বিনোদচন্দ্র কাঁচুমাচু মুখ করে মেঝের দিকে চেয়ে রইলেন।
হেমকান্ত বললেন, সংস্কৃতজ্ঞান আপনার কুলকর্মের পক্ষেই একান্ত দরকার। সেটাও যদি না থাকে তবে কী করে কাজ হবে বলুন তো! শুধু একটু নিত্যপূজা আর পঞ্জিকা দেখে শুভকর্মের দিন স্থির করা এইতেই কি সব হয়?
আজ্ঞে, আমি তো কোষ্ঠীও করে থাকি।
হেমকান্ত ভ্রুকুটি করে বললেন, তবে তো হয়েই গেল। কোষ্ঠী করা কি একটা সাংঘাতিক কাজ নাকি?
বিনোদচন্দ্র ফের হাত কচলাতে থাকেন।
হেমকান্ত যথার্থ রূঢ় হতে পারেন না। তার স্বভাবেই সেটা নেই। তাই একটু পরেই গলা নরম করে বললেন, সে যাই হোক। কৃষ্ণকান্তকে আমি একটু সংস্কৃত শেখাতে চাই। ছেলেটি মেধাবী বলেই মনে হয়। আপনি কি কাজটা পারবেন?
আজ্ঞে, খুব পারব।
ভেবেচিন্তে বলুন।
পারব।
লোভের বশবর্তী হলে মানুষ অনেকরকম সম্ভব-অসম্ভব চিন্তা করে, পারগতার কথা ভাবে না। হেমকান্ত তা জানেন বলেই বিনোদচন্দ্রের মুখের দিকে কিছুক্ষণ চিন্তিত ভাবে চেয়ে রইলেন। তারপর বললেন, শিক্ষা যেটুকু দিতে পারেন সেটুকুই দেবেন। কিন্তু ভুল শেখাবেন না। এই বয়সে কোনও শিক্ষার মধ্যে ভুল থেকে গেলে তা আর পরে বড় একটা শোধরায় না।
আজ্ঞে, আমি খুব যত্ন করে শেখাব।
হেমকান্ত মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বললেন, যদি ওর শিক্ষার ভার আপনাকে দেওয়া হয় তা হলে আপাতত আপনারা এ বাড়িতেই থাকবেন।
বিনোদচন্দ্রের বিমর্ষ মুখ কিছু উজ্জ্বল হল। তবে ভয়টা একেবারে কাটল না। খুব চিন্তিত গলায় বললেন, আমার আর দিন বেশি বাকি নেই। যে কটা দিন আছি এ বাড়িতেই যদি থাকতে দেন।
হেমকান্ত মাথা নেড়ে বললেন, সেরকম কথা দিতে পারি না। এস্টেটের অবস্থা ভাল নয়। আদায়-উসুল সামান্য। খাজনা বাকি পড়ছে। যুগও পালটাচ্ছে। এখন ছেলেদের সিদ্ধান্তও ভেবে দেখতে হবে। তাই সব অবস্থার জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখুন। সেটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
যে আজ্ঞে।
কটা দিন বইপত্র নাড়াচাড়া করে নিন। চর্চার অভাবে অনেক কিছুই ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক। বইটই যদি কিছু লাগে তবে কাছারিতে বলে দেবেন, ওরা আনিয়ে দেবো।
বিনোদচন্দ্র বিদায় নিলে হেমকান্ত ভাবতে লাগলেন, কাজটা ঠিক হল কি না। মনুর প্রতি তার দুর্বলতার কথা বোধহয় সর্বজনবিদিত। সেক্ষেত্রে যে কাজটা তিনি করলেন তা যে মনুকে কাছে রাখার জন্যই এটা সবাই টের পেয়ে যাবে। কিন্তু তিনি আর কীই-বা করতে পারতেন!
উঠে আস্তে আস্তে কাছারি পেরিয়ে ঠাকুরদালানের দিকে এগিয়ে গেলেন হেমকান্ত। আজকাল কেন যেন তার কিছুই তেমন ভাল লাগে না। কেন লাগে না তা টের পান মাঝে মাঝে। চমকে ওঠেন। বড় বউমা আসার পর মনু আর অনায়াসে তার কাছে আসতে পারে না। আর মনুর সঙ্গে দেখা হয় না বলেই ক্রমে ক্রমে দিনক্ষয় তার কাছে আলুনি লাগে।
ঠাকুরদালানের দিকে বহুকাল আসেননি। দূর থেকে শাখ, ঘণ্টা, কাঁসর শোনেন। তবে নিজে আসেন না। ঠাকুর-দেবতার প্রতি তেমন কোনও আকর্ষণ নেই তার। তিনি অবশ্য নাস্তিকও নন। তাকে নির্বিকার বলা যায়।
সিঁড়ির নীচে দাঁড়িয়ে তিনি চমৎকার একটা গন্ধ পেলেন। নানারকম ফুল, বেলপাতা, আম্রপল্লব, চন্দন, ধুনোর বহুদিনকার সঞ্চিত গন্ধ। মনটাকে ভিজিয়ে দেয়। সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠলেন। মন্দিরটার কিছু সংস্কার প্রয়োজন। শ্বেতপাথরে বাঁধানো মেঝের পাথরগুলোর জোড় খুলে এসেছে। থামে ফাটল। পলেস্তারা খসেছে। তবু বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। মন্দিরে মার্জনার কাজটুকু মনু করে, তিনি জানেন।
হেমকান্ত অনুচ্চ স্বরে ডাকলেন, মনু! মনু আছো নাকি?
রঙ্গময়ি মন্দিরের ঘর থেকে বেরিয়ে এল। পরনে পাটের লালপেড়ে শাড়ি, কপালে তেলসিদুরের ফেঁটা, চোখে বিস্ময়।
তুমি!
তোমার খোঁজে এলাম। আজকাল তো দেখা দাও না।
রঙ্গময়ি মৃদু একটু হাসল, তবু ভাল। দেখা চাও তা হলে!
হেমকান্তর রসিকতাবোধ লুপ্ত হয়েছে। মন বড় অস্থির। আবেগ-কম্পিত। হঠাৎ বললেন, আমরা কে কতদিন বেঁচে থাকব, মনু?
তার মানে? আবার ওসব কথা কেন?
আমাদের আয়ু যে ফুরিয়ে আসছে। তোমার আমার।
বালাই ষাট। আয়ু ফুরোবে কেন! কোন দুঃখে?
ঠাট্টা কোরো না। আমার মন ভাল নেই।
রঙ্গময়ি একটা আসন বের করে পেতে দিল বারান্দায়। বলল, বোসো।
হেমকান্ত বসলেন। বললেন, আমার মন বড় অস্থির, মনু।
কেন অস্থির?
মনে হচ্ছে তোমাকে ছাড়া আমার পক্ষে বেঁচে থাকা অসম্ভব।
রঙ্গময়ি হেমকান্তর ঈষৎ স্খলিত ও সামান্য কম্পিত কণ্ঠস্বর লক্ষ করে। এতটা আবেগ হেমকান্তর মধ্যে সে কখনও দেখেনি। ঠান্ডা মেঝের ওপর হেমকান্তর মুখোমুখি বসে সে মেঝেতে আঙুলের দাগ দিতে লাগল। তারপর মৃদুস্বরে বলল, এটা তুমি এতদিনে বুঝলে? আমি তো জানিই, আমি চলে গেলে তুমি টিকতে পারবে না এখানে। তাই এত অপমান সয়েও পড়ে আছি। শুধু তোমার জন্যে।
কে তোমাকে অপমান করে, মনু?
কে না করে বলো! তাদের নাম শুনলে কী করবে? মাথা কাটবে?
না। কিন্তু তোমাকে অপমান করে কেন?
করে সেটা নিয়ম বলেই। বামুনঘরের আইবুড়ো মেয়ে। তার ওপর অনেক রটনাও তো আছে।
তোমার অনেক কষ্ট, না মনু?
অনেক। কিন্তু সেগুলোর ভাগ নিতে যেয়ো না। সইতে পারবে না।
কষ্টের ভাগ নিতে কে চায় বলো! কিন্তু তোমার জন্য আমার মন খারাপ লাগে।
সেটুকুই আমার যা কিছু ভরসা। বোঝো না?
হেমকান্ত খানিকক্ষণ ঝুম হয়ে বসে রইলেন। গ্রীষ্মের বেলা বাড়ছে। রোদের তাপে তেতে উঠছে মেঝে। হেমকান্ত ঘামছেন। কিন্তু এসব তেমন খেয়াল করছেন না। অনেকক্ষণ বাদে বললেন, তোমাকে আজ স্পষ্ট করে কথাটা বললাম। বলে একটু লজ্জাও করছে।
