সর্বনাশ বউদি! কুট্টিদা যখন ভাল তখন ভাল। কিন্তু যখন খারাপ–
রেমি সেই কথাটায় কান না দিয়ে বলল, তুমি অত ভেবো না। আমরা এমন বিহেভ করব যাতে ও সত্যিই ভেবে নেয় যে, আমি তোমার সঙ্গে প্রেম করছি। তখন ও এত জেলাস হয়ে উঠবে যে, জ্বলতে জ্বলতে এসে একদিন সারেন্ডার করবে!
রেমির এই কথায় রাজার চোখ থেকে একটা পরদা সরে গেল। একথা ঠিকই যে, রেমির সঙ্গে তার একটা দেওর-বউদির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। বরং আরও কিছু ঘনিষ্ঠতর ভালবাসা। প্রায় সর্বত্রই রাজার সহচরী রেমি বউদি এবং রেমি বউদির সহচর রাজা। এটা নিয়ে লোকে কিছু বলাবলি করলেও অবাক হওয়ার নেই। রাজাও এরকমই ভাবত। কিন্তু হঠাৎ বুঝতে পারল, রেমি হাজার বছর ধরে তার ছায়া হয়ে ঘুরে বেড়ালেও কোনওদিন কুট্টিদার দিক থেকে মন ফেরাতে পারবে না। রেমিও তাকে ঘুটি বানিয়ে একটা প্রেম-প্রেম ভাব গড়ে তুলতে চাইছে, স্রেফ ধ্রুবর জন্যই।
একবাব তাকে খুঁটি বানিয়েছেন কৃষ্ণকান্ত। দ্বিতীয়বার বানাল রেমি। অথচ কেবলমাত্র খুঁটি হওয়াব কথা তো নয় তার। সে অতীব সুপুরুষ। উঁচু দরের গায়ক। নামকরা সঙ্গীত পরিচালকও। যে কোনও মেয়ের পক্ষেই তার প্রেমে পড়ে যাওয়া স্বাভাবিক।
রাজা সেই প্রথম পরাজয়ের স্বাদ টের পেল। ব্যর্থতা আর তেতো বোধে ভরে গেল তার অভ্যন্তর। সে বলল, আমি ওসব খেলার মধ্যে নেই, বউদি। আমাকে রেহাই দাও।
রেহাই চাইছ? কেন? আমি কী করলাম?–বড় অভিমান ভরে রেমি বলো।
বউদি, তুমি ছেলেমানুষ। সব বুঝবে না।
আমার জন্যে তোমার মায়া নেই?
ভীষণ মায়া, বউদি।
তা হলে! আমার জন্য এটুকু করো। পায়ে পড়ি।
কোনটুকু বউদি! ধ্রুবদাকে তোমার অনুগত করে ভোলা?
হ্যাঁ, রাজা। ও কেন আমাকে একটুও পাত্তা দেয় না?
দেবে বউদি। কুটিদার জন্ম নভেম্বর মাসে। সায়ন মতে বৃশ্চিক রাশি। বড় সাংঘাতিক লোক। এ রাশির লোকেরা কোনও কালে মেয়েদের বশ হয় না।
তুমি জ্যোতিষ জানো নাকি?
ঠিক জানা একে বলে না। একটু-আধটু বইপত্র ঘেঁটেছি। কুট্টিদা আমার কাছে চিরকালই এক রহস্যময় মানুষ।
আমার কাছেও। কী করবে বলো তো!
কী বলব? শুধু বলি, মেনে নাও।
তুমি ওকে অত ভয় করো কেন?
শুধু ভয় নয় বউদি, কুট্টিদাকে ভালবাসি।
রেমি ভারী অসহায় ভাবে মুখখানা একটু হাঁ করে চেয়ে থেকে বাচ্চা বয়ঃসন্ধির মেয়ের মতো বলল, আমিও বাসি। কিন্তু কেন যে বাসি তা বুঝতে পারি না।
সেটাই তো বৃশ্চিকের রহস্য। ও রহস্য ভেদ হওয়ার নয়।
তা হোক। তুমি আমাকে ছেড়ে দিয়ো না। তোমাকে আমার যে ভীষণ দরকার।
আচ্ছা, আসব। কিন্তু আগের মতো যখন-তখন ঘর থেকে বের করে নিয়ে যেতে পারব না। কুট্টিদা ব্যাপারটা পছন্দ না করতে পারে।
কাঁদো-কাঁদো হয়ে রেমি বলল, তা হলে তো বাঁচতাম, রাজা। কিন্তু ও নিজেই আমাকে অন্যের সঙ্গে প্রেম করার পরামর্শ দেয়।
ঠাট্টা করে!
মোটেই নয়। আমি কি এতই বোকা যে ওর ঠাট্টাটাও বুঝতে পারব না?
রাজা একটু হেসেছিল মাত্র।
সেইসময় একদিন কৃষ্ণকান্ত ডেকে পাঠালেন রাজাকে। গভর্নমেন্ট প্লেস-এ কৃষ্ণকান্তর একটা পুরনো চেম্বার আছে। যখন রাজনীতি করেন না তখন মাঝে মাঝে তার ল প্র্যাকটিস করার কথা মনে হয়। ওকালতি করলে তার আয় ভালই হত। এক সময়ে একটা এটনি ফার্মও খুলেছিলেন। সেগুলো সব লাটে উঠেছে। তবে গভর্নমেন্ট প্লেস-এ চেম্বারটা তার এখনও আছে। সেখানেই দেখা হল।
রাজা, কী খবর রে?
ভাল।
বউমাকে গান-টান কিছু শেখালি?
গান! কই গান শেখানোর কথা কিছু বলেননি তো!
বলিনি! তবে কী বলেছিলাম?
জাস্ট কমপ্যানি দেওয়ার কথা বলেছিলেন।
এমনি-এমনি আবার কমপানি কী রে! কিছু একটা কাজ নিয়ে থাকবি তো!
বউদিও গানের কথা কিছু বলেনি।
বউমার কি এখন সেরকম মন আছে? দামড়াটার পাল্লায় পড়ে ওর হাড়মাস কালি হয়ে গেল। বড় দুঃখী মেয়ে। একটু গান-টান করলে মনটা ভাল থাকত। ওর গলা কেমন?
একটু ভেবে রাজা বলল, বোধহয় খারাপ হবে না।
তা হলে একটু শেখাস।
যদি শিখতে না চায়?
এমনিতে চাইবে না। গরজটা তুই-ই দেখাবি।
ঠিক আছে, আপনি যখন বলছেন, দেখব।
কৃষ্ণকান্ত একটু গম্ভীর হয়ে খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, তবে অনারেবল ডিসট্যান্স বজায় রেখে যা করার করবে।
অনারেবল ডিসট্যান্স! তার মানে?
মেয়েদের সঙ্গে, বিশেষ করে গেরস্ত বউদের সঙ্গে একটা সম্মানজনক দূরত্ব থাকা ভাল।
রাজা রেগে উঠতে যাচ্ছিল।
কৃষ্ণকান্ত মৃদু হেসে বললেন, এগুলো ভাল কাস্টম। কাজ হয়।
রাজা মনে মনে ভাবল, খচ্চর বুড়ো, এই অনারেবল ডিসট্যান্সের কথা এখন কেন? আগে তো বলোনি কখনও ঘুঘু!
গান শিখতে রেমি অবশ্য একটুও আপত্তি করল না। কারণ সে তখন যেমন করেই হোক রাজাকে হাতে রাখতে চায়।
সপ্তাহে দুদিন-তিনদিন গিয়ে রেমিকে তালিম দিত বাজা। রেমির গলা ভাল। অনভ্যাসে বসে গিয়েছিল। তালিম পেয়ে গলা খুলল। তবে এমন কিছু উঁচুদরের গায়িকা রেমি নয়। শোনা যায়।
সেই সংগীত শিক্ষার আসরে মাঝে মাঝে ধ্রুবও থাকত। ধ্রুবর গান বা অন্য কিছুতেই আসক্তি নেই। সে শুধু লক্ষ করত দুজনকে।
একদিন গান শিখিয়ে বেরিয়ে আসছে রাজা, ধ্রুব তার সঙ্গ ধরল।
রাজা! একটা কথা বলবি?
বলল কুট্টিদা।
কেসটা কী?
কীসের কেস?
এই তোর আর রেমির।
তা আমি কী করে বলব?
তোকে ওর সঙ্গে ভেড়াল কে?
হ্যাঁ। সবই তো জানো।
না, জানি না। ভেড়ানোর ব্যাপারটায় একটু খটকা ছিল। মন্ত্রীমশাই তোকে কী বলেছিল?
