না, তা নয়। তার বাচ্চাটাকে যেন অপয়া না ভাবে কেউ। বড় নিস্পাপ, কুসুমকোমল, ও জানে না তো পৃথিবীর পাপ-পুণ্য ভাল-মন্দের কথা। ও ওর মাকে মারেনি। যারা মেরেছে তারা মুখোশ এঁটে চিরকাল বহাল থাকবে পৃথিবীতে।
না, কেউ চায়নি রেমি বেঁচে থাক। রেমির এই মুহূর্তে চেঁচিয়ে সবাইকে বলতে ইচ্ছে করছে, ওগো তোমরা শোনো। ডাক্তার বদ্যি নয়, ওষুধ নয়, অপারেশন নয়, রক্ত নয়, শুধু কেউ একটু চাইলেই আমি বেঁচে থাকতে পারতাম। শুধু মনপ্রাণ দিয়ে, ভালবাসা দিয়ে যদি কেউ চাইত, রেমি বেঁচে থাক।
না, ভুল হচ্ছে রেমির। একথা তো ঠিক নয় যে, কেউই তার বেঁচে থাকা চায়নি। চেয়েছিল কেউ কেউ। তবে তাদের চাওয়ার ভাব ছিল অন্য রকম। রেমি চেয়েছিল একজন, মাত্র একজন তাকে। চাক।
হায়, সে না চাইলে রেমি বেঁচে থাকে কী করে?
রেমির চোখ থেকে মাঝে মাঝে আলো মুছে যাচ্ছে। আবার অন্ধকার কেটে ফুটে উঠছে থোপা থোপা আলো। মৃত্যু কী রকম গো? খুব অন্ধকার! না কি আলোয় আলো!
রাজা এসেছিল না এক দুপুরে! ধ্রুবর কী সব খবর নিয়ে!
তারপর তারা বেরোল ধ্রুবকে খুঁজতে। ধ্রুবর জন্য কোনও দুশ্চিন্তা বোধ করছিল না রেমি। তবু রাজার সঙ্গে যে বেরোল তার কারণ বেশ কয়েকদিন সে ঘর থেকে আদপেই বেরোয়নি।
কৃষ্ণকান্ত দিল্লি থেকে জরুরি ডাক পেয়ে চলে গেছেন। কাজেই কাউকে কিছু না জানালেও চলে। তবু লতুর জন্য একটা চিরকুট রেখে গেল। লতু কোথায় গেছে, কখন ফিরবে তার কোনও ঠিক নেই। মেয়েটা বাড়িতে খুব কম সময়ই থাকে। যদি ফেরে এর মধ্যে, তবে চিরকুট পাবে। বাড়ি আগলানোর কোনও লোক রইল না। তার অবশ্য দরকারও নেই। বনমালী আছে, জগার ছেলে আছে, তারা বুক দিয়ে আগলে রাখবে বাড়ি। এরা মাইনে করা কাজের লোক বটে কিন্তু আত্মীয়ের বেশি। দেখে মনে হয়, কৃষ্ণকান্ত কিছু লোককে স্থায়িভাবে সম্মোহিত করে রেখেছেন। কৃষ্ণকান্ত এই কাজটা খুব ভালই পারেন। তাঁর সম্মোহন যে কত সাংঘাতিক তা কি রেমিও হাড়ে হাড়ে টের পায় না? আর এই সম্মোহনের জাল কেটে বেরিয়ে যাওয়ারই কি প্রাণপাত চেষ্টা করছে না দুর্বল ধ্রুব?
রাজা হনহন করে ট্রামরাস্তার দিকে হাঁটছে দেখে রেমি বলল, কোথায় এলোপাথাড়ি হাটছ? ট্যাকসি ধরো না! ওই তো ট্যাকসি।
আরে দূর। বড়লোকি ব্যাপারে আমি নেই।
বেশ তো ছেলে তুমি! বড়লোকি ব্যাপার আবার কী! আমি বাপু ঢ্যাকর ঢ্যাকর করে ট্রামে বাসে যেতে পারব না।
বউদি, খুব কিন্তু রেলা হয়েছে তোমার!
ওমা! সে আবার কী!
কদিন আগেও মিডল-ক্লাস ছিলে। বিয়ের পর আপার-ক্লাস মেন্টালিটি এসে গেছে। অত ট্যাকসি-ট্যাকসি করো কেন? কলকাতার বাস-ট্রামে মানুষই যায়, গোরু-ভেড়া নয়। চলো।
আহা, এখন এত ঝামেলা ভাল লাগে! তোমার দাদার খবর এনেছ, এ সময়ে টাইম ওয়েস্ট করতে আছে?
কে বলল খবর এনেছি?
তুমিই তো বললে!
পাকা খবর নয়। উড়ো খবর।
তাই না হয় হল। ট্যাকসি ধরো তো, ভাড়া আমি দেব।
রাজা মাথা নেড়ে বলল, মেয়েরা ভাড়া দেয় নাকি? আমি রোজগার কিছু কম করি ভেবেছ? ভাড়া দেওয়ার ভয়ে বুঝি ট্যাকসি করছি না! তুমি একটা যাচ্ছেতাই।
আচ্ছা বাবা, ভাড়া তুমিই দিয়ো। কিন্তু পায়ে পড়ি, ট্যাকসি নাও। না হয় চলো বাড়ি ফিরে গিয়ে গাড়িটা নিয়ে আসি।
দরকার নেই। ট্যাকসি নিচ্ছি। না হলে তো কৃপণ ভাববে।
ভাবতাম। বাঁচালে।
রাজা হঠাৎ বলল, ধ্রুবদার ব্যাপারে তুমি খুব ফ্রাষ্ট্রেটেড জানি। কিন্তু এতটা নির্বিকার হয়ে গেছ তা জানতাম না।
নির্বিকার! কই, না তো! এই তো তোমার সঙ্গে তাকে খুঁজতে যাচ্ছি।
কিন্তু প্রথমে যেতে চাওনি। আমি জোর করায় যাচ্ছ।
তা খানিকটা বটে। আসলে আমি ওকে তোমার চেয়ে বেশি চিনি কিনা।
রাজা একটু চুপ করে থেকে বলল, কতটা চেনো তা জানি। কিন্তু ধ্রুবদা আমাদের সকলের চেয়ে অনেক বেশি ব্রিলিয়ান্ট। লেখাপড়ায় ভাল ছিল সেটা কোনও ফ্যাক্টর নয়। কিন্তু মানুষ হিসেবেও ধ্রুবদা নাম্বার ওয়ান। কেন এরকম হল বলল তো!
০৪৩. অনাথ ডাক্তারের মেলা টাকা
অনাথ ডাক্তারের মেলা টাকা। ডাক্তারি করেও টাকা করেছে, পাটের চালান দিয়েও করেছে। টাকা রাখার জায়গা নেই। লক্ষ্মী যাকে বর দেন তার দরজা দিয়ে পারতপক্ষে মা সরস্বতী হাঁটতে চান না। অনাথের ছেলেগুলো মানুষ হল না। তবে শহরের একজন মান্যগণ্য লোক হিসেবে অনাথের একটা পরিচিতি আছে। বাড়ি, গাড়ি, টাকা তার কিছুরই অভাব নেই।
হেমকান্তর ঘোড়ার গাড়িটা কালীবাড়ির সামনে এসে থামল। নাতি-নাতনিরা এখানকার পেঁড়া আর বালুসাই ভালবাসে। রোজই কিনে নেন হেমকান্ত। আজও চাকর পেঁড়া আর বালুসাই কিনতে গেছে। হেমকান্ত গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলেন, অনাথ ডাক্তারের গাড়িটা উলটোদিকে দাঁড়িয়ে। অনাথের ড্রাইভার বনেট খুলে খুটখাট কী যেন করছে।
এ শহরে খুব বেশি লোকের মোটরগাড়ি নেই। যাদের আছে তারা বেশ খাতির পায়। অনাথের গাড়িটার রং কালো। চার দরজার সেভানবডি। কয়েক বছর আগে দু হাজার টাকায় কিনেছিল। মোরগের ডাক দিয়ে হর্ন বাজে, ধুলো উড়িয়ে ঘরঘর করে চলে। বেশ লাগে জিনিসটা। মোটরগাড়ি এখনও হেমকান্তর কাছে একটা বিস্ময়, একটা রহস্য।
হেমকান্ত দরজা খুলে নেমে পড়লেন। পায়ে পায়ে গাড়িটার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই তাকে দেখে ড্রাইভার লোকটি তটস্থ হয়ে উঠল।
সাধারণ মানুষেরা রাজা-জমিদার, উকিল-দাবোগা দেখে ভয় পাবে, এটা স্বাভাবিক। হেমকান্ত এর মধ্যে কোনও অসঙ্গতি দেখতে পান না। কিন্তু আজ এই মুহূর্তে তার মনে হল, এ লোকটা সামাজিক স্তরে তার চেয়ে ক্ষুদ্র বটে, কিন্তু এ মোটরগাড়ির বিজ্ঞান জানে। তিনি তা জানেন না। সুতরাং অন্তত এ ব্যাপারে এ লোকটি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।
