কৃষ্ণকান্ত সকলের দিকে চেয়ে বললেন, আর কারও এরকম কেউ আছে? তান্ত্রিক, যোগী, হোমিয়োপ্যাথ যে কেউ।
চারদিকে একটা গুঞ্জন শুরু হল।
দুলাল, কৃষ্ণকান্তর এক নাস্তিক ভাইপো বলল, ওসবে কিছু হবে না কাকা। যা ডাক্তাররা করছে করুক।
কৃষ্ণকান্ত তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে একটু চেয়ে থেকে মৃদু কঠিন সুরে বললেন, সব বুঝে গেছিস দেখছি।
দুলাল একটু লজ্জা পেয়ে সরে গেল।
জীবন, কৃষ্ণকান্তর এস্টেটের প্রাক্তন নায়েবের ছেলে, বলল, যদি বলেন তো ডাক্তার গাঙ্গুলিকে নিয়ে আসি।
ডাক্তার গাঙ্গুলি কে?
মস্ত হোমিয়োপ্যাথ। এম আর সি পি, এফ আর সি এস।
হোমিয়োপ্যাথি করে কেন?
ওরকম অনেক অ্যালোপ্যাথই করে! তবে এঁকে আপনি চেনেন। অনুশীলন সমিতিতে ছিল। ব্রিটিশ আমলে সরকার সব ডিগ্রি কেড়ে নেয়।
কৃষ্ণকান্ত সোজা হয়ে বসে বলেন, খগেনের কথা বলছিস নাকি!
হ্যাঁ। সে-ই।
দূর! ও ডাক্তারির কী জানে? ধর্ম ছেড়ে একবার খ্রিস্টান হয়েছিল মনে নেই?
সেটা দায়ে পড়ে।
ওসব জানি।
ডাক্তার কিন্তু খুব ভাল।
কৃষ্ণকান্ত এক সেকেন্ড চিন্তা করে বললেন, তা হলে যা। ট্যাকসি পেলে ভাল, না হলে কারও গাড়ি নিয়ে যা।
একজন অবাঙালি ব্যবসায়ি কৃষ্ণকান্তকে খুশি রাখতে এত রাতেও হাজির ছিলেন। তিনি বললেন, আমার গাড়ি আছে। চলুন, ড্রাইভারকে বলে দিচ্ছি।
কৃষ্ণকান্ত দৃকপাতও করলেন না। জীবন সেই ভদ্রলোকের সঙ্গে বেরিয়ে গেল।
কৃষ্ণকান্ত চোখ বুজলেন। তারপর টান শরীরটা শ্লথ করে আবার হেলান দিয়ে বসলেন। সকলেই এসেছে, সকলেই আসবে। কিন্তু এত মানুষের সদিচ্ছাও তার বউমাকে বাঁচাতে পারবে কি?
বউমাটির জন্য কৃষ্ণকান্তর বুকের মধ্যে ক্রমশ ঘন হয়ে উঠছে ব্যথা। বড় ব্যথা। এই ব্যথাই একদা। তার মৃত্যুর কারণ হবে। হোক। আজ যদি কৃষ্ণকান্ত তার নিজেব জীবনের বিনিময়ে রেমির জীবন ফিরিয়ে দিতে পারতেন তো তাই দিতেন।
জীবনে এত স্নেহ তার কাছ থেকে কেউ কখনও পায়নি। অথচ রেমি ছেড়ে যাচ্ছে তাঁকে।
কৃষ্ণকান্ত চোখ খুলে জিজ্ঞেস করলেন, রাজা এসেছে?
কয়েকজন সমস্বরে জবাব দিল, এসেছে।
একটা বিদ্যুৎ স্পর্শ করে গেল কৃষ্ণকান্তকে।
বহুকাল আগে, ধ্রুব যখন ফেরার, রেমি যখন বিবাহ বিচ্ছেদের কথা ভাবছে, তখন এই রাজাকে তিনি ডেকে পাঠিয়েছিলেন নিজের চেম্বারে। খুব বিশ্বাসযোগ্য ছেলে। নির্ভর করা যায়।
বললেন, কদিনের জন্য আমি দিল্লি যাব, তুই কটা দিন বউমাকে একটু দেখাশোনা করবি?
আমি!–রাজা অবাক হয়ে বলল, আমি কেন?
তুই না কেন?
বউদির সঙ্গে আমার তো তেমন—
তার দরকার নেই। তুই-ই দেখবি।
রাজা দ্বিধা করে বলল, আচ্ছা, খোঁজ নেব।
খোঁজ নয়। গিভ হার রেগুলার কমপ্যানি।
আচ্ছা।
শোন গাড়ল, যেমন-তেমন কমপ্যানি নয়। ধ্রুবটা যা করেছে তা কহতব্য নয়। বউমা ডিভোর্সের কথা ভাবছে। আই ওয়ান্ট হার মোন্ডেড। তার জন্য যতদূর যা করতে হয় করবি।
আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
ঠিক আছে। বুঝিয়ে দিচ্ছি।
কৃষ্ণকান্ত সেদিন রাজাকে গোটা প্ল্যানটাই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।
০৪৫. কয়েকদিন যাবৎ অনেক ভাবলেন হেমকান্ত
কয়েকদিন যাবৎ অনেক ভাবলেন হেমকান্ত। অবস্থা গতিকে যা দাঁড়িয়েছে তাতে বিনোদচন্দ্রকে কিছুতেই আর চক্ষুলজ্জা বজায় রেখে এ বাড়িতে অধিষ্ঠান করতে দেওয়া যায় না। অথচ মনু চলে যাবে, একথা ভাবতেও পারেন না হেমকান্ত। মনু তো একটা মেয়েই মাত্র নয়, সে তার অস্তিত্বেরই একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ।
হেমকান্ত দাপট দেখাতে জানেন না। কৌশল বা কূটবুদ্ধিও তার নেই। তবু মাথা খাটিয়ে অনেক ফন্দি-ফিকির বের করার চেষ্টা করলেন। বলা বাহুল্য, কোনওটাই তেমন গ্রহণযোগ্য মনে হল না।
এর মধ্যেই একদিন কনককান্তি কলকাতায় রওনা হয়ে গেল। তবে বউ আর ছেলেমেয়েকে রেখে গেল কিছুদিনের জন্য। এখনও বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ। চপলারও তেমন যাওয়ার ইচ্ছে নয়। ঠিক হল, পরে কেউ গিয়ে ওদের কলকাতায় পৌঁছে দেবে।
কনককান্তি চলে যাওয়ায় একটু হাঁফ ছাড়লেন হেমকান্ত। ছেলেদের সঙ্গে তাঁর একটা অপরিচয়ের ব্যবধান আছে। তার ওপর ওদের সামনে তিনি নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কথা তেমন জোরের সঙ্গে প্রকাশ করতে পারেন না। কেমন যেন মিইয়ে যান, প্রতিরোধহীন হয়ে পড়েন। এটাই হয়তো ব্যক্তিত্বহীনতা। তাই কনককান্তি চলে যাওয়ায় তার মনের ওপর থেকে একটা চাপ সরে গেল। মাথায় সম্ভব-অসম্ভব বুদ্ধিও খেলতে লাগল অজস্র।
একদিন সকালে তিনি বিনোদচন্দ্রকে ডেকে পাঠালেন বৈঠকখানায়। বিনোদচন্দ্র ভারী ভীত ও বিষণ্ণ মুখে এসে দাঁড়ালেন। উচ্ছেদের ভয় মানুষের এক মস্ত শত্রু। বিনোদচন্দ্র হাত কচলাচ্ছেন। ব্রাহ্মণোচিত তেজবীর্য তার কোনওদিনই ছিল না। আজ বিরূপ পরিস্থিতিতে মেরুদণ্ড আরও নুয়ে গেছে।
হেমকান্ত আড়চোখে বিনোদচন্দ্রের অবস্থাটা লক্ষ করে বললেন, আপনি সংস্কৃত কীরকম জানেন ঠাকুরমশাই?
কিছু কিছু জানি।
কিছু মানে কতটা?
কাব্য পাশ করেছি।
সে তো বহু কাল আগে। চর্চা কি আছে?
আছে একটু-আধটু।
যদি একটা চতুষ্পঠী খুলি তা হলে পড়াতে পারবেন?
পারব।
এমনিতে পারবেন না। একটু ঝালিয়ে নিতে হবে।
আজ্ঞে, তাও নেব।
আপনার শরীর কেমন?
বড় দুর্বল লাগে। মাথাটা ঘোরেও মাঝে মাঝে।
তা হলে কী করে পারবেন? লক্ষ্মীকান্ত কি সংস্কৃত জানে?
সামান্য জানে।
তা হলে সেও পারবে না।
যদি চেষ্টা করে তা হলে পারবে।
হেমকান্ত একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, আপনাদের বৃত্তিই তো পৌরোহিত্য। তার ওপর মন্ত্র-টন্ত্রও দেন। আপনারা সংস্কৃত চর্চা করেন না কেন?
