কমপ্যানি দিতে। তুমি নেই, বউদি একা। তাই।
মতলবটা কী?
তা জানি না কুট্টিদা।
মন্ত্রীমশাই আর-একটা চাল চেলেছে। কিন্তু চালটা বুঝতে পারছি না রে রাজা।
আমিও বুঝতে পারছি না।
তবে ভেড়ার মতো যা বলছে তাই করছিস কেন?
কিছু ক্ষতি তো নেই!
তোর নেই, কিন্তু রেমির আছে।
তার মানে?
তোর অনেক গার্লফ্রেন্ড আমি জানি, একে রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে বেড়াস, তার ওপর লালটুমার্কা চেহারা। তোর ফ্যান অনেক। কিন্তু রেমি বোকা মেয়েমানুষ। ওর বয়ফ্রেন্ড কেউ নেই।
ওসব বলছ কেন?
বলছি, তোর আর রেমির মধ্যে যদি কোনও সফটনেস দেখা দেয় তা হলে সেটা কোনও পরিণতিতে যাবে না। রেমির সঙ্গে তুই লাইফটা কাটাতে চাইলেও পারবি না। কৃষ্ণকান্ত তোকে কেটে ফেলবে। সুতরাং–
রাজা প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিল।
কিন্তু ধ্রুব বাধা দিয়ে বলল, আগে শোন। কে যদি বিলা হয়ে যায় তবে তুই সইতে পারবি। কারণ তোর মেয়েছেলে অনেক দেখা আছে। রেমি পারবে না। কারণ ও সিরিয়াস টাইপের মেয়ে।
তুমি কি আমাদের সন্দেহ করো, কুট্টিদা?
করি। কারণ কেসটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
তবে আমাকে ছুটি দাও।
দূর পাগলা! তুই ভাবছিস আমি রাগ করেছি। মোটেই না। আমি চাই রেমি আমাকে ছেড়ে অন্যদিকে একটু ইন্টারেস্ট নিক। কিন্তু আমি চাইলেই তো হবে না। কেষ্ট চৌধুরী রেমির চামচা। তাই বলছি খুব সাবধান।
উনিই তো আমাকে বলেছেন।
কেন বলেছেন সেইটেই তো বুঝতে পারছি না রে গাড়ল। তাই ভাবছি রেমির জন্য উনি একটা নরবলির ব্যবস্থা করেছেন কি না।
কী বলি?
নরবলি। আমার মনে হচ্ছে তোকে উৎসর্গ করা হচ্ছে।
রাজা হেসে ফেলেছিল, ঠাট্টা করছ, কুট্টিদা?
রে। ঠাট্টা নয়। কিন্তু তোকে নার্ভাস দেখাচ্ছে কেন?
কই নার্ভাস?
তোর ভয় নেই। আমি কিছু বলব না। ক্যারি অন। শুধু কেষ্ট চৌধুরীর দিকে নজর রাখিস।
০৪৭. মামুদ সাহেব
সকালবেলাতেই মামুদ সাহেব এসে হাজির। ছোটখাটো মানুষ। মাকুন্দ। খুব ফটফটে সাদা পাজামা আর পাঞ্জাবি পরনে। মাথায় জালি কাজ করা ফেজ। গা থেকে মৃদু গোলাপি আতরের সুবাস ছড়াচ্ছে। মুখে একখানা লবঙ্গ। চোখের দৃষ্টিতে খর বুদ্ধির চিকিমিকি।
হেমকান্ত মামুদকে আবাল্য চেনেন। তাঁর সমবয়সি। স্কুলে এক ক্লাস উঁচুতে পড়ত। বরাবরই দারুণ ভাল ছাত্র। কলকাতা থেকে ডাক্তারি পাশ করে এসে কিছুকাল প্র্যাকটিস করার চেষ্টা কবে। কিন্তু পসার তেমন হয়নি। গোঁড়া হিন্দু পরিবারে মুসলমান ডাক্তার কল পায় না। ফলে মামুদকে একটা সীমাবদ্ধ গণ্ডির মধ্যে প্র্যাকটিস করতে হয়। হেমকান্ত শুনেছেন, মামুদ বিলেতে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। বড় ডাক্তার হয়ে এলে হয়তো পসার জমত। কিন্তু সেটাও হয়ে ওঠেনি টাকার অভাবে।
অনেককাল মামুদের সঙ্গে দেখা হয়নি।
হেমকান্ত তাকে দেখে খুশি হয়ে বললেন, কেমন রে মামুদ, ভাল আছিস?
মামুদ বললেন, তুই কেমন?
বহুকাল তোর দেখা নেই। কী করছিস?
কী আর করব! হজটা সেরে এলাম।
হজ! সে তো মক্কায়!-হেমকান্ত খুব বিস্মিত হয়ে চেয়ে থাকেন।
মামুদ সাহেব মৃদু হেসে বলেন, কাবা তো মক্কাতেই। সেটা কোন আহাম্মক না জানে?
অত দূরে গিয়েছিলি!
হ্যাঁ। এদিক-ওদিক একটু ঘুরেও এলাম।
যাওয়ার আগে বলে যাসনি তো!
মেলা লোকের মেলা ফরমাস ছিল। মাথা গড়বড় হয়ে গিয়েছিল তখন। দেখা করার ফুরসত ছিল না।
হেমকান্ত একটা বিক্ষুব্ধ শ্বাস ছাড়লেন। মক্কা কতদূর! তিনি নিজে কখনও অত দূরে যাবেন না।
মামুদ সাহেব গলাটা সাফ করে নিলেন। তারপব বললেন, কাবুলে খুব গণ্ডগোল।
হেমকান্ত মাথা নাড়লেন। কাবুলের গণ্ডগোলেব কথা তিনি জানেন। আর-একটা বিশ্বযুদ্ধ লেগে যেতে পারে। তবে সম্ভাব্য বিশ্বযুদ্ধ তাঁকে উদ্বিগ্ন করে না। বাইরের বড় বড় ঘটনা তাকে স্পর্শ করে কমই। তিনি শুধু মুখে একটা দুশ্চিন্তার ভাব ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করলেন। হেমকান্ত জিজ্ঞেস করলেন, মক্কায় কীসে গেলি? জাহাজে?
মামুদ সাহেব এইসব আহাম্মকি প্রশ্নে মৃদু হাসলেন। বললেন, জাহাজ ছাড়া আর কীসে? তবে কষ্ট হয়েছে খুব। বমি-টমি করে একদম শয্যা নিতে হয়েছিল।
জাহাজ! হেমকান্তর মাঝে মাঝে জাহাজের কথা মনে হয়। স্টিমারে কয়েকবার চেপেছেন বটে, কিন্তু অকূল সমুদ্রে বিশাল জাহাজে নিরুদ্দেশযাত্রা খুবই অন্যরকম ব্যাপার। এই জীবনে জাহাজে চড়াও হল না হেমকান্তর।
হেমকান্ত নড়েচড়ে বসে বললেন, বল তোর মক্কার গল্প। শুনি।
মামুদ সাহেব পকেট থেকে একটা দস্তার কৌটো বের করে আর-একটা লবঙ্গ মুখে ফেলে কৌটোটা বাড়িয়ে দিলেন হেমকান্তর দিকে, নিবি একটা?
হেমকান্ত নিলেন।
কৌটোটা পকেটে পুরে মামুদ সাহেব তাঁর ভ্রমণকাহিনি বলতে লাগলেন। কলকাতা হয়ে বোম্বাই যাত্রা। তারপর জাহাজে। মক্কা ও মদিনার রুক্ষ ভূ-প্রকৃতি ও জলবায়ু। তীর্থযাত্রীদের জন্য ব্যবস্থা ইত্যাদি। মামুদ সাহেব কম কথার মনুষ, বিশেষ রসিক-প্রকৃতিরও নন। সেইজন্য মিনিট দশ-পনেরোর মধ্যেই তার ভ্রমণবৃত্তান্ত শেষ হয়ে গেল।
হেমকান্ত সব শুনেটুনে বললেন, তোর তো ধর্মে এত মতি ছিল না!
মামুদ সাহেব একটু সংকুচিত হয়ে বললেন, হজটা সেরে রাখা নাকি ভাল, সবাই বলে।
আমাকেও তীর্থে যাওয়ার কথা বলে অনেকে।
মামুদ সাহেব হেসে বললেন, গেলেই পারিস। তোদের তো কষ্ট নেই, খরচও কম। গয়া কাশী বৃন্দাবন সবই ঘরের কাছে।
হেমকান্ত মাথা নেড়ে রসিকতা করে বললেন, অলস লোকদের কাছে এ ঘর থেকে ও ঘরটাও দূর বলে মনে হয়।
