চলুন। ঘর বরং ভাল। অনেক সেফ। এই সব বাগান-টাগানে দেখা-সাক্ষাৎ করা ঠিক নয়।
বিশাখা উঠল না। বসে রইল।
চপলা বলল, আয়।
তোমরা যাও। আমি একটু পরে আসছি।
ওমা? জলসা আছে যে একটু পরেই।
যাও না!–বিশাখা বিরক্তির গলায় বলে, আমি ঠিক আসব।
চপলা আর শচীন পাশাপাশি হেঁটে ভিতর বাড়ির দিকে চলে গেল। বিশাখা বিষাক্ত দৃষ্টিতে চেয়ে রইল তাদের গমনপথের দিকে।
বিশাখার শ্বাস ক্রমশ প্রলয়ংকর এবং উষ্ণ হয়ে উঠল। ভিতরে এক তীব্র জ্বালা। সে টের পায়। সে অনেক কিছু টের পায়।
দাঁতে দাঁত পিষে বিশাখা বলল, তলে তলে মকরধ্বজ! দাঁড়াও, দেখাচ্ছি মজা।
০৪২. রেমি যে মারা যাচ্ছে
রেমি যে মারা যাচ্ছে সে বিষয়ে বোধহয় কোনও সন্দেহই নেই। ধ্রুবর সমস্ত শরীরটা ভয়ে ঠান্ডা মেরে আসছিল।
একটু দূরে একা এবং আলাদা হয়ে জয়ন্ত নার্সিংহোমের দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ছেলেটার প্রতি একসময়ে যে রাগ আর বিদ্বেষ ছিল ধ্রুবর, এখন তা নেই। এখন সে কারও ওপরেই তেমন রাগ করতে পারে না। দিন দিন সে কি অবোধ হয়ে যাচ্ছে? ক্যালাস? হারিয়ে যাচ্ছে আত্মমর্যাদাজ্ঞান?
নিজের সম্পর্কে কোনও স্থির সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব হচ্ছিল না তার পক্ষে। শোক নয়, বিরহ নয়, রেমির আসন্ন মৃত্যুর কথা ভেবে তার বড় ভয় করছে। রেমি বেঁচে থাকলে কি ভাল? সে ঠিক করতে পারছে না।
সে গিয়ে জয়ন্তর পাশে দাঁড়ায়। জয়ন্ত সিগারেট খাচ্ছে, প্রকাশ্যেই। ধ্রুব যতদূর জানে, জয়ন্ত সিগারেট খায় না। এখন খাচ্ছে সম্ভবত ভিতরকার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাকে সামাল দেওয়ার জন্যই। একবার ধ্রুবর দিকে একটু তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল। ঘৃণায়? ভয়ে? কে জানে! কিন্তু ওই তাকানোটা বুলেটের মতো বিঁধল ধ্রুবর শরীরে।
ধ্রুব খুব বোকার মতো প্রশ্ন কবল, রেমির কোনও খবর আছে?
খুব খারাপ।
কতটা খারাপ?
যতটা খারাপ হওয়া যায়।
একেবারেই হোপলেস?
ডাক্তাররা সেরকম বলে না। কিন্তু আমি জানি।
ধ্রুব তার লম্বা চুলে একবার হাত বুলিয়ে নিয়ে বলল, অপারেশন তো এখনও হয়নি। হলে যদি বেঁচে যায়।
দিদির বেঁচে থাকা কি আপনি চান?
ধ্রুব একথায় রাগ করল না। মাথাটা বড্ড গোলমেলে। বলল, বাঃ, চাইব না? কী বলছ!
দিদি চায় না।
কী চায় না?
দিদি বেঁচে থাকতে চায় না।
বাজে কথা। বেঁচে থাকতে চাইবে না কেন?
আমি জানি। আপনিও চান না।
ধ্রুব এবার একটু গরম হল। বলল, জয়, এটা ঠিক তর্ক করার সময় নয়।
জয়ন্ত বিষাদ-মলিন একটু হেসে বলে, আপনার মুখ থেকে এখনও ভকভক করে মদের গন্ধ বেরোচ্ছে। আপনি খুব দুশ্চিন্তা করছেন বলে মনে হচ্ছে না।
ধ্রুব তেমন স্মার্টনেস বোধ করছে না। একথায় মিইয়ে গিয়ে বলল, বিকেলে একটু খেয়েছিলাম। জাস্ট টু সেলিব্রেট। তখন রেমির অবস্থা খারাপ ছিল না।
জয়ন্ত ঠান্ডা অথচ বিষাক্ত একরকম গলায় বলল, আপনি কি এ খবর রাখেন যে, দিদির লেবার পেন উঠেছিল তিন দিন আগে? মেমব্রেন বাস্ট করায় সমস্ত ফ্লুইড বেরিয়ে যায় তিনদিন আগেই। ট্র্যাক শুকিয়ে যাওয়ায় ডাক্তার ফরসেপ দিয়ে টেনে বাচ্চাটাকে বের করেছে। দিদির শরীরে কীরকম ইনজুরি হয়েছে আমরা জানি না। কিন্তু এটুকু জানি, বাচ্চাটাকে জন্ম দেওয়ার পর থেকেই দিদি বেঁচে থাকার লড়াইটা আর লড়ছে না। ডেলিভারির পর দিদি ডাক্তারকে বলেছিল, আমার যা হয় হোক, বাচ্চাটাকে আপনারা বাঁচিয়ে রাখবেন। বাচ্চাটার বেঁচে থাকা ভীষণ দরকার।
না, আমি অত সব জানি না।
সেইরকম বিষাক্ত হেসেই জয়ন্ত বলে, তা জানার কথাও আপনার নয়। আপনি কোনওদিনই দিদির জন্য পরোয়া করেননি। আমরা শুনেছি, কিছুকাল আগে আপনি দিদির একটা অ্যাবরশনও করিয়েছিলেন, যেটার কোনও দরকার ছিল না। এইসব করে আপনি দিদির শরীর নষ্ট করেছেন, মন ভেঙে দিয়েছেন। অথচ সে খবরটা আপনার জানা ছিল না।
বিরক্ত ধ্রুব বলল, এসব কথা বলার অনেক সময় পাবে, জয়। আমি তো পালিয়ে যাচ্ছি না। কিন্তু এখন–
এখনটা তো তখনকারই পরিণতি। আমার দিদি বিয়ের পরই মরে গিয়েছিল কিংবা তখন থেকেই তার মৃত্যু শুরু হয়েছিল। আজ শুধু শি উইল বি টারমিনেটেড। তার বেশি কিছু নয়। ভাবছেন কেন? খুব বেশি উতলা বোধ করলে আরও কয়েক পেগ চাপিয়ে নেবেন। খুব নর্মাল হয়ে যাবেন তা হলে।
ধ্রুব টের পাচ্ছে অর ভিতরে একটা আগুন নিবে গেছে। কিছুতেই সে উত্তপ্ত হতে পারছে না। হাজির জবাবের জন্য তার যথেষ্ট খ্যাতি ছিল, সে ঠোঁটকাটাও বটে কিন্তু কিছুতেই মুখে কথা আসছে না। কিন্তু কী নিবে গেল? কীসের আগুন? এমন সেঁতিয়ে আছে কেন ভিতরটা?
একথা ঠিক যে, সে দায়িত্বশীল স্বামী নয়, বাপের সুযোগ্য পুত্র নয়, তার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তাকে জামাই হিসেবে পেয়ে খুব গৌরবান্বিত বোধ করে না। এ সবই ঠিক কথা। কিন্তু ধ্রুবও তো দুনিয়ার মানুষকে একটা কিছু বোঝাতে চাইছে। তারও তো একটা বার্তা আছে দুনিয়াভর গাড়লদের প্রতি। গিধড়রা সেটা বুঝতে চাইছে না কেন?
ধ্রুব হঠাৎ টান টান সোজা হয়ে ভিতরকার নিবন্ত আগুনে কিছু রাগের বাতাস লাগিয়ে জয়ন্তকে জিজ্ঞেস করল, তোমরা আমার কাছে কী এক্সপেক্ট করেছিলে?
সেটা জেনে আপনার কী হবে? আপনার ভিতর সেটা নেই।
আমার মধ্যে অনেক কিছুই নেই। কিন্তু তোমরা কোনটা চেয়েছিলে সেটা একটু জেনে রাখি।
যেটা নেই সেটার কথা বলে লাভ কী? যেটা আছে সেটার কথা বরং বলুন।
সেটা কী?
আপনারা এত অহংকারী কেন?
