব দিন তিনি থাকেন না। আজকাল অনেক বিকেল তিনি ঘরে বসেই কাটিয়ে দেন। কখনও-বা বড় বউমার তাগাদায় গাড়ি নিয়ে হাওয়া খেতে বেরোন। আজও তাঁকে ঘোড়ার গাড়িতে বেরিয়ে যেতে দেখেছে বিশাখা।
সেদিন যেখানে বসেছিল, সেই ভাঙা গাড়ির পাদানিতে আজও এসে বসল বিশাখা।
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। কাছারিঘর থেকে বেরিয়ে দীর্ঘকায় শচীন লতাপাতায় আচ্ছন্ন শুড়িপথটা দিয়ে মাথা নিচু করে এসে কুঞ্জবনে ঢুকল।
বিশাখার বুক কাঁপছিল। আগেরবার তার সঙ্গে শচীনের সাক্ষাৎকার ঘটিয়েছিল চপলা। তাব। নিজের কোনও দায় ছিল না। কিন্তু এবার শচীনকে ডেকেছে সে নিজেই।
শচীনের হাবভাবে লজ্জা-সংকোচের বালাই নেই। সামনে এসে বুঝি-বা একটু ভ্রু কুঁচকেই দেখল তাকে। বিশাখা মাথা নত করে উঠে দাঁড়াল।
শচীন বলল, তুমি ডেকেছ? কী ব্যাপার?
বিশাখা কিছু ভেবে আসেনি। কী যে বলবে তা তার মাথায় আসছিল না। পায়ের আঙুলে মাটি খুটতে খুঁটতে সে বলল, আমার কয়েকটা কথা ছিল।
বলো।
আপনি রাগ করবেন না?
তুমি তো অনেক কথাই আড়ালে বলেছ। তাতে কি আর তেমন রাগ করেছি? আজ কী বলবে?
আমার দোষ হয়েছে।
কীসের দোষ?
ওসব কথা বলা ঠিক হয়নি সুফলাকে।
যা বলেছ তা আমি মনে রাখিনি। কিন্তু তোমার মনোভাবটা ভাল নয়। ওরকম মন থাকলে জীবনে সুখী হওয়া মুশকিল।
আমি শুনেছি আপনার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে!
তা একরকম বলতে পারো। কেন বলো তো!
আমি বলছিলাম কী… বিশাখা থেমে যায়।
বলো না, লজ্জা কীসের?
আমি বলছিলাম, বউদি খুব ভাল লোক নয়।
কোন বউদি? চপলা?
বিশাখা এবার তীক্ষ্ণ একটা কটাক্ষে এক পলক দেখে নিল শচীনের মুখ। কিছু বুঝতে পারল না। বলল, হ্যাঁ। বউদি আমার নামে হয়তো আপনার কাছে অনেক কিছু বলেছে।
কী বলেছে?
জানি না। কিন্তু বউদির ওরকম স্বভাব।
তোমার বউদির সঙ্গে আমার তোমাকে নিয়ে তেমন কথা হয়নি।
তা হলে কী নিয়ে আপনাদের কথা হয়?
কেন? জেনে কী করবে?
বলুন না।
অনেক কিছু নিয়ে। সেসব তুমি বুঝবে না।
বউদি কলকাতায় গেল না কেন জানেন?
জানি।
কেন বলুন তো!
শচীন একটু অস্বস্তি বোধ করল নাকি? খানিকটা সময় নিয়ে বলল, জেরা করছ?
না। জেরা করব কেন?
তোমার বউদি কেন যায়নি সেটা তোমাদেরই ভাল জানার কথা।
বউদি লোককে যা বলছে তা নয়।
কী বলছে?
বলছে এখানকার স্বাস্থ্য ভাল, হাওয়া ভাল। একদম বাজে কথা।
তবে আসল কথাটা কী?
বউদি যাচ্ছে না আপনার জন্য।
আমার জন্য?—শচীন যেন একটু উদ্বিগ্ন গলায় বলে, আমার জন্য উনি কলকাতায় যাবেন না কেন?
সেই কথা বলার জন্যই আমি আপনাকে ডেকেছি।
কথা না হেঁয়ালি! এসব কী বলছ?
ঠিকই বলছি। আপনি তো পুরুষ মানুষ। তার ওপর কাজের লোক। সবকিছু বোঝেন না।
ঠিক আছে। তুমিই বোঝাও।
বউদি ভাল মেয়ে নয়। ওর বাপের বাড়ির সবাই ভীষণ সাহেব। ওরা কোনও নিয়মকানুন মানে না।
তা জেনে আমার কী হবে?
ওর সঙ্গে আপনি একটু সাবধানে মিশবেন।
শচীন একটু হাসল। তারপর বলল, সাবধানে না মিশলে কী পরিণাম হতে পারে বলো তো!
বিশাখা আবার নতমুখী হয়। খুব দ্রুত ভাববার চেষ্টা করে সে। আর যত ভাবে, ততই তার মাথা গুলিয়ে যায়।
খুব মৃদুস্বরে বিশাখা বলে, আপনি কি জানেন না?
কী জানব বিশাখা?
বিশাখার বুক কাপল। সে লড়াইটা হেরে যাচ্ছে।
শচীন হঠাৎ গলাটা খুব নামিয়ে বলল, তুমি কি চপলাকে সন্দেহ করো? করলেও লাভ নেই। ও কথা কেন বলছেন?
চপলাকে নিয়ে যদি আমি পালিয়ে যাই তোমরা কেউ কিছু করতে পারবে না। পারবে?
পালাবেন?
সে কথা বলিনি। যদির কথা বলছি। তুমি কথাটা তোমার বাবাকেও বলতে পারো।
বাবাকে? বিশাখা কেমন দিশাহারা হয়ে গেল। শচীন যে তার মনের একটুখানি সন্দেহের এত স্পষ্ট জবাব দেবে তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি।
শচীন মৃদু একটু হেসে বলল, তোমাদের পরিবারে কত কী ঘটে বিশাখা। বড় বড় বাড়ির বড় বড় কেচ্ছা। সেসব যদি ভাবো তা হলে দেখবে আমরা কিছুই পাপ-টাপ করছি না। তোমার বউদি চালাক-চতুর মেয়ে, লেখাপড়া জানে, কলকাতায় থাকে, ওঁর সঙ্গে কথা বলে আরাম পাই। তার বেশি কিছু না। সব মেয়েই কি আর সস্তা হয়? যাও, বাড়ি গিয়ে মাথায় জল ঢেলে মাথাটা ঠান্ডা করো। এসব ভেবো না।
