তবে ওঁর নিন্দে করো কেন?
রাজা মাথা নেড়ে বলল, তুমি ঠিক বুঝবে না। বিরল সৌভাগ্যবতীদের মধ্যে তুমি একজন যার সঙ্গে কৃষ্ণকান্ত চৌধুরীর ক্ল্যাশ নেই। নইলে চৌধুরী বংশে এবং লতায়-পাতায় আত্মীয়দের মধ্যেও এমন লোক কমই আছে যে ওঁকে যমের মতো ভয় খায় না। সেটা উনি মন্ত্রী বলে নয়। এমনিতেই। আমরা আজ অবধি ওঁর ভয়ে প্রাণ খুলে প্রেম করতে পারি না, তা জানো? বংশে গোত্রে বর্ণে মিল না হলে বিয়ে উনি আটকে দেবেন। তারপরেও যদি সাহস করে এগোয় বা বিয়েটা করেই ফেলে তা হলে তাকে ভিটেমাটি ছাড়া করে ছাড়বেন।
এরকম হয়েছে নাকি?
বিস্তর। রিসেন্টলি কমলদা ওরকম একটা বিয়ে করতে চেয়েছিল, সে ঘটনা শোনোনি!
না তো! কমলদা কে? সেই হুগলি মহসিন কলেজের প্রফেসর? চশমা চোখে, মিষ্টি-মিষ্টি দেখতে?
সে-ই। একজন ছাত্রীর সঙ্গে লটঘট হয়েছিল। একে ছাত্রী, তার ওপর বর্ণ আলাদা। কৃষ্ণকান্ত কমলদাকে ডাকিয়ে এনে এমন যাচ্ছেতাই অপমান করলেন বলার নয়।
বিয়েটা হয়েছিল?
পাগল! কমলদা সাহস করলেও পাত্রীপক্ষ এগোয়নি ভয়ে। পাত্রীকে তার বাবা ভয়ের চোটে বিহারে পার করে দেয়। কমলদা চাকরি ছেড়ে কিছুদিন পাগলের মতো ঘুরে বেড়াল। এখন আবার শুনছি একটা ইংরিজি খবরের কাগজে কলাম লিখছে। তাতে খুব ঝেড়েছে তোমার শ্বশুরকে। প্রবন্ধটার নাম বোধহয় কাস্ট-ইজম অ্যান্ড ডাওরি সিস্টেম। বর্ণবিদ্বেষের ফলে বিয়েতে পণপ্রথা বৃদ্ধি পাচ্ছে, এরকমই একটা মত প্রচার করেছে সে। আমাদের বংশ এবং ঝাড়ে মুষ্টিমেয় কয়েকজন বিদ্রোহীদের মধ্যে কমলদা একজন।
আর তোমার কুট্টিদা?
সেও একজন। কিন্তু তার বিদ্রোহটা এখন আত্মনিপীড়নে দাঁড়িয়ে গেছে।
সেটা কেমন?
তুমি তার বউ, টের পাও না?
না, তোমার ধ্রুবদাকে আমি ঠিক বুঝি না।
রাজা একটু হাসল আবার। মাথা নেড়ে বলল, আমিও বুঝি না। শুধু জানি, ধ্রুবদা হ্যাভ বিন এ ব্রাইট ব্য। ঠিক পথে থাকলে আজ ওকে ঠেকানোর কেউ ছিল না। কিন্তু ধ্রুবদা ট্রাকে থাকতে পারছে না। নিজের বাবাকে জব্দ করতে গিয়ে নিজেই জব্দ হচ্ছে বেশি। আসলে ধ্রুবদার পথটাই ভুল।
ভীষণ ভুল। ওকে তোমরা বোঝাতে পারো না?
রাজা হঠাৎ প্রসঙ্গটা ঝেড়ে ফেলে বলল, কোথায় তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি জানো?
তো! মিথ্যে কথা বলে তো ঘরের বার করেছ, এবার কী করবে?
একটা নাটক দেখাতে নিয়ে যাব।
নাটক! ওসব আমার এখন ভাল লাগে না।
সে জানি। তোমার জীবনেই নানারকম নাটক ঘটে যাচ্ছে। স্টেজের নাটক তো তার নস্যি। তবে এ নাটকটার আলাদা একটা চার্ম আছে। আমি এটার মিউজিক করেছি।
মিউজিক করেছ মানে? তুমিই কি মিউজিক ডিরেক্টর নাকি?
লাজুক মুখে রাজা বলে, ওরকমই।
তা হলেই হয়েছে।
কেন, আমি কি খারাপ মিউজিক করি? দুটো সিনেমায় মিউজিক করছি, তা জানো?
শুনেছি। বাংলা সিনেমা এত ফ্লপ করে কেন তা তো বোঝাই যাচ্ছে।
বাজে বোকো না। ঘরের কোণে মুখ গুঁজে একাকিনী শোকাকুলা রাঘব-রমণী হয়ে পড়ে থাকো, কালচারাল ফিল্ডের খবর জানবে কী করে?
জানার দরকার নেই। আমি নাটক দেখব না।
প্লিজ বউদি।
আমার ভাল লাগছে না। তুমি মিথ্যে কথা বলে আমাকে যন্ত্রণা দিলে কেন বলো তো! তোমার কুট্টিদার সত্যি কোনও খবর রাখো না?
রাজা গম্ভীর হয়ে বলল, দুঃখিত বউদি। কী বললে যে তুমি বাড়ির বাইরে বেরোতে উৎসাহ পাবে তা বুঝতে পারছিলাম না। তবে কুটিদার খবর রাখি না, এটাও সত্যি কথা নয়।
রাখো তা হলে! বলছ না কেন?
সত্যিই শুনতে চাও?
চাই। কেন চাইব না?
একটু আগে কিন্তু উৎসাহ দেখাওনি।
এখন দেখাচ্ছি। শত হলেও সে আমার স্বামী।
ঠিক আছে। কুট্টিদা তিন দিন আগে আমাদের বাড়িতে এসেছিল। একরাত্রি ছিল।
এখন নেই?
না। পরদিনই চলে গেছে। তবে কলকাতাতেই আছে এবং যতদূর জানি অফিসও করছে। আমাদের কী বলে গেছে জানো?
কী করে জানব?
বলে গেছে পুলিশের ভয়ে বাড়ি আসতে পারছে না।
বাজে কথা।
কৃষ্ণকান্ত চৌধুরী নাকি পুলিশকে অ্যালার্ট রেখেছেন, বাড়ি ফিরলেই কুট্টিদাকে অ্যারেস্ট করা হবে।
মোটেই নয়।
হলেও কুট্টিদা ভয় খাওয়ার ছেলে নয়। ইন ফ্যাকট পুলিশের অনেক বড়কর্তা কুট্টিদার হাতের মুঠোয়।
তবে আসছে না কেন?
জানোই তো কুট্টিদা কীরকম। ওর লাইন অফ কনফ্রনটেশন একটু আলাদা ধরনের। নিজের বাপের বিরুদ্ধে সে একটা সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার চালাচ্ছে। ফেরার হয়ে থাকলে নাকি মন্ত্রীমশাইয়ের বেইজ্জতি হবে।
কোথায় আছে জানো না?
না। জানব কী করে?
জানো। বলবে না।
রাজা ঠোঁট একটু চেপে কী একটু ভেবে বলল, ধরো তাই।
ওর কি ধারণা খবর পেলেই আমি সেখানে গিয়ে ওকে ধরে আনব?
না। ওর ধারণা তুমি জানলে তোমার শ্বশুরও জেনে যাবেন।
কেন? আমি জানলে উনি জানবেন কেন?
তুমি নাকি শ্বশুরমশাইয়ের কাছে কিছুই গোপন রাখতে পারো না!
ভুল ধারণা। শ্বশুরমশাইয়ের কাছে ওর সম্পর্কে অনেক কথাই আমাকে গোপন রাখতে হয়।
সে আমি জানি না।
জানো না তো বেশ বোলো না। তবে তোমার কুট্টিদা তো অফিসও করছে। আমি যদি সে খবরটা শ্বশুরমশাইকে দিই!
সেটা তুমি দেবে না, কুট্টিদা জানে।
কেন? এ খবরটা দেব না কেন?
পুলিশ গিয়ে অফিসে হামলা করলে তোমার বরের চাকরি যাবে।
ওর আবার চাকরি! বছরে দুটো করে ছাড়ছে, দুটো করে পাচ্ছে। আর-একটা কথা তোমার কুট্টিাকে বোলো। যদি শ্বশুরমশাইকে অপমানই করতে চায় তবে ফেরার না থেকে পুলিশে সারেন্ডার করলেই বরং শ্বশুরমশাইয়ের বেশি অপমান হবে।
