আমি অহংকারী? কে বলল?
বলার দরকার হয় না। আপনাদের চালচলনে সেটা অত্যন্ত প্রকট।
বাজে কথা।
আপনার বাবা একটু আগে বলেছেন, নিজেদের লোক ছাড়া আর কারও রক্ত দিদিকে দেওয়া চলবে না। কেন আমি জিজ্ঞেস করিনি। উনি মনে করেন তাতে ওঁদের বংশের রক্তের বিশুদ্ধতা নষ্ট হবে।
ধ্রুব একটু ফাঁকা আওয়াজ করে হাসল, ওঃ, বাবার কথা ছেড়ে দাও।
আপনার পক্ষে কথাটা বলা সোজা, কিন্তু আমার পক্ষে ব্যাপারটা হজম করা শক্ত। আমি দিদির ভাই হয়েও তাকে রক্ত দিতে পারব না জাস্ট একটা প্রিমিটিভ ক্ল্যানিশ হুলিগানের সেটা পছন্দ নয় বলে। এটা অহংকার নয়?
ধ্রুব চোখ গোল করে সপ্রশংস চোখে জয়ন্তর দিকে চেয়ে বলল, বাঃ দিব্যি বলেছ তো! একথাগুলো এতকাল আমার মাথায় আসেনি কেন সেটাই ভাবছি। কী কী বললে যেন! প্রিমিটিভ, ক্ল্যানিশ হুলিগান? না? বাঃ!
কথাগুলো আমি আপনাদের পুরো পরিবারের সামনেই বলতে পারি, এমনকী আপনার বাবার মুখের ওপরেও।
আমি জানি, ইউ আর এ কারেজিয়াস বয়। বুদ্ধিমানও।
আমি কিন্তু ইয়ার্কি করছি না।
আমিও করছি না। কিন্তু একটু-একটু ঝগড়া হয়ে যাচ্ছে।
হলে হচ্ছে।
কিন্তু ভাল হচ্ছে না, জয়। তোমার দিদির এই অবস্থায় আমরা ঝগড়া করতে পারি কি?
দিদির এই অবস্থা বলেই আমি চুপ করে থাকতে পারছি না।
এক্ষুনি একটা শো-ডাউন চাও?
যদি বলি চাই?
তা হলে তোমার কাজটা সহজ করে দিতে পারি।
কীভাবে?
তোমার কাছে কোনও অস্ত্রশস্ত্র আছে? পেনসিলকাটা ছুরি হলেও চলবে।
নেই।
ঠিক আছে। ওই যে সামনে একটা মস্ত অ্যাপার্টমেন্ট হাউস তৈরি হচ্ছে, দেখতে পাচ্ছো?
পাচ্ছি। তাতে কী?
চলো দুজনে ওখানে যাই। তারপর?
ওখানে আমি তোমার দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে থাকব আর তুমি একটা পাথর বা আস্ত ইট যা পাবে খুঁজে নিয়ে আমার মাথায় মারো। কোনও সাক্ষী থাকবে না।
হঠাৎ আপনি এত উদার হয়ে গেলেন যে!
আমি আজকাল শুধু একটা কথাই ভাবি, যুদ্ধ নয়, শাস্তি।
মাতাল অবস্থায না হলে প্রস্তাবটা ভেবে দেখতাম। কিন্তু আপনি তো নর্মাল নন।
সুতরাং আবার ঝগড়া?
ঝগড়া করতে চাইছি না। আপনি আপনার পরিবারের কাছে যান। আমাকে একটু একা থাকতে দিন।
আমিও একা। ওরা আমার তেমন কেউ নয়।
পেট্রলপাম্পের দিক থেকে একজন অতি সুপুরুষ যুবা এগিয়ে এল। তাকে কলকাতার অর্ধেক লোক চেনে। রাজা ব্যানার্জি। দুর্দান্ত রবীন্দ্রসংগীত গায়ক। তা ছাড়া কয়েকটা ফিলমেও নেমেছে।
কখন এলে, ধ্রুবদা?
এই তো। কী খবর রে?
রাজার মুখে গভীর বিষাদ ও শোক থমকে আছে। ছাইরঙা প্যান্ট, দুধসাদা হাওয়াই শার্ট ছাড়া গায়ে কিছু নেই। এই পোশাক এবং শোকের ছাপ সত্ত্বেও তাকে অসম্ভব সুন্দর দেখাচ্ছিল। খুব স্বাভাবিক কারণেই তাকে জড়িয়ে রেমির নামে একটা রটনা শুরু হয়েছিল। তা বলে রাজার ওপর কোনও রাগ বা অভিমান নেই ধ্রুবর। জীবনের খেলায় নিয়মকানুন অন্যরকম। কত ফাউল, কত সেমসাইড হয়, রেফারি চোখ বুজে থাকে।
রাজা তাদের কাছাকাছি এসে চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইল, যেন কী করবে তা ভেবে স্থির করতে পারছিল না। ধ্রুবর প্রশ্নের কোনও জবাব দিল না।
রাজার দিকে সাপের চোখের মতো একজোড়া কুটিল ও হিংস্র চোখ চেয়ে ছিল। সে চোখ জয়ন্তর। কিন্তু রাজা ওকে লক্ষ করল না।
অনেকক্ষণ বাদে রাজা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, কী হবে? অ্যাঁ!
কাকে জিজ্ঞেস করল তা ঠিক বোঝা গেল না। বোধহয় কাউকেই নয়। তার বুকের ভিতর থেকে প্রশ্নটা শ্বাসবায়ুর সঙ্গে বেরিয়ে এসে বিপুল পৃথিবীর আরও নানা শব্দের সঙ্গে মিশে গেল।
লবিতে তখন প্রাক্তন মন্ত্রীকে ঘিরে অনেক লোক। কৃষ্ণকান্ত একটা বড়ি খেয়েছেন। বুকে একটা ব্যথা হচ্ছেই।
কে যেন আবার একবার মোলায়েম গলায় বলল, আপনি চলে যান না। গিয়ে বিশ্রাম নিন। আমরা তো রয়েছি।
কৃষ্ণকান্ত গর্জে উঠলেন না। তবে সেই অবিমৃষ্যকারীর দিকে চেয়ে বললেন, তুমি কি জানো যে, আমি দ্বিতীয়বার মাতৃহারা হতে চলেছি? এ সময়ে কোনও ছেলে বাড়ি ফিরে গিয়ে বিশ্রাম নিতে পারে? বিশ্রাম জিনিসটা কি শুধু শরীরের ব্যাপার? মন যেখানে চঞ্চল অস্থির সেখানে শরীরের কি কোনও বিশ্রাম আছে?
অবিমৃষ্যকারীটি গা-ঢাকা দিল।
প্রতি দশ-পনেরো মিনিট অন্তর ও টি থেকে কেউ না কেউ এসে খবর দিয়ে যাচ্ছে।
খুব আশাপ্রদ খবর নয়। রক্তচাপ ক্ষীণ, স্রাব সাংঘাতিক, চেতনা প্রায় নেই। তবে আশা তো ছাড়া যায় না।
সাত আটজন ইতিমধ্যেই রক্ত দিতে তৈরি হয়েছে। কৃষ্ণকান্ত বলেছেন, তিনিও দেবেন। ডাক্তার বলেছে অত রক্তের দরকার নেই। গ্রুপ মিলিয়ে তিনজনের কাছ থেকে রক্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আপাতত যথেষ্ট।
ও টি-র দরজা কিছুক্ষণের জন্য আঁট করে বন্ধ করা হবে। সার্জেন তৈরি, অজ্ঞান করার বিশেষজ্ঞ তৈরি, নার্সরা তৈরি।
কৃষ্ণকান্ত হাহাকারের মতো একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ওই হনুমানটা আসেনি? সেটা কই?
জগা বলল, এসেছে। বাইরে আছে।
এখানে ডেকে আন। আমি ওকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করব।
জগা একটু দ্বিধা করল। কর্তাবাবুর কথার অমান্য চলে না। তবু সে একটু অপেক্ষা করে। কৃষ্ণকান্তর কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে কিছু বলো।
কৃষ্ণকান্ত বিবশ হয়ে শুধু সামনের দিকে চেয়ে রইলেন।
না, এরা কেউ চায় না তো তাকে। চাইলে সে এই পৃথিবীতে থেকে যেতে পারত আরও বহুদিন। ওই যে রক্তমাংসের ছোট্ট একটা পুঁটুলি পড়ল তার পেট থেকে, পড়েই প্রাণ পেয়ে জানান দিল, পৃথিবীতে এসেছে এক দামাল শিশু, ওকে বড় করত রেমি। বুকের ওম দিয়ে, চুমু দিয়ে, চোখের দৃষ্টিতে বার বার লেহন করে, দশ হাতে ঘিরে ধরে বড় করে তুলত আস্তে আস্তে। নিজের সবটুকু আয়ু কি শেষ হয়ে গেল ওকে পৃথিবীতে আনতে?
