না। বলেছি তো, খবর আমি পাই না, বনিবনা হচ্ছে না কেন?
কারণটা শুনতে চাও?
বড় কথা ঘোরাও তুমি।–হেমকান্ত বিরক্ত হলেন।
বলছি। রাগ কোরো না কিন্তু। যা বলছি তা চুপ করে শুনবে। তারপর ঘরে গিয়ে ব্যাপারটা ভাববে।
ঠিক আছে। বলো।
বড় বউমা শচীনের সঙ্গে বড্ড বেশি মাখামাখি করছে।
হেমকান্ত হতভম্ব হয়ে যান। তারপর বলেন, কী করছে?
আঃ এত জোরে নয়। বলেছি না চুপ করে শুনবে।
হেমকান্ত রঙ্গময়ির মুখের দিকে পলকহীন চেয়ে থেকে বললেন, আমি যে কথাটা ভাল বুঝতেই পারছি না।
এখন বুঝবেও না। ঘরে গিয়ে ভাবো একটু। আর বড় বউমার ওপর একটু নজর রাখো। দাসীর কথা বাসি হলে মিষ্টি হয়।
বজ্রাহত হেমকান্ত ঘরে ফিরে এলেন। এরকম সুন্দর একটি সকালের যে এমন পরিণতি হবে তা তিনি আশা করেননি। ঘরে বসে অনেকক্ষণ রঙ্গময়ির কথাটা ভাবলেন। ভেবে মাথামুন্ডু কিছু বুঝতে পারলেন না। ইঙ্গিতটা অবশ্য স্পষ্ট ও প্রাঞ্জল। কিন্তু সেই ইঙ্গিত তার মন গ্রহণ বা অনুবাদ করতে চাইছিল না।
খাওয়ার সময় চপলা সামনে ছিল আজ। বারবার তার মুখের দিকে চেয়ে দেখলেন হেমকান্ত। মানুষ, বিশেষ করে মেয়েমানুষ সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা এত কম যে, মুখ দেখে কিছু অনুমান করা খুবই কঠিন।
চপলা বলল, বাবা, আজ কিছুই খাচ্ছেন না।
খিদে নেই।
শরীরটা কি খারাপ?
না মা, এই বয়সে একটু কম খাওয়াই ভাল।
আপনার বয়স তো তেমন কিছু নয় বাবা। আমার বাবারও তো একই বয়স। বাবা এখনও যা খেতে পারেন!
ওঁর কথা আলাদা। উনি শিকারি মানুষ। মজবুত স্বাস্থ্য।
তা অবশ্য ঠিক।
ছেলের বউ শ্বশুরের সঙ্গে এত কথা বলে এটা সুনয়নীর পছন্দ ছিল না। কিন্তু সুনয়নী নেই। তাই পরদা সরে গেছে। হেমকান্ত আজ চপলার সঙ্গে কথা বলতে কেমন যেন বিব্রত হচ্ছেন বারবার। মনে হচ্ছে, স্ত্রীর মতো কেউ একজন থাকা দরকার ছিল। স্ত্রী অনেক কিছু সামাল দেয়।
হেমকান্ত হঠাৎ বললেন, বিশাখাকে দেখছি না!
সে তো নিজের ঘরে।
ভাল আছে তো?
আছে। ডাকব?
না। দরকার কী? হয়তো কাজ-টাজ কিছু করছে।
চপলা আর-কিছু বলল না এ প্রসঙ্গে। পরিবেশন করতে করতে বলল, সেদিন আপনি এসরাজ বাজালেন না বাবা, আপনার এসরাজ আর শোনাই হল না।
ও আমি ভুলে গেছি।
এসব কি মানুষ ভোলে! আমাদের খুব ইচ্ছে একদিন শুনি।
আচ্ছা, দেখা যাবে।
একদিন জলসা বসাব বাবা?
জলসা! না, তার দরকার নেই।–হেমকান্ত আবার এই প্রগৰ্ভতার সামনে অস্বস্তি বোধ করতে থাকেন।
আপনি এসরাজ বাজাবেন। শচীনবাবু গান গাইবেন। বেশ জমবে।
০৪৬. ভিড়ের ভিতর দাঁড়িয়ে
ভিড়ের ভিতর দাঁড়িয়ে একটু আড়াল থেকে রাজা কয়েক পলক কৃষ্ণকান্তকে দেখল। লোকটাকে কি সে ঘেন্না করে? না পছন্দ করে? তাও না। লোকটার ওপর কি তার রাগ আছে? থাকারই কথা। কিন্তু বাস্তবিক কোনও রাগও রাজা অনুভব করে না। সে খুব ভাল করে জানে, কৃষ্ণকান্তের চারপাশে যে দেশ কাল পরিস্থিতি তা তার কাছে একটা দাবার ছক এবং তারা সবাই খুঁটি মাত্র। ওই অতিশয় সুপুরুষ, কান্তিমান মানুষটির আর সব কিছুই আছে, কিন্তু হৃদয়বত্তা নেই। মানুষকে তিনি ব্যবহার করে নিজের প্রয়োজনে। ওঁর জীবনটাই কিছু উদ্দেশ্য সাধনের সমন্বয় মাত্র। আর কিছু নয়।
শুধু একটা মাত্র জায়গায় তাঁকে দ্রব হতে দেখা গেছে। সে ওই রেমি। রেমির জন্য তিনি অনেক কিছু করেছেন। এমনকী তার নিঃসঙ্গতায় রাজাকে লেলিয়ে দেওয়ার মতো নীতিবোধহীন যড়যন্ত্রেও
তার অরুচি হয়নি।
ব্যাপারটা বুঝতে রাজার একটু সময় লেগেছিল। ধ্রুব বা কুট্টিদা বাড়ি-ছাড়া। রেমি অর্থাৎ কুট্টিবউদি একা। সুতরাং তাকে সঙ্গ দিতে গিয়ে রাজা একটা সূক্ষ্ম তন্তুর মায়াজালে জড়িয়ে পড়েছিল।
সেই প্রথম দিন রেমি তেমন স্বচ্ছন্দ ছিল না। বার বার উচাটন হয়ে ধ্রুবর খোঁজ করছিল। বলছিল, আমাকে ওর অফিসে একবার নিয়ে চলল।
কিন্তু তা সম্ভব ছিল না। ব কতটা বিপজ্জনক সে ধারণা বোধহয় কচি মেয়েটার নেই। কিন্তু তারা, অর্থাৎ ধ্রুবর আত্মীয়-পরিজন ও বন্ধুরা জানে অস্থিরচিত্ত ধ্রুবর পক্ষে সব রকম কাজই সম্ভব। রেগে গেলে খুব স্থির বুদ্ধিতে মানুষকে খুন করা তার কাছে কিছুই নয়। তার বন্ধুদের মধ্যে লোজ্জা, বদমাশ, গুন্ডা, মস্তানদেরও অভাব নেই। বরং তাদের সংখ্যাই বেশি। এক দুর্বোধ্য কারণে এইসব বদখত লোকেরা ধ্রুবর জন্য জান কবুল করতে পারে। উপরন্তু ধ্রুব যখন খুশি যার-তার সঙ্গে যেমনতেমন ব্যবহার করতে অভ্যস্ত। এক দূরসম্পর্কে কাকা আসতেন তাদের বাড়িতে। প্রীতিনাথ। ওরকম মানুষ বড় একটা দেখা যায় না। ব্রিটিশ আমলের সন্ত্রাসবাদী। জেল তো খেটেছেনই, অত্যাচার নিপীড়নও বড় কম সহ্য করেননি। শোনা যায়, তাঁর সহ্যশক্তি ছিল প্রায় অবিশ্বাস্য। প্রীতিনাথ কার্যত ছিলেন ধুবর গুরু। তাকে যত শ্রদ্ধা করত ধ্রুব এমনটা আর কাউকে করত না। নির্লোভ, উদাসীন, পরোপকারী ও ব্যক্তিত্বশালী এই মানুষটি বেঁচে থাকলে আজ কৃষ্ণকান্তের চেয়ে অনেক বড় নেতা হতে পারতেন। ধ্রুব তার এমনই ভক্ত হয়ে পড়ে যে, একসময়ে প্রীতিনাথের খপুরের আস্তানাতেই সে মাসের মধ্যে বিশ-পঁচিশ দিন পড়ে থাকত। প্রীতিনাথ রাজনীতি করতেন, ধ্রুব তার সঙ্গে ছায়ার মতো ঘুরত। কৃষ্ণকান্তর চেয়ে বয়সে অনেক ছোট ছিলেন প্রীতিনাথ। তার একটা দোষ ছিল, শরীর সম্পর্কে অবহেলা। একবার গ্রামের রাস্তায় বর্ষাকালে পড়ে গিয়ে তার পা মচকায়। সেই মচকানো পায়ের ব্যথায় শয্যা নিলেন। অনেক ডাক্তার দেখল, কিছু করতে পারল না। অবশেষে প্রীতিনাথের ভক্তরা কলকাতা থেকে এক বড় ডাক্তারকে ধরে নিয়ে গেল। তিনি দেখেশুনে গাদাগুচ্ছের অত্যন্ত কড়া জাতের ব্যথার ওষুধ খাওয়ালেন। এমনিতেই ব্যথাহরা বড়ি খেতে গেলে কিছু বেছেগুছে এবং ভালরকম প্রতিষেধক নিয়ে খাওয়া উচিত, তার ওপর অতগুলো বড়ি। প্রীতিনাথ অম্লানবদনে খেয়ে গেলেন। একশো পঁচিশটা বড়ির একটা কোর্স শেষ হওয়ার পর পায়েব ব্যথা কমে গেল। কিন্তু তখন পেটে একটা চিনচিনে ব্যথা শুরু হয়েছে। কলকাতায় এসে সেই ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করলেন প্রীতিনাথ। ডাক্তার পেটের ব্যথা শুনে অভয় দিয়ে এক শিশি অ্যান্টাসিড খেতে বলে দিল। কিন্তু তাতে কাজ হল না। বড় দেরি হয়ে গেছে তখন। পেটের রহস্যময় সেই ব্যথাটা বাড়তে লাগল ক্রমে ক্রমে। অসহ্য হয়ে উঠল। পাক্কা দুবছর প্রীতিনাথ অমানুষিক যন্ত্রণা ভোগ করলেন। অসুখ ধরা পড়ল একেবারে শেষ অবস্থায়। ক্যানসার। সেই ব্যথার সময় ধ্রুব প্রায় একটানা তার কাছে থেকেছিল। কিন্তু তাঁর মুখ-চোখে কোনও বিষণ্ণতা বা উদ্বেগের কোনও ভাব দেখেনি বাজা। ধ্রুবর চোখদুটো নিবিষ্টভাবে লক্ষ করত প্রীতিনাথকে। একবার সে মৃত্যুপথযাত্রী প্রীতিনাথকে বলে বসল, আপনার ওপর আমার আর শ্রদ্ধা নেই। আমি ভাবতাম আপনি পৃথিবীর সব ব্যথা সহ্য করতে পারেন। কিন্তু এখন বুঝেছি, আপনি আমাদের মতোই সাধারণ।
