সেও জানি।
অনেক সময়ে এইসব অন্যের করা দোষের ভাগ নিতে হয় নিজের ঘাড়ে।
আপনার কী হয়েছে বাবা?
সব তোমাকে বলা যায় না। তবে আমাকে একটা মাইনর পোর্টফলিও দেওয়া হয়েছে। সম্ভবত সম্পূর্ণ সরিয়ে দেওয়ারই প্রস্তুতি। সেটা ঘটবার আগেই অবশ্য আমাকে নিজে থেকেই সরে আসতে হবে।
রেমি ছেলেমানুষের মতো বলে, তাতে ভালই তো হবে। আপনার বিশ্রাম দরকার। কিছুদিন রেস্ট নিন।
কৃষ্ণকান্ত মাথা নেড়ে বলেন, দূর বোকা, পুরুষ মানুষের বিশ্রাম কি শুয়ে বসে হয় মা? কাজই তার বিশ্রাম, কাজ না থাকলে আমি কতদিন বাঁচব?
কাজ করবেন। মন্ত্রী যারা না হয় তারা কি কাজ করে না?
কৃষ্ণকান্ত মৃদু একটু হেসে বলেন, তোমার কথাগুলো এত সহজ মা, ভিতরে টনটন করে গিয়ে লাগে। বাস্তবিকই তাই। তবে যে বাঘ একবার মানুষ খেয়েছে তার অন্য মাংস আলুনি লাগে। এও হল সেই বৃত্তান্ত।
আপনি কি রেজিগনেশন দিচ্ছেন?
ঠিক বলতে পারি না। কয়েকদিনের মধ্যেই একটু দিল্লি যাব। হাইকম্যান্ডের সঙ্গে কথা আছে। ফিরে এসে ডিসিশন নেব। আমি তো রাতারাতি পলিটিশিয়ান হইনি মা, আমার পিছনে একটা উজ্জ্বল ইতিহাস আছে।
জানি, বাবা।
তাই আমাকে টক করে সরিয়ে দেওয়া সহজ নয়। কিন্তু এসব কথা থাক। আমার হেনস্থা দেখে যে লোক সবচেয়ে খুশি হতে পারত তার খবর বলো তো। সে ব্যাটা করছে কী?
জানি না, উনি আমাকে হোটেলে ফেলে কোথাও চলে গিয়েছিলেন।
কদিনের জন্য?-হেমকান্ত আঁতকে উঠে জিজ্ঞেস করেন।
এক রাত উনি ছিলেন না।
তোমাকে বলেও যায়নি।
না।
হোটেলের ঘরে তুমি একা ছিলে! সর্বনাশ!
সেইজন্যই ডিসিশনটা নিতে হল। আমি চলে এলাম।
দামড়াটা তখনও ফেরেনি?
ফিরেছে। স্টেশন থেকে ফোন করে জানতে পারি।
তুমি দারুণ বুদ্ধিমতী।
আমি এখন কী করব, বাবা?
কী করবে? তোমার কিছু করার নেই। যা করার আমি করছি।
কী করবেন? ওঁকে ফিরিয়ে আনবেন?
কৃষ্ণকান্ত একটু হাসলেন। মাথা নেড়ে বললেন, সে কাজ খুব সহজ নয়। ভুবনেশ্বরে আমার এক প্রভাবশালী বন্ধু আছে। ক্যাবিনেট মিনিস্টার। তাকে জানিয়েছিলাম। পুরীতে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ওই হোটেল ছেড়ে দামড়াটা চলে গেছে। বুদ্ধি রাখে। যেই দেখেছে তুমি নেই, সঙ্গে সঙ্গে আঁচ করে নিয়েছে কলকাতায় এসে তুমি আমাকে খবর দেবে। সময় নষ্ট না করে পালিয়েছে।
কিন্তু উনি পালাচ্ছেন কেন?
সেটা ওই জানে। ধ্রুব কিছুদিন আইন পড়েছিল। পাশ করেছে কি না তা আমি জানি না, কোনওদিন বলেনি আমাকে। কিন্তু আইন পড়ে না হোক, আইন বারবার ভাঙলেও বেশ ভাল আইনের জ্ঞান হতে পারে। কাজেই ধ্রুব আইন ভালই জানে। পুলিশ যে ওর কিছু করতে পারবে না সেটা ওর না জানার কথা নয়। হয়তো এই কাণ্ড করে আমাকে অপদস্থ করার একটা পন্থা বের করছে।
রেমি একটু দুঃসাহসী হল। মাথা নিচু করে আচমকাই বলে বসল, আমাকে একটা কথা বলবেন আজ?
কী কথা, মা?
আমার শাশুড়ি কীভাবে মারা যান?
কৃষ্ণকান্ত একটুও দ্বিধা করলেন না। খুব সহজ কণ্ঠে বললেন, ধ্রুব তোমাকে কী বলেছে জানি, কিন্তু একথা সবাই জানে তোমার শাশুড়ি আত্মহত্যা করেন গায়ে আগুন দিয়ে। অনেকে এতে আমার দোষ খুঁজে পায়। হতেও পারে। তোমার শাশুড়ির মানসিক জগতের খবর আমি বিশেষ রাখিনি। আমরা আগের দিনের মানুষ, স্ত্রীলোককে নিয়ে ভাবতে অভ্যস্ত নই। তবে উনি আমার কাছে তেমন কোনও অনুযোগ অভিযোগ করতেন না। কী করে বুঝব বলল, ওঁর আসল প্রবলেমটা কী ছিল?
আপনার ছেলে কিন্তু খুব তাঁর মায়ের কথা বলেন।
বলতেই পারে। হি ওয়াজ এ উইটনেস অফ দি ইভেন্ট। ছেলে নিজের চোখের সামনে যদি নিজের মাকে পুড়ে যেতে দেখে তবে তার একটা পার্মানেন্ট এফেক্ট তার মনে থাকবেই।
আপনার ছেলে ওই ঘটনার জন্য আপনাকেই দায়ি করতে চায়।
কৃষ্ণকান্ত ম্লান একটু হেসে বলেন, আমি জানি, মা। আমার ফাঁসি হলে ধ্রুব হরির লুট দেবে। কিন্তু আগেই বলেছি, স্ত্রী কেন আত্মহত্যা করলেন তা বলা আমার পক্ষে সহজ নয়। ঘটনাটা যখন ঘটে তখন আমি কলকাতার বাইরে। প্রত্যক্ষ হাত তত থাকতে পারে না, তবে পরোক্ষ কারণের কথা যদি বলো তবে স্বীকার করতে বাধা নেই, আমার অমনোযোগ এবং খানিকটা অবহেলা তো ছিলই।
আর কোনও কারণ নয়?
কী করে বলি! উনি তো একটা চিরকুটও রেখে যাননি, যা থেকে বোঝা যাবে।
তাহলে আপনার ছেলে আপনাকেই দায়ি করে কেন?
ধ্রুব তার মাকে খুব ভালবাসত। আসলে শিশু অবস্থা থেকে ভাইবোনেরা পেয়েছিল মাকেই। বাবাকে তো পায়নি। জেল খাটা, পলিটিকস করে বেড়ানো, হিল্লি-দিল্লি ঘুরে আমার সময় হত না সংসারের দিকে তাকানোর। কাজেই ওরা মাকে ঘিরেই বড় হয়েছে। মা ওদের দ্বিতীয় সত্তা। তোমার শাশুড়ি মানুষটাও ছিলেন নরম-সরম এবং স্নেহপ্রবণ, তবে বড় দুর্বল প্রকৃতির। একটু কঠোর কথা বা কোনও দুঃসংবাদ সইতে পারতেন না। সহজেই ভয় পেতেন। তাঁকে ভালবাসাও সহজ ছিল, তাই তিনি যখন মারা গেলেন এবং ওরকম ভয়ংকরভাবে, তখন আক্রোশে পাগল ধ্রুব একটা স্কেপগোট খুঁজতে লাগল।
ক্ষেপগোট মানে?
এমন একজন, যার ওপর মায়ের ওই ভয়ংকর মৃত্যুর দায়ভাগ চাপানো যায়।
এটা তো ওঁর অন্যায়। ভীষণ অন্যায়।
অন্যায় তো বটেই। কিন্তু আমি প্রতিবাদ করিনি কখনও।
কেন করেননি?
স্ত্রীর প্রতি তেমন কর্তব্য করিনি মা, ভিতরে ভিতরে নিজেকে দোষী মনে হয়। মা-মরা ছেলেটা আর কোথায় সান্ত্বনা পাবে? যদি আমাকে দোষী ভেবে খানিকটা স্বস্তি পায় তো পাক না। ঠিক এরকম ভেবেই আমি ধ্রুবকে একরকম প্রশ্রয় দিতাম। সেটা যে ওর মনে এতদূর ডালপালা ছড়াবে তা ভেবে দেখিনি। আমার আরও দুই ছেলে আছে। তারা কিন্তু ওর মতো করে ভাবে না।
