একা?
একা কেন? ও বাড়িতে এখন গিজগিজ করছে লোক।
তুমি তো যাবে না।
আমি সঙ্গে না গেলেই কি তুমি একা?
তা বটে।
রঙ্গময়ি মৃদু শব্দে হেসে ফেলে। বলে, লোকে হয়তো কিছু বলবে। আমার না যাওয়াই ভাল।
সহিস নেমে এসে দরজাটা খুলে ধরে আছে। হেমকান্ত ধীরে ধীরে নামলেন।
কোকাবাবুদের বাড়িটা প্রকাণ্ড। সামনে মস্ত ফটক, নহবতখানা। ভিতরে বাগান। তারপর পুরনো আমলের দুই মহলা বাড়ি। ফটক আজ হাঁ হাঁ করছে খোলা। ভিতরে অনেক গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ভিতরে গাড়ি ঢোকাতে আগে থেকে সহিসকে বারণ করে রেখেছিলেন হেমকান্ত। কিন্তু এখন গাড়ি থেকে নেমে তার দ্বিধা এবং জড়তা দেখা দিল।
গাড়ির জানালা দিয়ে নির্নিমেষ চোখে দৃশ্যটা দেখতে থাকে রঙ্গময়ি। ফটক দিয়ে হেমকান্ত ভিতরে ঢুকছে। এক হাতে কোঁচাটি ধরা। ঢুকবার আগে বার দুই ফিরে তাকালেন। হাতে ছড়িটা অনির্দিষ্টভাবে কয়েকবার আস্ফালন করলেন। গলা খাঁকারি দিলেন। যদিও কারুকাজ করা শালে দিব্যকান্তি হেমকান্তকে খুবই অভিজাত দেখাচ্ছে, তবু তার ভাবভঙ্গিতে আজ সহজ স্বাভাবিক ভাবটি নেই। বড় বড় গাছপালায় ভরা বাগানটার মধ্যে মিলিয়ে গেলেন হেমকান্ত।
রঙ্গময়ি তবু যাত্রাপথের দিকে চেয়ে রইল। চোখে কোনও দৃষ্টি নেই। চোখ স্মৃতিভারাক্রান্ত। বহুদিন আগেকার একটা দৃশ্য দেখছে।
সুনয়নী বাপের বাড়ি যাবে বলে ঘাটে বজরা তৈরি। সাজ শেষ করে সুনয়নী এসেছে বিগ্রহ প্রণাম করতে। অনেকক্ষণ উপুড় হয়ে বিড় বিড় করে কী যেন বলো। তারপর উঠে চরণামৃতের জন্য অভ্যাসবশে হাত বাড়াল। তামার পাত্রটি হাতে দাঁড়িয়ে ছিল রঙ্গময়ি। দিতে গিয়ে কী কারণে কে জানে এক ঝলক পড়ে গেল মেঝেয়।
সুনয়নী উপুড় হয়ে আঁচলে মেঝেটা মুছে নিয়ে বলল, হাত কেঁপে গেল ঠাকুরঝি?
রঙ্গময়ি তটস্থ হয়ে পড়ল। সে জানে তার হাত কঁপেনি। যদি কেঁপে থাকে তবে তা সুনয়নীরই হাত। কিন্তু সে কিছু বলল না।
সুনয়নী উঠে দাঁড়িয়ে রঙ্গময়ির চোখে চোখে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইল একটুক্ষণ। বলতে নেই, সুনয়নী ডাকের সুন্দরী। চোখ দুখানা বড় বড়। অনেকক্ষণ সেই দুখানা বড় বড় চোখে চেয়ে নিঃশেষ করে দেখল সে রঙ্গময়িকে। তারপর একটা শ্বাস ফেলে বলল, তোমার সঙ্গে পারলাম না।
কী পারলে না?
তোমার সঙ্গে কি পারা যায়? রঙ্গময়ি কত রঙ্গই জানে।
রঙ্গময়ি হতবাক, বিব্রত, কুণ্ঠিত। বলল, কী বলছ তুমি?
বেরোবার সময় কর্তাকে বললাম, ওগো যাচ্ছি, ভালমতো থেকো। উনি কী বললেন জানো? বললেন, ও নিয়ে ভেবো না। রঙ্গময়ি তো আছে।
রঙ্গময়ি অপ্রতিভ হয়ে একটু হাসল, এই কথা!
এই কথাটুকু বড় কম নয়। অন্য বউ হলে এই ব্যাঙের গর্ত থেকেই চ্যাং মাছ বের করত। যাই, দুজনে রইলে কিন্তু।
এই রহস্যময় ইঙ্গিত সেই প্রথম নয়। আগেও শুনেছে রঙ্গময়ি। বহুবার, নানা প্রসঙ্গে। গায়ে মাখেনি।
সেদিন মাখল। বড় লজ্জা হল, ঘেন্না এল নিজের ওপর।
সেইদিনই বিকেলবেলা হেমকান্ত একা বসে ছিলেন তার কুঞ্জবনে ভাঙা গাড়িটার পাদানিতে। রঙ্গময়ি হানা দিল সেখানে।
শোনো, তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।
বলো রঙ্গময়ি, বলো। হৃদয়ের অবারিত দ্বার খুলে দাও।
তখন হেমকান্ত ওরকমই ছিলেন। কখনও কখনও তরল আবেগ বেরিয়ে আসত, চটুল ইয়ার্কিও করতেন মাঝে মাঝে।
রঙ্গময়ি ভ্রু কুঁচকে বলল, হঠাৎ এত খুশি-খুশি ভাব কেন? বউ বাপের বাড়ি গেছে, এখন তো তোমার বিরহদশা চলার কথা।
হেমকান্ত মৃদু হেসে বললেন, তা বটে। তবে কী জানো, মাঝে মাঝে একটু বিরহ ভাল। বউ সবসময়ে কাছে থাকলে কেমন একঘেয়ে লাগে।
তা তো বুঝলাম। কিন্তু আমার জীবনটাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করছ কেন তুমি?
আমি!–হেমকান্ত বিস্মিত, ব্যথিত।
তুমি নও তো আর কে? বউঠান আজ বাপের বাড়ি যাওয়ার সময় সেইসব ইশারা ইঙ্গিত করে গেল।
কোন সব?
তোমাকে আমাকে নিয়ে মাঝে মাঝে যা রটে।
সুনয়নী তো সেরকম নোংরা মনের মেয়ে নয়।
আহা গো। তোমার বউকে নোংরা মনের মেয়ে বলেছি নাকি? সে কেমন তা আমি ভালই জানি। সেভাবে সে বলেওনি। একটু রসিকতা করেছে। কিন্তু কথাটা আমার আজ লাগল খুব।
হেমকান্ত বিব্রত মুখ করে বলে, কিন্তু আমি তার কী করব বলো তো? সুনয়নী এলে বরং-~-
কী বুদ্ধি! বউয়ের কাছে বলবে যে রঙ্গময়ি তার নামে নালিশ করেছে? বললে আমার মুখ খুব বাড়বে বুঝি?
তা হলে কী করব?
আমাকে দূর করে দাও। সেটাই ভাল হবে।
তোমাকে দূর করার আমি কে? দূর করবই বা কেন?
লোকে মিথ্যে রটাবে আর আমি তাই মুখ বুজে সয়ে যাব চিরকাল? আমার নামে কেন এত মিথ্যে রটনা হবে বলো তো!
হেমকান্তর মুখ শুকিয়ে গেল ভয়ে। তিনি আমতা আমতা করে বললেন, রাগ কোরো না রঙ্গময়ি। লোকের কথা ধরতে নেই।
রঙ্গময়ির সেদিন বড় জ্বালা করছিল বুক। নলিনীর ঘবে পিসি কনকপ্রভা সেই যে ঠেলে ঢুকিয়ে দিয়েছিল এক রাত্রে তার জের সহজে থামেনি। কিছু কান ও চোখ জেগে ছিল ঠিকই। নলিনী যে তাকে না বলে ডেকেছিল তা কে বিশ্বাস করবে? কেবল যুবকের ঘরে নিশুতিরাতে এক কিশোরীর অভিসারটাই ধরে নিয়েছিল লোকে। পাঁচকান হয়ে সে কথা রাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে গেল। বিনোদচন্দ্র বহু চেষ্টা করেও মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ জোগাড় করতে পারলেন না আর। টাকার জোর থাকলে কলঙ্কের ওপর চুনকাম করা যেত। দুর্ভাগ্যবশে বিনোদচন্দ্রের তাও নেই। নলিনীর মৃত্যুর পর রঙ্গময়িকে আজকাল জড়ানো হয় হেমকান্তর সঙ্গে।
রঙ্গময়ি বলল, লোকের কথা না ধরলে তোমাদের চলে, আমি গরিবের মেয়ে, আমার চলে না। আমি কাল থেকে আর তোমাদের ঘরদোরে যাব না।
