নতুন কেনা মহালটা দেখতে গিয়েছিলেন রাজেনবাবু। ফিরলেন দুপুরে। ঘেমেচুমে একশেষ। নৌকো থেকে নেমে একটা ছ্যাকরা গাড়িতে বাড়ি ফিরে স্নান করে যখন খেতে বসেছেন তখন। স্বর্ণপ্রভা বললেন, হেমবাবু লোক পাঠিয়েছিলেন।
ভ্রু তুলে রাজেনবাবু একটু বিরক্তির সঙ্গেই বললেন, কেন?
বিয়ের ব্যাপারে এগোতে আরও মাস দুই সময় চেয়েছেন।
কে এসেছিল?
মন। আমার যেন কেমন-কেমন মনে হচ্ছে।
কেমন-কেমন মানে?
ওরা শচীনের মাথাটা খাওয়ার মতলব করছে। ভাল চাও তো শচীনকে বলো, যেন হেমবাবুর এস্টেটের কাজ ছেড়ে দেয়।
মাথাটা কী করে চিবিয়ে খাবে?
মেয়েরা সব পারে।
এই তো শুনি মেয়েটি নাকি এ বিয়েতে রাজি নয়। তারপর আবার মাথা চিবোনোর প্রশ্ন উঠছে কী করে?
কী জানি! শচীনের জন্য আমরা অন্য পাত্রী দেখছি সেটা বোধহয় ওদের কানে গেছে। তা ছাড়া আরও কথা আছে।
আবার কী কথা?
কোকাবাবুর নাতি শরৎ, সেই যে ডাকাতিয়া ছেলেটা, বিশাখা নাকি তাকে বিয়ে করার জন্য পাগল।
রাজেনবাবু এবার গম্ভীর হলেন। গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, তাই নাকি? এতদূর।
সেইজন্যই বলছি ছেলেকে এখন থেকেই একটু সাবধান করে দিয়ে। যদি এ মেয়ের ফাঁদে পড়ে যায় তবে সারা জীবন নানা জ্বালা পোহাতে হবে।
একটা অতৃপ্ত উগ্র তুলে রাজেনবাবু উঠে পড়লেন।
স্বর্ণপ্রভা পিছন থেকে বললেন, সময় চাইবেই বা কেন! ধিঙ্গি মেয়েকে ঘরে বসিয়ে রেখে নষ্ট করছে, তার জন্য আমরা কেন সময় দেব? তুমি সোজা গিয়ে না করে দিয়ে এসো।
রাজেনবাবু মাথা নেড়ে বলেন, কাজটা ওভাবে করতে চাই না। হেমবাবু লোক খারাপ নন।
লোক ভালই বা কীসের? কানাঘুষো তো কিছু কম শুনিনি। মনু আজও বিয়ে বসেনি। লোকের কথা কি আর সব মিথ্যে হয়! এ বিয়ে ভেঙে দেওয়াই তো উচিত। আমি বলি দু-চারটে স্পষ্ট কথা মুখের ওপর বলে ভেঙে দেওয়াই ভাল। আমরা পাত্রপক্ষ, অত জো-হুজুর হয়ে থাকব কেন?
রাজেনবাবু টের পান, স্বর্ণপ্রভা ঠিক আগের মতো নেই। এক সময়ে সংসার চালানোর জন্য কিশোরী বয়স থেকে এই স্বর্ণপ্রভা কাঁথা সেলাই ইত্যাদি কত কী করেছেন। হেমবাবুর স্ত্রীর আঁতুড়ঘরে কাজ পর্যন্ত করেছেন। তার বদলে ধারকর্জ সাহায্য অনেক কিছু পাওয়া গেছে। সুনয়নীর সঙ্গে স্বর্ণপ্রভার একটা সখিত্বও গড়ে উঠেছিল। তবে সেটা সমানে-সমানে নয়। বড়লোকের যেমন পারিষদ থাকে স্বর্ণপ্রভাও তাই ছিলেন সুনয়নীর। প্রায়ই এসে বলতেন, বাবা গো, একগলা মিথ্যে কথা বলে এলাম কীর মন রাখতে।
সেসব দুঃখের দিন গিয়ে আজ স্বর্ণপ্রভার জীবনে এক স্বর্ণযুগ এসেছে। স্বামী আর ছেলেরা দুহাতে রোজগার করছে। তিনি নিজে গোপনে বন্ধকি কারবার করছেন। তাঁর মনোভাব বুঝতে রাজেনবাবুর দেরি হয় না।
কিন্তু রাজেনবাবু এখনও স্বর্ণপ্রভার মানসিকতা অর্জন করতে পারেননি। অবস্থার পরিবর্তনে মানুষের মনের পরিবর্তন হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু তার মধ্যে একটা বিকৃতিও আছে। অতীতকে বিস্মৃত হওয়া বা ভবিষ্যতের চিন্তা না করাটাই মানুষের স্বভাব। তার চিন্তা শুধু বর্তমান নিয়ে। কিন্তু রাজেনবাবু সব সময়েই এরকম অবিমৃষ্যকারিতা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে চান। অকৃতজ্ঞতা তার স্বভাবে নেই। তিনি জেদি, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ বলেই আজ ছুটকো বড়লোকের মতো ভাবভঙ্গি করতে লজ্জা পান।
স্বর্ণপ্রভার প্রস্তাবে রাজেনবাবু সায় দিলেন না। গম্ভীর মুখ করে বললেন, যা স্থির করার আমিই করব। তোমার আর এ নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই। সম্বন্ধটা ভেঙে যাচ্ছেই। কিন্তু সেটা আমাদের তরফ থেকে হওয়া উচিত নয়। কেন নয় সেটা তুমি বুঝবে না।
ছেলেকে তো কিছু বলবে! সে ও বাড়িতে যায়-আসে এটা আমার পছন্দ নয়। আবার একটা কানাকানি শুরু হবে।
আচ্ছা, সেটা ভেবে দেখছি।
রাজেনবাবু তার ঘরে এসে ইজিচেয়ারে বসে নিঃশব্দে তামাক খেতে লাগলেন। বাইরে গ্রীষ্মের খাঁ খাঁ দুপুরে একটা ঘুঘু ডাকছিল। চালের টিনে পাতা খসার শব্দ। পায়রার গাঢ় বকবকম স্বর এক-আধবার শোনা গেল। রাজেনবাবু নিজের বর্তমান বৈষয়িক সম্পন্নতাটা খুব টের পান। কিন্তু ভাবেন, আমার মনে কোনও হীনতা জন্ম নিচ্ছে না তো! কোনও দেমাকি ভাব! আমি মানুষকে যথাযথ মূল্য দিতে পারছি তো! যথেষ্ট বিনয়ি আছি কি এখনও?
ভাবতে ভাবতে তিনি চোখ বুজলেন। একটু তন্দ্রা এল।
কুঞ্জবনে আজ ধানিরঙের রোদ এক সুন্দর আবহ রচনা করেছে। ভারী নির্জন। ভারী নিরিবিলি। রোদের আলপনা আর আঁকিবুঁকি ছড়িয়ে আছে সবুজ ঘাসে। গ্রীষ্মের প্রখরতায় বিবর্ণ গাছপালা কালবৈশাখীর ঝাপটায় আবার সতেজ।
কাছারি-ঘরের আড়াল থেকে লতানে গাছে আচ্ছন্ন একটি গুঁড়িপথ বেয়ে কুঞ্জবনে ঢুকল চপলা। তার হাতে ধরা বিশাখার লাজুক হাত।
বিশাখা একটা ঝাপটা দিয়ে বলল, আঃ, ছাড়ো না!
না, তুই পালাবি।
পালাব কেন? বাঘ না ভালুক?
তার চেয়েও সাংঘাতিক। বিয়ে হলে বুঝবি বরের চেয়ে সাংঘাতিক জন্তু আর নেই।
হলে তো!
হওয়াচ্ছি, পালাবি কোথায়!
ছাড়ো বউদি, পায়ে পড়ি।
তেমন গরজ তো দেখছি না ছাড়া পাওয়ার! আয় বলছি।
তোমার মাথায় কেম্নে আছে বউদি। আজ সন্ধেবেলায় তো জলসা হচ্ছেই।
জলসায় কি কথা হয় রে বোকা! কথার জন্য জলসা নয়।
দেখা করে লাভ কী?
যদি এল ও ভি ই হয়ে যায়?
যাঃ।
দুজনে কুঞ্জবনে এসে চারদিকটা তাকিয়ে দেখল। চপলা একটা বেগুনি রঙের ছোট ফুল ছিঁড়ে খোঁপায় গুঁজে ঘঘামটাটা আবার তুলে দিয়ে বলল, এ জায়গাটা যে এত সুন্দর জানা ছিল না! কেন সুন্দর বল তো!
