হেমকান্ত বললেন, ডেকে কিছু বলেছে বুঝি?
খুব বিনয়ের সঙ্গে বলেছে। কিন্তু বলেছে। অন্যত্র আমাদের বাসের ব্যবস্থা করলে অসুবিধে হবে কি না। সঙ্গে এও বলেছে, এস্টেটের অবস্থা খুব খারাপ, বাড়তি কর্মচারী পোষার সামর্থ্য নেই।
হেমকান্ত অভিনয় করতে জানেন না। চুপ করে বুকের কাঁপুনি ভোগ করতে লাগলেন।
রঙ্গময়ি কিছুক্ষণ বিহ্বল দৃষ্টিতে চেয়ে রইল হেমকান্তর দিকে। তারপর বলল, কনক যা বলেছে তা অন্যায় বা অন্যায্য নয়।
হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, কিন্তু আমি তো এই প্রস্তাবে মত দিইনি।
তোমার কাছে তা হলে প্রস্তাব এসেছিল?
হ্যাঁ। কনকই তুলেছিল কথাটা। ওরা তো আর তোমাদের আসল মূল্য বোঝে না। সবাইকেই ওরা কর্মচারী হিসেবে দেখে। যুগের দোষ, মনু। ওকে ক্ষমা করে দিয়ো।
ক্ষমা করতে একটু আস্পর্ধা লাগে মেজো কর্তা। সেটা আমার নেই।
তোমার অধিকার কিছু কম নয়, মনু। সুনয়নী বেঁচে থাকতে, আর তার মরার পর তুমি যা করেছ তা কি বিনোদচন্দ্রের বেতনে শোধ হয়?
ওসব কথা তুলছ কেন? যে কিছু করে সে সবসময়ে সব করার মূল্য খোঁজে না। তা ছাড়া সে মূল্য দেবেই বা কেন কনক?
কনককে তুমি খারাপ ভাবছ না তো মনু?
রঙ্গময়ি একটু কষ্টের সঙ্গে হাসল। মাথা নেড়ে বলল, কেউ আমাকে অপমান করলেই তাকে খারাপ ভাবব আমি কি এত বোকা? আমাকে তো এ বাড়িতে অনেক এঁটোকাটা খেয়ে বড় হতে হয়েছে, কই অপমান লাগেনি তো! তোমার ছেলে কনক যখন দুধভাত অর্ধেক ফেলে রেখে উঠে যেত তখন আমাকে ডেকে এনে খাওয়ানো হয়েছে কত দিন।
আহা, আবার ওসব কথা কেন? কনক কী বলল বলো তো!
বললাম তো ন্যায্য কথাই বলেছে। বাবা অবশ্য খুব খেপে গেছে। দিব্যি ঘণ্টা নেড়ে দিন কাটছিল, এখন নতুন করে কাজকর্ম দেখতে হবে। দাদা তো এ বাড়ির ভরসায় লেখাপড়াটা পর্যন্ত ভাল করে শেখেনি। ভরসা জমিটুকু, সেটাও তোমরা দিয়েছিলে। এতগুলো পেট চলবে কীসে সেই ভেবে সকলের মাথা গরম।
বললাম তো, তোমাদের কোথাও যেতে হবে না।
তুমি বলছ?
হ্যাঁ। আমি।
কিন্তু তুমি কে?
তার মানে?
তুমি আজ যা বলছ তা ভাল ভেবে বলছ। কিন্তু রোজ যদি তোমার ছেলে আর আত্মীয়রা তোমাকে বোঝাতে থাকে যে, এই পুরুতটা নিতান্তই অকর্মার ধাড়ি, তা হলে তুমিও বুঝবে। বিশেষ করে কথাটা তো মিথ্যেও নয়। বাবা তোমাদের ঘাড়ে বসে একটা জন্ম খেয়ে গেল। কয়েক ঘর যজমান আছে, কিন্তু তারাও হতদরিদ্র।
আর বোলো না, মনু।
শুনতে চাও না?
না। কনক যাই বলুক, ওটা আমার কথা নয়। আজও নয়, কোনওদিনই নয়।
কেন নয়? যদি এস্টেট থেকে অকর্মাদের বিদেয় করতেই হয় তবে সবার আগে আমাদেরই বিদেয় করা উচিত। আর যদি আমাদের রাখো তবে সবাইকেই রাখতে হবে। পারবে?
তুমি কী বলে?
আমি কী বলব? আমার মুখ দিয়ে এসব কথা বেরোনো অন্যায়। তবু বলে ফেললাম।
বেশ করেছ বলেছ। এখন বলো আমি কী করব?
আমাদের জন্য তোমার আলাদা দরদ থাকা উচিত নয়।
সেটা আমি বুঝব।
রঙ্গময়ি একটু হাসল। তারপর হঠাৎ বলল, আমি আজও কেন আছি জানো?
কেন থাকবে না?
থাকার অনেক কারণ ছিল। কিন্তু আছি কেন সেটা তোমার জানা দরকার।
০৪৪. সেই একটা দিন কেটেছিল
সেই একটা দিন কেটেছিল বটে রাজার সঙ্গে। কারণ তাদের কোনও উদ্দেশ্য ছিল না, লক্ষ্য ছিল। ধ্রুবর খোঁজে তারা বেরিয়েছিল বটে, কিন্তু রাজা স্বীকার করে নিল, সে ধ্রুবর খোঁজ জানে না।
তা হলে?
তা হলে কী?–রাজা বুক চিতিয়ে বলে।
আমাকে নিয়ে এলে কেন?
ওই রাক্ষসপুরীর অন্ধকারে দিনরাত মুখ গুঁজে পড়ে থাকো। তোমার জন্য কষ্ট হচ্ছিল।
রাক্ষসপুরী!–রেমি ভ্রু কুঁচকে বলল, রাক্ষসপুরী বলছ কেন?
আহা, কথাটা অত শব্দার্থে ধরছ কেন? বাড়িটাকে মোটেই রাক্ষসপুরীর মতো দেখায় না। যথেষ্ট আলোবাতাস খেলে। কলকাতার হালের বাজারদরে এ বাড়ির দাম লাখ সাতেক হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। সেই হিসেবে বলিনি। কিন্তু ও বাড়ি তোমার সব সত্তাটাকে গিলে বসে আছে। বাইরে বেরোও না, ঘোরো না, মুখ শুকনো করে থাকো, আড়ালে হয়তো কাদোও। কে জানে।
মোটেই মুখ শুকনো করে থাকি না। আর কান্না অত সস্তা নয়।
মেয়ে হয়ে জন্মেছ, আর কাঁদো না, একথা বিশ্বাস করতে বলো?
আমি সহজে কাঁদ না। রাক্ষসপুরী বলতে কী মীন করছ বলো তো! শ্বশুরমশাইকে ঠেস দিয়ে বলছ না তো!
রাজা শুনে খুব হোঃ হোঃ করে হাসল, তারপর বলল, ওঁর স্বভাব খানিকটা রাবণের মতোই বটে। দাম্ভিক, আত্মকেন্দ্রিক, ক্ষমতালোভী। তার ওপর রাবণের যেরকম স্বজনপ্রীতি ছিল কৃষ্ণকান্ত চৌধুরীর স্বজনপ্রীতিও সেরকমই। খুব মিল আছে।
রেমি একটু বিরক্ত হয়ে বলল, তোমরা সবাই ওঁর এত নিন্দে কেন করো তা জানি না, তবে এটুকু জেনো ওই রাক্ষসপুরীতে যে আজও আমি আছি তা তোমাদের কুট্টিদার জন্য নয়, ওঁর জন্যই।
রাজা মৃদু মৃদু হাসছিলই। বলল, রেগে যাচ্ছ কেন? রাবণের যেমন বিস্তর গুড সাইড ছিল ওঁরও তেমনি বিস্তর প্লাস পয়েন্ট আছে। সেগুলো তো বলিনি।
থাক, আর বলতে হবে না। তোমাদের চেয়ে ওঁর প্লাস পয়েন্টগুলো আমি অনেক বেশি জানি। ওঁর সম্পর্কে এইসব অপপ্রচার কে করেছে বলে তো? তোমার কুট্টিদা নাকি?
রাজা মাথা নেড়ে বলে, না বউদি, আমরা অর্থাৎ কৃষ্ণকান্তর আত্মীয়রা প্রায় সকলেই ওঁর গভীর প্রভাবে মানুষ হয়েছি। জন্ম থেকেই আমাদের শেখানো হয়েছে যে, ওই কৃষ্ণকান্তর ইচ্ছার বিরুদ্ধে চলা যাবে না। কে কোথায় মেয়ের বিয়ে দেবে, কে কার ছেলের পৈতে কোন বয়সে দেবে, কে কোথায় জমি কিনবে সবই ওঁর অনুমোদনসাপেক্ষ। এখন অবধি বড় একটা কেউ ওঁর বিরুদ্ধে। চলেনি। তবে এও ঠিক লোকটি অসম্ভব ক্ল্যানিস। গোছীপ্রবণ যাকে বলা যায় আর কী। আর সেই কারণেই ওঁর নিজের জন কেউ বিপদে পড়লে উনি সঙ্গে সঙ্গে মুশকিল-আসান হয়ে হাজির হন।
