রেমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কৃষ্ণকান্ত সেদিন ভারী অন্যমনস্ক মুখে উঠে গেলেন টেবিল থেকে।
ধ্রুব ফিরল না। তবে তার এই ফেরার হওয়ার ঘটনাটা বেশ চাউর হয়েছে এটা বোঝা গেল।
একদিন সকালে টেলিফোন কবল রাজা, ধ্রুবর পিসতুতো ভাই। বয়স ধ্রুবর মতোই। ভারী সুন্দর দেখতে। দারুণ গান গায়। রেডিয়োতে আজকাল প্রায়ই তার প্রোগ্রাম থাকে। তা ছাড়া। ফুটকড়াইয়ের মতো ইংরিজি বলে, ভাল ছাত্র ছিল, ইনডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে একটা বিদেশি ফার্মে দুর্দান্ত একটা চাকরিও পেয়ে গেছে।
রাজা বলল, বউদি, ধ্রুবদা কলকাতায় ফিরেছে জানো?
না তো।
ফিরেছে কিন্তু।
তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছে?
ঠিক দেখা হয়নি। তবে আমি খবর পেয়েছি।
তাই নাকি?
আমার সঙ্গে যদি যাও তবে তোমাকে ধ্রুবদার ডেরায় নিয়ে যেতে পারি।
ডেরাটা কোথায়?
জায়গাটা খুব ভাল নয়।
ভাল নয় মানে কতটা খারাপ?
আরে না না, বার-টার নয়। বরং উলটো, একটা রিলিজিয়াস বাড়িতে ঢুকে পড়েছে।
সে কী?
ভয় পেয়ো না। সন্ন্যাসী হয়নি, ইটস এ ক্যামোফ্লেজ।
জায়গাটা কোথায়?
নর্থ ক্যালকাটায়।
আমাকে নিয়ে গিয়ে কী হবে?
যদি যেতে চাও তো নিয়ে যেতে পারি।
আমি গিয়ে তো কিছু করতে পারব না, বরং শ্বশুরমশাইকে বলো।
ওরে বাবা! ছোটমামা শুনলে হেভি ফায়ার হয়ে যাবে। পুলিস কেসও হয়ে যেতে পারে।
তাহলে আর কী করা?
আমি বলছিলাম কী, তুমি চলল। আমার মনে হচ্ছে ধ্রুবদার অবস্থা এখন আবার সাধিলেই খাইব। তুমি গিয়ে বললেই সুট করে ফিরে আসবে।
না রাজা, নিজের ইচ্ছেয় যদি ফেরে তো ফিরুক, আমি ওঁর বাবাকে না বলে ওঁকে ফেরাতে যেতে পারি না।
তুমি ধ্রুবদার ওপর রেগে আছো বউদি, লোকটাকে তোমরা সবাই একটু ভুল বুঝে যাচ্ছে কিন্তু।
কীরকম?
যতটা খারাপ লোকটাকে মনে হয় ততটা খারাপ নয়।
জানলাম।
কাল চলল।
অত তাড়া কীসের?
তাড়া আছে বউদি। সেটা সিরিয়াস।
খুব সিরিয়াস বলে তো মনে হচ্ছে না।
তুমি সবটা জানো না।
তাহলে সবটা বলো।
ঠিক আছে। আমি কাল যাচ্ছি।
পরদিন রাজা এল। তার স্বভাবসুলভ ফিচেল হাসিটা ঠোঁটে নেই। বরং একটু উদ্বেগ মাখা মুখ। কী হল? তোমাকে গম্ভীর দেখাচ্ছে কেন?—রেমি শঙ্কিত হয়ে জিজ্ঞেস করে। যে খবরটা তোমাকে কাল টেলিফোনে দিয়েছিলাম সেটা ঠিক নয়। ধ্রুবদা ওখানে নেই।
রেমি ধ্রুবকে চেনে। তাই হেসে বলল, তাতেই বা কী? অত অ্যাংজাইটির কিছু ব্যাপার নয়। কোথাও আছে! এসে যাবে।
রাজা হঠাৎ হাত বাড়িয়ে রেমির একটা হাত চেপে ধরল, না বউদি, তুমি বুঝতে পারছ না, ধ্রুবদাকে রেসকিউ করতে হবে। হি ইজ ইন এ ট্র্যাপ।
ট্র্যাপ! হাতটা ছাড়িয়ে নিল না রেমি। উঠল। বলল, আচ্ছা যাচ্ছি। কিন্তু এটাও কোনও ট্র্যাপ নয় তো! তোমার ধ্রুবদাই হয়তো তোমাকে পাঠিয়েছে?
না, বউদি! আপন গড।
০৪১. বৈশাখ মাসে কোকাবাবুদের একটা মহাল
বৈশাখ মাসে কোকাবাবুদের একটা মহাল কিনে নিলেন রাজেন মোক্তার। তার বৈষয়িক অবস্থাটা বেশ ভালর দিকে। শচীন এখন বেশ পসার জমিয়ে ফেলেছে। সেজো ছেলে রথীন মৃত্যুঞ্জয় স্কুলের খুবই মেধাবী ছাত্র। মাস্টারমশাইদের ধারণা সে ম্যাট্রিকে স্ট্যান্ড করবেই। মেজো ছেলে সতীন বা সতীন্দ্র লেখাপড়ায় সুবিধে করতে না পারলেও সে কাটা কাপড়ের একটা কারবার খুলেছে। দোকানটা বেশ চলছে এখন। রাজেনবাবু সুতরাং তব দারিদ্র্যের গ্লানি সম্পূর্ণ কাটিয়ে উঠে এখন বিশিষ্ট একজন নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছেন। সুখের বিষয়, তার নিজের পসারও এখন যথেষ্ট। তবু তিনি কানাঘুষো শুনেছেন যে, হেমবাবুর ছোট মেয়েটি নাকি গরিব বলেই তাঁর পরিবারে বউ হয়ে আসতে স্বীকার হচ্ছে না।
রাজেনবাবু জেদি লোক। বৈষয়িক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তাঁর আত্মমর্যাদাবোধটিও বেড়েছে। এই জেলার কোন জমিদারের অবস্থা কেমন তা তিনি ভালই জানেন। হেমকান্ত চৌধুরীর অবস্থাও তার অজানা নয়। তবু এই পরিবারটির প্রতি তার কৃতজ্ঞতাবোধ খুবই গভীর। এক সময়ে এঁরা তাঁর দুঃখের দিনে অযাচিত সাহায্য বড় কম করেননি। তাই হেমবাবুর মেয়েটিকে বউ করে আনতে তিনি এক কথাতেই রাজি হয়ে যান। মেয়েটিও সুন্দরী।
কিন্তু তাঁর মেজো মেয়ে সুফলার কাছে তিনি বিশাখার স্বভাবের যে পরিচয় পেয়েছেন তা মোটেই ভাল নয়। তাঁর স্ত্রী স্বর্ণপ্রভাও এই বিয়েতে বেঁকে বসেছেন। তবু এখনও যে বিয়েটি ভেঙে যায়নি তার কারণ, রাজেনবাবু নিজে থেকে বিয়েটা ভাঙতে চান না। তাতে হেমবাবুকে অপমান করা হবে। তবে তিনি ছেলের জন্য ভাল পাত্রীর সন্ধানে আছেন। দু-একটা ভাল সম্বন্ধ এসেছে। তার মধ্যে দুটি জমিদারকন্যা। শ্রীকান্ত রায়ের মেজো মেয়েটিকে তাঁরা একরকম পছন্দ করেই ফেলেছেন। বিশাখার মতো অতটা না হলেও মেয়েটি সুন্দরীই। উপরন্তু শ্রীকান্ত রায় মুখ ফুটে নিজেই বলেছেন, আমার ছেলে জ্যোতিপ্রকাশের সঙ্গে আপনার মেজো মেয়েটিরও বিয়ে হতে পারে।
পালটি বিয়েতে একটু আপত্তি আছে স্বর্ণপ্রভার। তবে তিনি এখনও পরিষ্কার মতামত জানাননি। যদি আপত্তিটুকু শেষ অবধি না থাকে তবে আষাঢ়েই জোড়া বিয়ে লেগে যেতে পারে। শ্রীকান্ত রায় একটু কৃপণ মানুষ। তার ওপর নিজে ল পাশ। বিষয়বুদ্ধিও চমৎকার। তাই জমিদারদের মধ্যে তাঁর অবস্থাই সবচেয়ে স্থিতিশীল।
সবদিক বিবেচনা করে দেখেছেন রাজেনবাবু! শ্রীকান্ত রায়ের প্রস্তাবটিই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। এখন অপেক্ষা শুধু হেমকান্তর দিক থেকে একটি অস্তিবাচক বা নেতিবাচক কথা শোনবার। যদি শেষ পর্যন্ত হেমবাবুর মেয়েটি বিয়েতে রাজিও হয় তবে দেনা-পাওনার প্রশ্ন তুলে প্রস্তাবটি কাটিয়ে দেওয়া যাবে। হেমকান্তর সাধ্য নেই মেয়ের বিয়েতে খুব বেশি নগদ টাকা খরচ করার। শচীনের কাছ থেকে হেমবাবুর এস্টেটের অবস্থা তিনি মোটামুটি জেনে নিয়েছেন।
