এটা তো বাজে জায়গা। সুন্দর আবার কী? জঙ্গল, আগাছা, বিছুটিবন।
তোর চোখ নেই।
তা হয়তো নেই।
ঠিকই নেই। তোর জন্য আমার ভাবনা হয়। এ জায়গাটা সুন্দর কেন জানিস! সাজানো নয় বলে।
তুমি কলকাতায় থাকো বলে গাছপালা দেখলেই ভাল লাগে। আমাদের তো তা নয়। গাছপালা দেখতে দেখতে চোখ পচে গেছে।
তোর চোখ পচে গেছে, মন পচে গেছে, হৃদয় বলে কিছু নেই।
বেশ তো বেশ। পচে গেছে তো গেছে।
আয় এখানে বসি।
ওমা! ওই ভাঙা গাড়ির পাদানিতে!
তাতে কী! বেশ পরিষ্কার তো!
বিশাখা একটু হাসল। ভারী সুন্দর দেখাল তাকে। আজ তাকে একটু সাজিয়েছে চপলা। চমৎকার একটা বুটিদার নীল বেনারসি তার পরনে। বাজুতে অনন্ত, কবজিতে বালা আর চুড়ি, গলায় মোটা একটা মটরদানা হার। চুল ফুঁপিয়ে আঁচড়ানো। কিন্তু সাজগোজ বড় কথা নয়। বিশাখা সাজগোজকে উপেক্ষা করেই তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য বিকিরণ করছে।
দুজনে ভাঙা গাড়ির পাদানিতে বসে নিচুস্বরে কথা বলতে লাগল।
চপলা জিজ্ঞেস করল, ভয় করছে না তো রে?
বিশাখা মাথা নেড়ে বলল, না। তবে তোমার এতটা করার দরকার ছিল না। বাবা শুনলে তোমার ওপর চটে যাবে।
সে আমি বুঝব। তোর কেমন লাগছে বল!
কিছুই লাগছে না।
বুক কাঁপছে না?
না তো!
ঠোঁট শুকিয়ে যাচ্ছে না?
একটুও না, এই দেখো না ঠোঁট।
উঃ, তুই পাষাণী বটে। তোর কিছু হচ্ছে না, কিন্তু আমারই তো বুক কাঁপছে।
দেখো আবার, তুমিই শচীনের প্রেমে মজে যেয়ো না।
দূর মুখপুড়ি! বলে একটা চিমটি কাটে চপলা।
উঃ! ভীষণ লেগেছে কিন্তু।
তোর কিছু হচ্ছে না কেন?
হবেই বা কেন?
পুরুষমানুষকে লজ্জা হয় না তোর?
তা হয়। কিন্তু পুরুষমানুষকেই হয়। শচীনকে নয়।
তার মানে কি শচীন পুরুষ নয়?
তা বলিনি।
তাই বলেছিস। কেন রে? সে কি মেয়েমানুষের মতো?
বিশাখা মাথা নিচু করে একটু ভাবল। তারপর বলল, বড্ড হিসেবি, নরমসরম।
সেটা কি খারাপ?
পুরুষের স্বভাব হবে দামাল।
তুই কাউকে দেখেছিস ওরকম? সত্যি কথা বল তো, কাউকে পছন্দ?
না, তা নয়।
আমার মনে হয়, তুই একটা গণ্ডগোল পাকিয়ে রেখেছিস মনে মনে। ভয়ে বা লজ্জায় বলছিস না।
বিশাখা তার জেদি মুখ নত করে রইল।
চপলা নিচু হয়ে উঁকি মেরে মুখটা দেখার চেষ্টা করে বলল, লুকোচ্ছিস না তো!
বিশাখা মাথা নেড়ে বলল, না।
ঠিক সেই সময় গরম দু ফোঁটা জল পড়ল বিশাখার হাঁটুতে রাখা চপলার হাতে। চপলা চমকে উঠে বলল, কাঁদছিস? ওমা! কেন রে!
বিশাখা জবাব দিল না। গোঁজ হয়ে রইল।
চপলা বিশাখার কাঁধে হাত রেখে একটু কাছে টেনে নিয়ে বলল, চোখ মুছে নে। শচীন দেখলে কী ভাববে?
আমি চলে যাই বউদি?–বড় কাতর শোনাল বিশাখার গলার স্বর।
চলে যাবি? আমি শচীনকে তা হলে কী বলব?
যা হয় একটা কিছু বোলো।
তা হয় না। বোস। তুই তো বললি বাঘ ভালুক নয়, তবে যাবি কেন?
সব কথা বোঝানো যায় না। আমি অত কথা জানি না।
আচমকাই শচীনকে দেখতে পেল চপলা। মন্দিরের দিকটায় একটা ভাঙা বাড়ির স্থূপ আর আগাছার হাঁটুভরা জঙ্গল পার হয়ে আসছে। পরনে কঁচি ধুতি, গরদের পাঞ্জাবি। ভারী সুন্দর দেখাচ্ছে।
আসুন।–বলে চপলা উঠে দাঁড়ায়।
শচীন এক ঝলক বিশাখার দিকে চেয়ে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে থমথমে মুখে বলে, আপনি খুবই দুঃসাহসী।
চপলা মৃদু স্বরে বলে, আপনিও কম নন।
শচীন মাথা নেড়ে বলে, এ জায়গায় ডেকে আপনি ঠিক কাজ করেননি। ঘটনাটা জানাজানি হয়ে যাবে।
হোক না।
না বউঠান, এটা কলকাতা নয়। জানাজানি হলে সকলেরই অসুবিধে, বিশেষ করে বিশাখার।
নিজের নাম শচীনের মুখে শুনে বিশাখা একবার চোখ তুলেই নামিয়ে নিল।
চপলা মুখ টিপে একটু হেসে বলল, কিন্তু আপনি তো এসেছেন। না এসে তো পারেননি।
এলাম।–বলে শচীন একটু উদাসভাবে ওপরের দিকে চেয়ে থাকে। তারপর হতাশার ভঙ্গিতে মাথাটা একটু নেড়ে বলে, কয়েকটা কথা বলতে আসা।
কী কথা?
এ বিয়ে যে হবে না সেটা আপনি ধরে নিতে পারেন।
হবে না?
না। কিছুতেই না।
আপনার বাড়ির কোনও অমত আছে?
অমত ছিল না। কিন্তু বিশাখার মনোভাব জানাজানি হওয়ার পর অমত হয়েছে।
চপলা হঠাৎ ভারী বিষণ্ণ হয়ে গেল। বলল, ইস! আমাদের দুর্ভাগ্য।
না। দুর্ভাগ্য কেন! বিশাখা তো এই বিয়ে চায়নি।
ও কী চায় তা ও নিজেই জানে না। বলে চপলা বিশাখার দিকে তাকাল।
বিশাখা অনড় এক পুতুলের মতো যেমন বসে ছিল তেমনি বসে রইল।
শচীন বলল, সেটা আপনি আর বিশাখা বুঝবেন।
শুনুন শচীনবাবু, আপনি নিজে যদি বিশাখার সঙ্গে একটু কথা বলেন, তা হলে বোধহয় ওর একটা ভুল ধারণা কেটে যাবে।
শচীন একটু হাসল। তারপর ধীর স্বরে বলল, ওকে তো আমি এইটুকু বেলা থেকে দেখছি। কথাও বলেছি অনেক। নতুন করে কী আর বলার আছে বলুন।
ও বড় হওয়ার পর তো বলেননি।
বলার দরকারও দেখছি না।
চপলা হঠাৎ একটু ঝাঝের সঙ্গে বলল, আপনার কিন্তু বেশ অহংকার।
শচীন বিষণ্ণ মুখে মাথা নেড়ে বলল, তা নয়। অহংকার থাকলে একটি মেয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে জেনেও আজ এখানে আসতাম না। অহংকার নয় বউঠান। বরং আত্মগ্লানি।
ওর বয়স কম। একটু তো বিবেচনা করবেন।
আপনারা ধরে-বেঁধে ওর ওপর অযথা একটা অত্যাচার করে যাচ্ছেন, বউঠান। হেমবাবু করেছেন, মনুদি করেছেন, এখন আপনিও করছেন। আমি বলি কী, বেচারাকে ছেড়ে দিন। বেচারা এত লোকের মতামতের চাপে পড়ে দিশাহারা হয়ে যাচ্ছে।
চপলার মুখে কথা জোগাল না। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর বলল, চলুন, তা হলে ঘরে গিয়ে বসি।
