প্রচণ্ড যন্ত্রণা ভুলে প্রীতিনাথ তাঁর একনিষ্ঠ ভক্তটির দিকে অনেকক্ষণ অবিশ্বাসের চোখে চেয়ে থেকে বলেছিলেন, এমন ব্যথা যেন আমার শত্রুরও না হয়। তুমি বুঝবে না, কী সাংঘাতিক…! ওঃ! কিন্তু ধ্রুব তার যা বোঝার তা বুঝে নিয়েছিল। প্রীতিনাথকে কাতর অবস্থায় সে লক্ষ করত। টেপরেকর্ডারে তুলে নিত তার নানারকম যন্ত্রণার শব্দ। সেই ক্যাসেট বোধহয় আজও সযত্নে রেখে দিয়েছে ধ্রুব। প্রীতিনাথ মারা যাওয়ার পর কলকাতায় ফিরে এসে সবাইকে শুনিয়েছিল সেই ক্যাসেট। বলেছিল, আমি জানতাম, এইসব বিপ্লবীরা অল বোগাস। এরা কেউ ব্যথা-যন্ত্রণা সহ্য করতে পারে না। মোস্ট অর্ডিনারি পিপল। প্রীতিকাকাকে আমার এক সময় মনে হয়েছিল সুপারম্যান। দেখলাম, দূর! কিচ্ছু না। লোকটা মোস্ট এক্সপেন্ডেবল।
এইসব সিদ্ধান্তে আসার পর ধ্রুবকে বেশ সুখীই দেখিয়েছিল। প্রীতিনাথের মধ্যে অতিমানবকে খুঁজে না পেয়ে যেন সে নিশ্চিন্তই হয়েছে।
অন্যদিক থেকে দেখতে গেলে এই ঘটনার মধ্যে যে বিকট নিষ্ঠুরতা আছে তা ধ্রুব খেয়ালই করল না। শোনা যায় প্রীতিনাথের মৃত্যুর কিছু আগে ধ্রুব তাঁকে আত্মহত্যা করার পরামর্শ দেয়। সে নাকি বলেছিল, আপনার উচিত কাপুরুষদের পন্থা গ্রহণ করা। যন্ত্রণা যদি না-ই সইতে পারেন, দেন হোয়াই ডোন্ট ইউ কমিট সুইসাইড?
রাজা এরকম কিছু কিছু ঘটনার ভিতর দিয়ে ধ্রুবকে চিনেছে। তাই সে সহজে তাকে ঘাটাতে চায়।
রেমি বউদি এত ঘটনার কথা জানে না। ধ্রুবকে চিনতে তার সময় লাগবে। বেচাবা বড মানসিক কষ্টের মধ্যে এখন দিন কাটছে ওর।
বিকেলে নাটকটা চুপ করে বসেই দেখেছিল রেমি। একটু খুশিই হয়েছিল। ফেরা পথে বলল, নাটকটা তো খুব খারাপ নয়, কিন্তু তোমার মিউজিক তো তেমন কিছু শুনলাম না।
মিউজিক মানেই কি গান বা কনসার্ট?
তবে কী?
আধুনিক নাটকে বা সিনেমায় ওরকম মিউজিক কম থাকে। ব্যাকগ্রাউন্ডে নানারকম সাউন্ড তৈরি করাও মিউজিক ডিরেক্টরের কাজ।
ছাই কাজ!
মুখে যাই বলুক রেমি, রাজা সম্পর্কে তার সেদিন একটু মনোযোগও এসে থাকবে।
সেই শুরু একটা অদ্ভুত, ঘন, প্রগ সম্পর্কের।
রাজার রেকর্ডিং-এ রেমি রেডিয়ো স্টেশনে যেত। রাজার প্রোগ্রাম থাকলে গিয়ে শুনে আসত।
আরও মাসখানেক নিরুদ্দেশ থাকার পর কৃষ্ণকান্ত কলকাঠি নাড়তে লাগলেন। পুলিশকে সংবরণ করলেন। ধ্রুব ফিরে এল।
সেই সময়টা কৃষ্ণকান্তর ভাল যাচ্ছিল না। একটা ফালতু কেলেঙ্কাবিতে জড়িয়ে পড়ায় তাকে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়। প্রভাব-প্রতিপত্তি কিছুই কমেনি, কিন্তু একটা ধাক্কা খেতে হল। একটানা দীর্ঘদিন তিনি মন্ত্রিত্ব করতে পারেননি। কখনও মন্ত্রী হয়েছেন, কখনও বাদ গেছে। কিন্তু মন্ত্রীর পদ থেকে এভাবে কখনও সরে দাঁড়াতে হয়নি।
সেই দুঃসময়ে ধ্রুব ফিরল। কৃষ্ণকান্ত মন্ত্রিত্ব হারানোয় যখন সমস্ত পরিবারটাই কিছু বিষণ্ণ, তখন একমাত্র ধ্রুবই আনন্দে ঝলমল।
বাড়িতে ফিরেই রেমিকে জিজ্ঞেস করেছিল, তোমাকে মাঝে মাঝে এখানে সেখানে একটা ছোকরার সঙ্গে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়। কে বলল তো?
রেমি ঘাবড়ে গিয়েছিল একটু। চোখ-মুখ লাল করে বলল, ছোকরা আবার কে? ও তো রাজা।
ধ্রুব জবাবটা শুনল, তবু কিছুক্ষণ একদৃষ্টে চেয়ে রইল রেমির দিকে। কোনও অভিযোগ করল, সন্দেহ প্রকাশ করল না, এমনকী তাকানোর মধ্যেও কোনও কুটিলতা ছিল না। বরং সহজ সরল এক তাকিয়ে থাকা যার কোনও মানে নেই।
কিন্তু সেই দৃষ্টির সামনে রেমি ঘামতে লাগল, লাল হয়ে যেতে লাগল লজ্জায়।
ধ্রুব রেমির প্রতিক্রিয়া লক্ষ করতে করতে মৃদু স্বরে বলল, তোমাকে আমি অনেকবারই বলেছি তোমার একজন সঙ্গী দরকার। যাকে প্রকৃত সঙ্গী বলা যায়। আমি তো তোমাকে কিছুই দিতে পারি না, না সঙ্গ, না হৃদয়।
রেমি হঠাৎ রেগে গিয়ে বলে, কী যা-তা বলছ?
ধ্রুব উদাস গলায় বলে, রাজা বড় ভাল ছেলে।
রেমি দাঁতে দাঁত পিষে বলল, ভাল ছেলেই তো। ওরকম ভাল তুমিও হতে পারো না?
না।–ধ্রুব খুব গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে বলে, আমি তা হতে পারি না। এ জীবনে আর তা হবেও। কিন্তু আমার রিফর্মেশন নিয়ে অত ভেবো না। ধ্রুব যদি রাজার মতোই হয় তবে ধ্রুবর মতো কেউ যে থাকবে না। ধ্রুব রাজা সবাইকে নিয়েই তো দুনিয়া।
রেমি আর কোনও কথা বলেনি।
ধ্রুব নিজেই জিজ্ঞেস করল, রুস্তম কী বলছে?
কে রুস্তম?–রেমি ভ্রু কুঁচকে পালটা প্রশ্ন করে।
আরে রুস্তম! মহান রুস্তম। তোমার শ্বশুর এবং প্রাক্তন মন্ত্রী।
উনি রুস্তম হতে যাবেন কেন?
বীরদেরই রকের ছেলেরা রুস্তম বলে। খারাপ কথা কিছু নয়। তোমার শ্বশুরের প্রশংসাই করছি।
ওরকম রকবাজদের ভাষায় কথা বলছ কেন?
ধ্রুব একটু হাসল। বিষণ্ণ হাসি। তার চেহারাটা সেবার একটু খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তবু শীর্ণ চেহারার ভিতর দিয়েও একটা ক্ষুরধার বুদ্ধির আলো ঠিকরে বেরিয়ে আসছিল।
ধ্রুবর সঙ্গে সেই সাক্ষাৎকারের বিবরণ বিস্তারিতভাবে রেমি শুনিয়েছিল রাজাকে।
রাজা বলল, বউদি, ধ্রুবদার স্পাই সর্বত্র। আমাদের সব চলাফেরা কুট্টিদা লক্ষ রেখেছে।
রাখুক না। খারাপ কিছু তো নয়।
খারাপ নয়। ধ্রুবদা যদি সন্দেহ করে যে, আমি তোমার সঙ্গে প্রেম করছি?
রেমি খুব অবাক হয়ে সরল দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল রাজার দিকে। তারপর বলল, সন্দেহ করবে? ওমা! সন্দেহের কী? আমরা প্রেমই তো করছি রাজা! আরও করব। ইচ্ছামতো ঘুরব তোমার সঙ্গে, সিনেমায়, থিয়েটারে, গানের জলসায় যাব দুজনে।
