মামুদ সাহেব চুপ করে রইলেন।
হেমকান্ত কথা খুঁজে না পেয়ে প্রশ্ন করলেন, তোর প্র্যাকটিস কেমন?
কোথায় প্র্যাকটিস? হিন্দুরা তো আর ডাকবে না আমাকে। তা আমি এখন ডাক্তারি প্রায় ভুলেই যাচ্ছি।
মামুদের সমস্যা হেমকান্ত জানেন। কী বলবেন, চুপ করে রইলেন।
মামুদ সাহেব বললেন, হেমভাই, দিনকালটা বড় ভাল নয়। হিন্দু-মুসলমানে হুট বলতেই দাঙ্গা লেগে যাচ্ছে। বিহিত কিছু ভাবছিস?
হেমকান্ত কাঁচুমাচু হয়ে পড়েন। বাস্তবিকই তিনি সমাজ-সংসারের তেমন খোঁজ রাখেন না। বললেন, আমি তো ভাই রাজনীতি করি না, কী ভাবব?
তোকেই ভাবতে হবে। রাজনীতি না করিস, তোর হাজারের ওপর মুসলমান প্রজা আছে। তাদের ভালমন্দ তুই ছাড়া কে দেখবে?
ভালমন্দ দেখার জন্য তোক লস্কর পেয়াদা লাঠিয়াল লাগে। সেসব তো আমার নেই।
মামুদ সাহেব বললেন, আমি শুধু মুসলমানদের পক্ষ হয়ে বলতে আসিনি। হিন্দুদেব হয়েও বলছি। দাঙ্গা লাগলে দুপক্ষেরই নিরীহ লোকের বিপদ।
সে তো বুঝি। ভাবিও। কিন্তু কী করব বল?
সেটা বলতেই আসা। আমি হিন্দু মুসলমান সব বিশিষ্ট লোককে নিয়ে একটা কমিটি করতে চাই।
কমিটি! তা বেশ তো, কর না।
ওভাবে বললে হবে না। কমিটি-টমিটি মেলা তৈরি হচ্ছে আজকাল। তাতে তেমন কাজ হয় না। আমি ভাবছি যা-যা করলে দাঙ্গা হবে না এই কমিটি তা-তা করবে।
কিছু ভেবেছিস?
ভেবেছি। মৌলবি লিয়াকত হোসেন কিছুদিন আগে খবরের কাগজে এক বিবৃতি দিয়ে মুসলমানদের গো-হত্যা বন্ধ রাখার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু খবরের কাগজ আর কজন পড়ে বল! তাই আমাদের কমিটির লোকেরা এসব কথা গ্রামে গ্রামে গিয়ে সকলকে বুঝিয়ে বলতে পারে। তাতে কাজ হবে। এরকম আরও অনেক কিছুই করা যায়। হিন্দুরাও করবে, মুসলমানরাও করবে। তাদের দিয়ে করাতে হবে।
হেমকান্ত অসহায়ভাবে বলেন, আমি যত মানুষকে রোজ দেখি তারা তো তেমন খারাপ লোক নয়। তবে দাঙ্গা খুনোখুনি কারা করে বল তো!
গেরস্থ সাধারণ মানুষেরা করে না। করে কিছু গুন্ডা বদমাশ। তারা হিন্দু মুসলমান কিছু নয়। তাদের জাতই ওই। এদের ঠেকানোই বড় কাজ।
হেমকান্ত মাথা নেড়ে বলেন, শুধু এদের ঠেকালে হবে কেন? উসকে দিচ্ছে কারা তাও তো দেখতে হবে।
সে আমরা জানি। উসকে দেয় ইংরেজ, উসকে দেয় রাজনীতির লোকেরা। সে কথাটাই যদি মানুষকে বুঝিয়ে বলা যায় তা হলে কেমন হয়?
হেমকান্ত বললেন, কদিন আগেই বোম্বাইয়ে কী কাণ্ড হয়ে গেল। আমার মনে হয় কমিটি করে এ জিনিস বন্ধ করা যাবে না।
তা হলে তুই কী করতে বলিস?
হেমকান্ত হাসলেন, আমার কী জানিস? আমার হল নেগেটিভ প্রমিনেন্ট। সর্বদা হবে না কথাটাই জপ করি। আমার কথা ছেড়ে দে। কমিটিই কর বরং।
মামুদ সাহেব হেসে বললেন, আমরা কমিটি করব আর তুই আলগোছে বসে থাকবি তা হবে না।
আমাকে আবার কেন?
তোকে প্রেসিডেন্ট করা হবে।
ও বাবা!
মামুদ সাহেব গভীর ও আন্তরিক গলায় বললেন, আমি তোকে জানি, হেম। তুই সবকিছু থেকে দূরে থাকতে চাস। কিন্তু কত আর দূরে থাকবি বল? ঘরের কাছে আগুন লাগলে মানুষ কি আর বসে থাকতে পারে? দেখছিস না, যে-কোনওরকম গণ্ডগোল লাগলেই সেটা গিয়ে হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গায় দাঁড়ায়। বোম্বাইয়ে কী হয়েছিল মনে নেই? কাপড়কলে শ্রমিকরা ধর্মঘট করেছিল। ধর্মঘটের বিরুদ্ধেও ছিল কিছু লোক। কপাল এমন যে, ধর্মঘটিরা হিন্দু আর বিরোধীরা মুসলমান। ফলং রায়ট। দুমদাম কিছু লোক মরে গেল। এরকমটা এদিকেও হতে পারে।
হেমকান্ত খুব বেশি খবর রাখেন না। বললেন, তা তো পারেই। হয়েছেও।
হয়েছে সে জানি। কিন্তু আর হতে দিতে চাই না। পাঞ্জাবের এক গবরনর ছিল মাইকেল ওডায়ার। সে বিলেতের এক কাগজে লিখেছে, ১৯১৯ সালের সেই রাউলাট আইনের বিরুদ্ধতা থেকেই এসব দাঙ্গা-হাঙ্গামার শুরু। আরও বলেছে, এসবের পিছনে জার্মানির উস্কানি আছে। কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট মতিলাল নেহরু আর সেক্রেটারি জহরলাল নেহরু নাকি রীতিমতো জার্মানির সঙ্গে ফন্দি আঁটছেন। ১৯৩২ সালে রাশিয়া নাকি ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াইতে নামবে, আর তখন ভারতেও বিদ্রোহ ঘটবে। এই বিদ্রোহ ঘটানোর জন্য বলশেভিকরা কংগ্রেসের মাধ্যমে বাঙালি আর মাদ্রাজি ছেলেদের তৈরি করছে। জানিস এতসব কথা?
না। এসব কি খবরের কাগজে বেরিয়েছে?
হ্যাঁ। তবে খবরের কাগজে খবরটাকে বেশি পাত্তা দেয়নি। তারা না দিক আমি দিই। ওডায়ারের ওসব কথা বিশ্বাস করার মতো লোকও কিন্তু অনেক আছে।
তা অবশ্য আছে।
আমাদের কাজ হবে এই ভুল ধারণাগুলোকে ভেঙে দেওয়া। মহাত্মাজি তার আন্দোলন করছেন করুন, নেতারা স্বরাজ আনুন, কিন্তু হিন্দু-মুসলমানের ব্যাপারটা আমাদের ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছে। এটাকে এক্ষুনি ফাইট-টাইট করা দরকার।
হেমকান্ত করুণ নয়নে মামুদের দিকে চেয়ে বললেন, তা বেশ ভারী কাউকে প্রেসিডেন্ট করলে হয় না?
হয়। কিন্তু আমি তোকে দিয়ে একটু কাজ করাতে চাই।
আমি কি কাজের লোক?
না। সেইজন্যই তোকে কাজের লোক করে তুলতে চাই।
মামুদ সাহেব উঠলেন! পকেট থেকে কৌটো বার করে একটা লবঙ্গ মুখে ফেলে বললেন, বাগদাদে কিনেছিলাম। ভারী সস্তা। নিবি?
হেমকান্ত মাথা নাড়লেন, না। লবঙ্গ কে খাবে?
তা হলে আসি।
মামুদ সাহেব চলে যাওয়ার পর বেশ অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন হেমকান্ত। হিন্দু-মুসলমানে দাঙ্গা এ দেশের কালব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রক্তপাত হেমকান্ত একদম সইতে পারেন না। তাই খবরের কাগজে এসব ঘটনা তিনি ভাল করে পড়েনও না। তবু এই যে মামুদ এসে তাকে একটা কমিটির সঙ্গে জড়িয়ে দিয়ে গেল এতে কাজটা ভাল হল না মন্দ হল তিনি বুঝতে পারছেন না।
