লজ্জার কী?
তুমি কী ভাববে।
সেই এইটুকু বয়স থেকে যা ভেবে আসছি তা কি আর পালটায়?
শোনো, তোমাদের এ বাড়িতে রেখে দেওয়ার একটা ব্যবস্থা বোধহয় হয়ে যাবে। আমি তোমার বাবাকে বলেছি কৃষ্ণকান্তকে সংস্কৃত পড়াতে।
রঙ্গময়ি চোখ কপালে তুলে বলে, কবে বললে?
আজই। একটু আগে।
সর্বনাশ। বাবা কি সংস্কৃত জানে নাকি?
জানে না? একটু-আধটু নয়?
রঙ্গময়ি হেসে ফেলে বলে, সে যা জানে তা না জানার মতোই। তুমিও একটা পাগল। বলার আগে আমার সঙ্গে পরামর্শ করে নাওনি কেন?
হয়তো করা উচিত ছিল। কিন্তু ভাবলাম তোমাদের নিয়েই যখন সমস্যা তখন তুমি হয়তো এ ব্যাপারে কিছু বলতে চাইবে না। লজ্জা পাবে। তোমার আত্মসম্মানবোধও তো সাংঘাতিক।
রঙ্গময়ি স্নিগ্ধ চোখে হেমকান্তর দিকে চেয়ে স্মিতমুখে বলে, আত্মসম্মানজ্ঞান? ও কথা বোলা। সব ভাসিয়ে দিয়েছি জলে। নিজের মধ্যেই তো আমি নিজে থাকি না। সব সময়ে শুধু ভাবি আর তো কেউ তোমাকে বোঝে না। আমি চলে গেলে তোমার কী হবে!
হেমকান্ত কয়েকবার গলা খাঁকারি দিলেন। ব্রহ্মপুত্রের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, কাজটা কি তা হলে ঠিক হয়নি?
কৃষ্ণকে সংস্কৃত পড়ানোর কাজটা তো? না, ঠিক হয়নি।
তা হলে কী হবে?
বাবা সংস্কৃতের চর্চা কোনওকালেই তেমন করেননি। দাদা তো আরও অগামার্কা। কৃষ্ণ মাথাওয়ালা ছেলে, ওকে পড়ানো কি যার-তার কাজ?
তা হলে একটা উপায় তো কিছু করতে হবে।
সেজন্য তুমি ভেবো না। ওকে আমিই পড়াতে পারব।
তুমি সংস্কৃত জানো?
টোলে চতুম্পাঠীতে শিখিনি। তবে হাতে কাজ নেই বলে বসে বসে উপক্রমণিকা নাড়াচাড়া করতাম। তারপর একটু-একটু করে খানিকটা শিখেছি। নিজে নিজেই।
বলো কী?–হেমকান্তর গলায় সত্যিকারের বিস্ময়।
এমন কিছু হাতিঘোড়া কাজ নয়। তোমার তো মনে নেই, কৃষ্ণকে আমি প্রথম থেকেই অ আ ক খ শেখাতাম। এখনও ওর সব বইপত্র আমি নাড়াচাড়া করি। একটু-একটু বুঝিও। ওকে পড়ানো শক্ত হবে না।
তোমার বাবাকে তা হলে কী বলব?
তোমাকে কিছু বলতে হবে না। আমিই বলব।
বাঁচালে।
রঙ্গময়ি একটু হাসল। তার চোখে-মুখে এক আশ্চর্য দীপ্তি দেখা যাচ্ছে। এমনটি আর কখনও দেখেননি হেমকান্ত। মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইলেন। রঙ্গময়ি চোখ নামিয়ে নিল। মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল, কেমন আছ নাতি-নাতনি নিয়ে?
ভালই তো। শুধু তোমার অভাব।
সব কি একসঙ্গে পাওয়া যায়?
বউমার সঙ্গে কি তোমার ভাব নেই, মনু? তা হলে যাও না কেন?
ভাব আছে। আর সেটাকে রাখতে চাই বলেই যাই না।
সে তোমার যা বিবেচনা। তবে আজকাল বউমা সবসময়ে তো বাড়িতে থাকে না। বেড়াতেটেড়াতে যায় বোধহয়। তখন ফাঁকমতো যেয়ো।
রঙ্গময়ি একথায় একটু গম্ভীর হল। বলল, চোরের মতো যাব কেন?
হেমকান্ত রহস্য করে বললেন, কিন্তু তুমি তো চোরই। বরাবর পরের ধনে তোমার পোদ্দারি।
সেটা আবার কী? কার ধনে?–বলে রঙ্গময়িও হেসে ফেলে।
ঠিক বলিনি?
রঙ্গময়ি মাথা নেড়ে বলে না, ঠিক বলোনি। তুমি কখনও পরের ধন ছিলে না।
তাই নাকি?
তা ছাড়া আবার কী? সুনয়নী তোমাকে স্বামী হিসেবে পেয়েছিল সে তার ভাগ্য। আমি তো সেভাবে পাইনি। কিন্তু পাই বা না-পাই, জিনিসটা যে আমার তা আমি মনে মনে জানি।
হেমকান্ত ভেবেছিলেন, তিনি এই পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে যথেষ্ট বুড়ো হয়ে পড়েছেন। কিন্তু লজ্জারক্তিম মুখশ্রী, ফুরিতাধর এবং নতচক্ষু নিয়ে অকপট গভীর গলায় রঙ্গময়ি যা উচ্চারণ করল তা শুনে তার ভিতরে যৌবনোচিত এক শক্তি জেগে উঠল যেন। তিনি ইচ্ছে করলে এখন সেই যুবা বয়সের মতোই এক সাঁতারে ব্রহ্মপুত্র এপার ওপার করতে পারেন, হাজারবার মুগুর ঘোরাতে পারেন, মাইলের পর মাইল নৌকো বেয়ে চলে যেতে পারেন।
হালকা শরীর ও ফুরফুরে মন নিয়ে হেমকান্ত উঠলেন। বললেন, ঠাকুরদালানকে অনেকক্ষণ অপবিত্র করেছি। আমি অভক্ত মানুষ।
রঙ্গময়ি মৃদুস্বরে বলল, তার চেয়েও বড় কথা, এতক্ষণ ধরে অনেক জোড়া চোখ আড়াল-আবডাল থেকে উঁকিঝুঁকি দিয়ে তোমাকে আর আমাকে দেখেছে। এসো গিয়ে এখন। ভয় পেয়ো না, আমাকে মেরে না তাড়ালে আমি এ বাড়ি ছেড়ে যাব না।
হেমকান্ত একটা স্বস্তির বড় শ্বাস ছাড়লেন।
যখন নামছেন তখন রঙ্গময়িও কয়েক ধাপ সিঁড়ি সঙ্গে নামল। হঠাৎ মৃদুস্বরে বলল, একটা কথা।
বলো।
বড় বউমার ওপর একটু নজর রেখো।
তার মানে?
সব কথার কি মানে হয়?
হেমকান্ত ভ্রুকুটি করে বললেন, তুমি কোনও কথাই খামোকা বলো না। নজর রাখার প্রয়োজন কী? চপলা কি ছেলেমানুষ?
ছেলেমানুষ ছাড়া আর কী? কতই বা বয়স?
কীভাবে নজর রাখা সম্ভব? আর ও কীই-বা করছে?
রঙ্গময়ি চুপচাপ একটু দাঁড়িয়ে রইল। ভাবল। তারপর বলল, আচ্ছা, সেটা পরে বলা যাবে। সুযোগমতো।
রহস্য রাখছ? জানো তো, এসব ইঙ্গিতপূর্ণ কথা শোনার পর আমি কীরকম উদ্বেগে থাকব!
জানি। তাই কথাটা বলেই মনে হল ভুল করলাম।
আসল কথাটা কী?
তুমি বরং ওকে তাড়াতাড়ি কলকাতায় পাঠানোর ব্যবস্থা করে দাও।
আমি ব্যবস্থা করলে কী হবে? বউমা নিজেই তো যেতে চাইছে না বলে শুনেছি।
ঠিকই শুনেছ। আর সেজন্য কনকের সঙ্গে বউমার কিছু কথা কাটাকাটিও হয়। সে খবর রাখো!
আমি কোনও খবরই রাখি না, মনু। কেউ আমাকে কিছু বলে না। ওদের কথা কাটাকাটি হল কেন?
কনকের ইচ্ছে ছিল না চপলাকে রেখে যেতে।
তবে গেল কেন?
সেইটেই তো কারণ। চপলা যায়নি। এদিকে বিশাখার সঙ্গেও চপলার বনিবনা হচ্ছে না। তুমি বোধহয় সে খবরও রাখো না।
