গাড়িটা খারাপ হইয়া গিয়াছিল। অনাথের ড্রাইভার তাহা মেরামত করিতেছে দেখিয়া আমি তাহার কাছে জানিতে চাহিলাম, গাড়ির প্রাণ কোনটা। কাহার জোরে গাড়ি চলে।
সে বেচারা সম্মুখে এক বিশিষ্ট মানুষ দেখিয়া ঘাবড়াইয়া গিয়াছে। তদুপরি সে চালক মাত্র। সে ইন্ধন জানে, যন্ত্রবিদ্যা জানে, কিন্তু প্রাণতত্ত্ব তাহার জানা নাই। গাড়ি কেমন করিয়া চলে তাহা সে জানে কিন্তু কেন চলে তাহা জানিবে কী করিয়া?
কিছুক্ষণ তাহার সহিত কথা বলিয়া গাড়ির যন্ত্রপাতি ইন্ধন সবই বুঝিয়া লইলাম। একটা ধোঁয়াটে আন্দাজ মতো হইল। গাড়ি কেমন করিয়া চলে তাহা তো একপ্রকার বোঝা গেল, কিন্তু কেন চলে, এ প্রশ্নে আবার অগাধ জলে।
ভাই সচ্চিদানন্দ, নরনারীর মিলনে মানুষ জন্মায় ইহা সর্বজনবিদিত। কিন্তু তবু ইহাও মানিতে হইবে মানুষ কখনও একটি মানুষকে তৈয়ারি করে না। সে জন্ম দেয় বটে, কিন্তু কলাকৌশল তাহার হাতে নাই। সে মোটরগাড়ি বানাইতে পারে, মানুষ বানাইতে পারে না।
পারে না যে, তাহার কারণ আমাদের অনধিগম্য, আমাদের সাধ্যাতীত কিছু মানুষের মধ্যে আছে। এমনকী মোটরগাড়ি বানাইলেও সেই গাড়ির প্রকৃত চালক কে তাহা মানুষের পক্ষে ব্যাখ্যা করা বড় সহজ হইবে না। অনাথের ড্রাইভার বড়জোর পেট্রলের কথা বলিয়াছে, পণ্ডিতেরা তাহার অপেক্ষা আর-একটু আগাইয়া বলিবেন,দাহিকাশক্তি। কিন্তু আমি তবু প্রশ্ন করিতে থাকিব, ওই দাহিকাশক্তি কোথায় নিহিত ছিল, কী করিয়া আসিল? ইন্ধন না হইলে আগুন মরিয়া যায়। কিন্তু সেই আগুনই চকমকি, দেশলাই প্রভৃতি স্থূল বস্তুর মধ্যে নিহিত আছে কী করিয়া? এই অগ্নি কোথা হইতে আসিল? সেই রহস্যের সন্ধান যদি দিতে না পারে তবে মোটরগাড়ি কী করিয়া চলে তাহার সঠিক উত্তর মোটরগাড়ির আবিষ্কর্তারও অজ্ঞাত।
এই শরীরের কোথাও প্রাণকে খুঁজিয়া পাই না। তাহা কোথায় আছে? তাহা কোথায় আছে? মস্তিষ্কে? চক্ষুদ্বয়ে? বক্ষদেশে? খুঁজিয়া পাই না। কিন্তু সে আছেই। সে নহিলে এই শরীর জড়মাত্র।
এই ভাবিয়া বড় আনন্দ হইল। আমার ভয়, মানুষ অচিরে একদিন পৃথিবীর সব রহস্যের সমাধান করিয়া ফেলিবে। সব জানিয়া ফেলিলে আর সে বাঁচিবে কী লইয়া। সে যে তখন স্রষ্টার সমকক্ষ। এখনও তাহার অজ্ঞাত কিছু আছে, ইহাই ভরসা।
কেন ভরসা জিজ্ঞাসা করিবে কি? তবে বলি, এই যে চারিদিককার পৃথিবী, এই যে মানুষেরা নিত্য জন্মাইতেছে, হদ্দমুন্দ হইয়া বিষয়কর্মে ছুটিতেছে, নানা সুখ দুঃখ ভোগ ত্যাগ শেষ করিয়া বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়া মরিতেছে, ইহার কোনও অর্থ খুঁজিয়া পাও? এই জীবনটা কি গোটাটাই অর্থহীন হইয়া যায় না, যদি না ইহার ভিতরে অন্তর্নিহিত প্রাণরহস্য থাকে?
মোটরগাড়ি আজ আমাকে এই প্রাণরহস্যের সন্ধান দিল, এমন নহে। প্রশ্নটি আমার ভিতর ছিলই। অনাথের অচল মোটরগাড়ি তাহাকে খোঁচাইয়া তুলিল মাত্র।
এদিককার অবস্থা তো সকলই জানো। বিশাখা আমাকে বড়ই হতাশ করিয়াছে। শচীনের মতো পাত্রকে তাহার পছন্দ হইল না। ওদিকে শচীনের জন্য পাত্রী প্রায় স্থির। শ্রীকান্ত রায়ের মধ্যমা কন্যার সঙ্গে বিবাহের কথা প্রায় পাকা হইয়া গিয়াছে। শচীনের দিক দিয়া ভালই হইবে। রায় মহাশয় দিবেন অনেক। উপরন্তু শচীনের ভগ্নীটিকেও নিজ পুত্র জ্যোতিপ্রকাশের জন্য মনোনীত করিয়াছেন। পালটি বিবাহ। শচীন সুখী হইলেই আমার মনের ভার লাঘব হইবে। আমি ছেলেটিকে বড় স্নেহ করি। স্নেহ পাইবার যোগ্যতাও তাহার বিলক্ষণ আছে। অন্য যোগ্যতার কথা ছাড়িয়া দিই। বিশাখা তাহাকে প্রত্যাখ্যান করায় তাহার যে অপমান হইয়াছে তাহা গায়ে না মাখিয়া সে আজও প্রতিদিন আসিয়া আমার এস্টেটের কাজকর্ম দেখিতেছে। নানা সুপরামর্শ দিতেছে। এই অহংকারহীনতা বড় কম কথা নহে।
মেয়েটিই আপাতত আমার দুশ্চিন্তার প্রধান কারণ। বয়স কম তো হইল না। এখনও পাত্রস্থ করিতে পারিতেছি না। মা-মরা মেয়ে, মনে মনে হয়তো আমাকেই দোষারোপ করে। কিন্তু আমি কী করিব? পৃথিবীর সকল ঘটনার হাল ধরিয়া তো আমি বসিয়া নাই।
গভীর ভালবাসা গ্রহণ করো। ঈশ্বর তোমাকে নিত্য আনন্দে রাখুন। তোমারই হেম।
চিঠিটা যখন মুড়ে রাখছেন তখনই রঙ্গময়ি ঘরে এল।
একটু চমকে ওঠেন হেমকান্ত। রঙ্গময়ি আজকাল এত দূর তো আসে না।
কী খবর, মনু?
রঙ্গময়ি একটু হাসল। কেমন দেখাল হাসিখানা? কান্নার মতো?
কী হয়েছে, মনু?–উদ্বিগ্ন হেমকান্ত আবার জিজ্ঞেস করেন।
কেন? তোমার কাছে কি এমনি আসতে নেই?
তা তো বলিনি। হঠাৎ তো এরকম আসো না কখনও।
আজ এলাম একটা কথা বলতে।
কী কথা?
আমরা চলে গেলে কি তোমার এস্টেটের উপকার হয়? আয়পয় বাড়ে?
সে কী কথা! একথা কে বলেছে?
তোমাকে জিজ্ঞেস করছি। বলো না!
আমি তো এরকম ভাবে কখনও ভাবিনি।
রঙ্গময়ির মুখটা আর-একটু ভাল করে দেখলেন হেমকান্ত। মানুষ গভীরভাবে অপমানিত হলে ভিতরকার তাপে সে শুকিয়ে যায়, তাম্রাভ হয়ে ওঠে। রঙ্গময়ির মুখে-চোখে সেইরকম একটা ভাব। চোখদুটোয় পাগলের চোখের মতো অস্বাভাবিক উজ্জ্বলতা।
রঙ্গময়ি বলল, তুমি নিজে থেকে ভাবোনি, কিন্তু তোমার হয়ে অন্য কেউ হয়তো ভাবছে। তুমি তো সব খবর রাখে না।
কী হয়েছে একটু খুলে বলবে?
আজ বিকেলে বাবাকে কাছারি বাড়িতে কনক ডেকে পাঠিয়েছিল।
কেন বলো তো!–হেমকান্তর বুক কাঁপতে থাকে। কনকের প্রস্তাব তিনি ভুলে যাননি। কিন্তু এখনও হেমকান্ত মতও দেননি। কনক কি তা হলে বিনোদচন্দ্রকে বিদায় হতে বলেছে? বলাটাই স্বাভাবিক।
