কুট্টিদা অ্যারেস্টেড হলে তোমার শ্বশুরমশাইয়ের বিরুদ্ধে লড়াইটা চালাবে কী করে? তাই–
উঃ, কী যে পাগল না তোমরা! সবাই পাগল। বাপের ওপর ছেলের এত আক্রোশ থাকতে পারে তা আমার কল্পনাতেও ছিল না।
তুমি তো ফ্যামিলির ইতিহাস জানোই বউদি। কী আর বলব! কুট্টিদা পাগল হলেও ন্যাচারাল পাগল নয়। পরিস্থিতির চাপে ডিসব্যালানসড।
ওসব বাজে কথা। বানানো সমস্যা নিয়ে একটা ভড়ং করে যাচ্ছে।
আচ্ছা, প্রসঙ্গটা আজ থাক। তোমাকে একটু আনন্দ দেওয়ার জন্য আজ বের করে এনেছি।
হঠাৎ আমাকে আনন্দ দেওয়ার কথাই বা তোমার মনে হল কেন?
আমরা যে সবসময়ে তোমার কথা বলাবলি করি।
আমার কথা! আমি এমন একটা কে যে আমার কথা ভাবো তোমরা?
আমাদের পুরো বংশ এবং বাড়ি যেখানে যারা আছে সবাই তোমার জন্য খুব উদ্বিগ্ন। আমরা কুট্টিদা আর তার বাবার মধ্যে কনফ্রনটেশনটার কথা জানি। মাঝখানে কেচিকলে পড়ে তোমার অবস্থাটা কীরকম তাও অনুমান করতে পারি। সবাই বলে, তুমি ভালমানুষ টাইপের। আর সেজন্য সাফারও করছ।
কথাটা ঠিক নয় রাজা। আমি কষ্ট পাচ্ছি না। আমার মন শক্ত হয়ে গেছে।
রাজা মাথা নেড়ে বলে, সেটাও স্বাভাবিক। তোমার বাপের বাড়ির থেকে আমরা খবর পেয়েছি, কুট্টিদার সঙ্গে তোমার বিয়েটা ভেঙে দেওয়ার কথাও ওঁরা ভাবছেন।
রেমির বুকটা হঠাৎ ভারী ঠেকল। ধীরে ধীরে তারা হাজরা অবধি হেঁটে এসে উত্তরদিকে আরও এগিয়ে যাচ্ছিল। রাজা ট্যাকসি নেয়নি, রেমি ট্রামে উঠতে রাজি হয়নি।
চলো বউদি, ট্যাকসিই ধরি। তুমি বড্ড একগুঁয়ে।
কেন? আমার তো এখন হাঁটতে বেশ লাগছে।
সেটা তোমার লাগছে। আমার লাগছে না। তোমাকে নিয়ে গিয়ে কলকাতা শহরটা একটু ঘুরে দেখাই চলো। তারপর সন্ধে সাড়ে ছটায় নাটক।
নাটকটা কি দেখতেই হবে?
তোমার ভাল লাগবে, দেখো।
কী করে বুঝলে যে ভাল লাগবে?
লাগবে। আমার কথা শুনেই দেখো না একদিন।
নাটক দেখা বা রেস্টুরেন্টে খাওয়া এগুলো আমার কাছে কোনও এন্টারটেনমেন্ট নয়। আমার ভাল লাগে না।
তা হলে কী করবে?
আমাকে একবার ওর অফিসে নিয়ে যাবে?
ও বাবা!
কেন? ও বাবা কেন?
পারব না বউদি। কুট্টিদা মেরে ফেলবে।
তুমি কি ওকে ভয় পাও?
ভীষণ।
কেন বলো তো! ওর মধ্যে ভয় পাওয়ার মতো কী আছে?
কুট্টিদা কতটা ভয়ংকর হতে পারে তুমি জানো না। এমনিতে রাগে না সহজে। কিন্তু রেগে গেলে লন্ডভন্ড কান্ড বাঁধিয়ে দেয়।
ঠিক আছে। চলো কোথায় যেতে হবে।
ট্যাকসি নিই?
রেমি থেমে গিয়ে বলল, নাও।
কী হয়েছিল তা আজ রেমির স্পষ্ট মনে নেই। কিছু একটা হয়েছিল নিশ্চয়ই। খুব ভাল কেটে গিয়েছিল দিনটা।
এখন অপারেশন টেবিলে শোওয়া রেমি তার অর্ধচেতনার মধ্যেও টের পায়, দিনটা ছিল তড়িৎগর্ভ। রাজার সঙ্গে সেই তার প্রথম ঘনিষ্ঠতা।
ডাক্তাররা চিন্তিত, উদ্বিগ্ন। রেমিকে একটি ঢেউ সংজ্ঞাহীনতার গভীর সমুদ্র থেকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য চেতনার বেলাভূমিতে নিয়ে এল। রেমির মনে হল, ডাক্তার নার্স সবাই বড় অসহায়।
বাস্তবিকই তাই। রেমির রক্তচাপ দ্রুত কমে আসছে। এ অবস্থায় তার শরীরে অস্ত্র চালানো বিপজ্জনক।
লবিতে কৃষ্ণকান্ত চারদিকে চেয়ে তার গোষ্ঠীভুক্ত মানুষদের দেখছিলেন। তাঁর জন্যই আজও এরা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বা যোগাযোগহীন হয়ে যায়নি। দেশভাগের পর প্রত্যেকের জীবনেই উলটোপালটা স্রোত বয়ে গেল। কে কোথায় যাবে, কোন ঠিকানায় গিয়ে ঠেকবে, তার কোনও স্থিরতা নেই। সেই সময়ে কৃষ্ণকান্ত শক্ত হাতে হাল ধরলেন। রাজনীতিতে তিনি সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। রোখা-চোখা মানুষ। কালীঘাটের বাড়ি ছাড়াও কলকাতায় যত আত্মীয়স্বজনের বাড়ি বা বাসা ছিল সেসব জায়গায় নিজে গিয়ে ভিটেছাড়া আত্মীয়স্বজনদের সাময়িক থাকার বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন তিনি। এমনকী দেশের বাড়ির চাকরবাকর, কর্মচারীরাও বাদ যায়নি। তারপর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে প্রত্যেকের জন্য নিজস্ব ভদ্রাসনের ব্যবস্থা করে দেন। অর্থসাহায্যে কোনও কার্পণ্য ছিল না। যারা পাকিস্তানেই থেকে গেল তাদের মধ্যে কেউ কেউ অনেক পরে চলে আসে। তাদের ব্যবস্থাও তিনি বিনা প্রশ্নে করে দেন। তার বাবা হেমকান্ত চৌধুরী খুব কাজের মানুষ ছিলেন না। কিন্তু স্নেহপ্রবণ ছিলেন। বড় বেশি স্নেহপ্রবণ। হেমকান্তর ওই সগুণটি উত্তরাধিকারসূত্রে কৃষ্ণকান্তর মধ্যেও এসেছে।
সবচেয়ে বড় কথা, উপকার যেমন করেছেন, তেমনি এদের টিকি বাঁধা পড়েছে তার কাছে। আজও তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস এদের কারও নেই। এরা কি তাকে ঘৃণা করে? করুক, সেই সঙ্গে এরা এও জানে, কৃষ্ণকান্ত চৌধুরীকে অস্বীকারও করা যায় না, উপেক্ষাও সম্ভব নয়।
কৃষ্ণকান্ত একজন নবাগতকে দেখে স্তিমিত কণ্ঠে বললেন, কমল, এসেছিস?
কমল ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসে বলল, এইমাত্র মামা। খবর পেতে একটু দেরি হয়েছিল।
দেখ, এখন আমার কপালে কী লেখা আছে।
রেমির অবস্থা কী?
ভাল নয় নিশ্চয়ই। ডাক্তার নার্স তো কেউ কিছু বলছে না স্পষ্ট করে। মুখ-চোখ দেখে বুঝতে পারছি কিছু ঘটতে চলেছে। তোরা দেখ কে কী করতে পারিস! ফুলু, তোর এক কে চেনাজানা, তান্ত্রিক আছে না?
ফুলু এগিয়ে এসে বলে, আছে মামা। বারাসতে।
কিছু করতে পারবে?
যাব মামা?
যা না। দেখ আমার গাড়িটা না হয় তো মহেন্দ্রর গাড়ি নিয়ে চলে যা। পারিস তত তুলে নিয়ে চলে আয়।
যাচ্ছি।–বলে ফুলু দৌড়ে বেরিয়ে গেল।
