নাটক?—হেমকান্ত আকাশ থেকে পড়েন, কীসের নাটক?
নাটকটি ব্যবস্থা করেছে তোমার বড় বউমা চপলা।
তাই নাকি? কী ব্যাপারটা খুলে বলো তো?
শুনেছি তোমার মেয়ের সঙ্গে নাকি আজ শচীনের মুখোমুখি হবে।
তার মানে?
তুমি সেকেলে মানুষ, তায় ঘরকুনো। সব বুঝবে না।
আমাকে তুমি নির্বোধ বলে ভাবলেও আমি ততটা নই। কী ব্যাপার বলো তো?
বিশাখা শচীনকে বিয়ে করতে চায় না, সে তো জানোই।
জানি বই কী। মেয়েটা বোকা।
চপলা ঠিক করেছে দুজনকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে। দুজনে কথাটথা কইবে। যদি তাতে মেয়ের মন গলে।
হেমকান্ত একটু রাগের স্বরে বলেন, এসবের কী দরকার ছিল?
শহুরে কায়দা। আমি তো খারাপ কিছু দেখি না।
আমি দেখি। এ পরিবারে এখনও পাত্ররা পাত্রী দেখে না। আর এ তো আরও নির্লজ্জ ঘটনা।
রঙ্গময়ি মৃদু স্বরে বলে, তোমার সব তাতে মাথা ঘামানোর কী দরকার? শচীনকে বিয়ে করার ব্যাপারে মেয়েকে কি রাজি করাতে পেরেছ?
ধৈর্য ধরলে রাজি হত।
সেটা অনিশ্চিত ব্যাপার। তুমি পারোনি।
চপলা পারবে?
পারবে কি না জানি না। কিন্তু এটাও একটা চেষ্টা। তোমার তো চেষ্টাই নেই।
তবু ঘটনাটা আমার ভাল লাগছে না, মনু।
তোমার মুখে কথাটা মানায় না।
কেন মানায় না, মনু?
আমার সঙ্গে তুমি কথা বলো কোন লজ্জায়?
০৪০. অপারেশন থিয়েটারের চোখ-ধাঁধানো আলো
অপারেশন থিয়েটারের চোখ-ধাঁধানো আলো রেমির নিষ্প্রভ চোখে ম্লান ও একাকার। নিজের শরীরের মধ্যে এক নদীর কলধ্বনি শুনতে পাচ্ছে সে। রক্তপাত বন্ধ হচ্ছে না, ডাক্তাররা উদ্বিগ্ন। একটি সদ্যোজাত শিশু মাতৃহারা হবে।
কিন্তু রেমির কোনও উদ্বেগ নেই। এই মধ্যযৌবনে জীবনের খেলা মাঝপথে থামিয়ে চলে যেতে কারই-বা ভাল লাগে! কিন্তু আশ্চর্য এই, রেমি কোনও শোক অনুভব করে না। তার আধাচেতনায় অবশ্য চারদিককার এই উদ্বেগ ও ভয় গিয়ে আঘাত করছে না। সে দেখতে পাচ্ছে না তার শ্বশুরের স্তম্ভিত ক্ষুব্ধ মুখ। সে দেখতে পাচ্ছে না হতভম্ব ধ্রুবর কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা, কিন্তু নিজের নিজকুম শরীরে এক ধরনের কঠিন শীতলতা টের পাচ্ছে সে। শীত নয়, কেমন জমাট, শক্ত পাথরের মতো অমোঘ এক শীতলতা তার দুই পা অনড় এবং অবশ করে রেখেছে। মাথাটা গুলিয়ে যাচ্ছে বারে বারে। চোখের সামনে নানারকম দৃশ্যাবলী ভেসে যাচ্ছে। তার সবটারই কোনও অর্থ নেই কিছু। মাঝে মাঝে সে টের পাচ্ছে যে, সে রেমি। সে রেমিই, আর কেউ নয়। আবার মাঝে মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে তার সত্তা।
তার চারদিকে নানান টুকটাক শব্দ হচ্ছে। চাপা কথাবার্তা। বারবার মুখোশ পরা ডাক্তারের মুখ এসে ঝুকে গড়ছে মুখের ওপর। ড্রিপ চলছে। কিন্তু রক্তের কলধ্বনি বড় উতরোল। একটু আগে অসহনীয় গর্ভযন্ত্রণা সহ্য করেছে সে দাঁত টিপে। জন্ম দিয়েছে ধ্রুবর সন্তানকে। নিষ্কলঙ্ক, খাঁটি, চৌধুরীবাড়ির রক্তবাহী শিশুটি নিরাপদে নেমে গেছে মায়ের খোলস ছেড়ে। রেমির এর চেয়ে বেশি আর কী দেওয়ার ছিল এদের? এবার ছুটি, এবার সে ঘুমিয়ে পড়বে।
মিসেস চৌধুরী!
উঁ।—রেমি ক্ষীণ জবাব দেয়।
জিবটা বের করুন তো! প্লিজ!
বড় ক্ষীণ এই আদেশ বহু দূর থেকে ভেসে আসে যেন। রেমি চিরকাল আদেশ পালন করে। কারও অবাধ্য সে কোনওকালে ছিল না।
কষ্টে রেমি জিবটাকে ঠেলে দেয় বাইরে। মনে হল, যেন পাহাড় ঠেলার পরিশ্রম।
কে যেন বলল, শি ইজ রেসপন্ডিং, সেন্স আছে।
আছে। তবে ইটস এ হেভি ব্লিডিং, শি উইল বি সিংকিং ফাস্ট।
কে একজন হেঁকে বলল, ব্লাড, কুইক।
রেমিকে কিছুই স্পর্শ করে না, চোখের পাতা সামান্য একটু খুলে সে চেয়ে থাকে। গোধূলি! কনে-দেখা রং চারদিকে, এ সময়ে পাখিরা ঘরে ফেরে। দিন যায়। রাত আসে।
তার আর কী দেওয়ার ছিল নারীজন্ম সার্থক করতে? কোন কাজ বাকি রয়ে গেল? কোন ঋণ? কোন দোষত্রুটি! ঘাট মানি বাবা, ক্ষমা করো। আর আসব না কখনও তোমাদের কাছে। কে। আমাকে এনেছিল পৃথিবীতে? এবার ফিরিয়ে নাও।
পুরী থেকে অত শপথ করে ফিরেছিল রেমি, রাখতে পারল না রোখা ঠিক করে এসেছিল, ধ্রুবর সঙ্গে আর বসবাস নয়। দূরে থাকবে, যদি তাতে কোনওদিন ওর কাছে মূল্য হয়!
শ্বশুরমশাইয়ের জন্য সেই শপথ ভাঙতে হল।
পরদিন সে হাজির হল কালীঘাটের বাড়িতে।
রাত্রিবেলা ক্লান্ত কৃষ্ণকান্ত ফিরলেন। মুখে দুশ্চিন্তার গভীর বেখা। চোখের নীচে কাজলের মতো কালিমা।
রেমিকে দেখে সেই গহন বিষণ্ণতার মধ্যেও সত্যিকারের একটু আনন্দ অস্ফুট হয়ে ফুটল।
এলে মা?
আপনার কী হয়েছে?
তেমন কিছু নয়।
আপনি রোগা হয়ে গেছেন।
এ বয়সে একটু রোগা হওয়া ভাল, বুঝলে!
না, বুঝলাম না, টপ করে রোগা হওয়া ভাল লক্ষণ নয়।
কৃষ্ণকান্ত কোনও জবাব না দিয়ে হাসলেন। সস্নেহে রেমির দিকে চেয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, একটু মাথা নাড়লেন।
খাওয়ার টেবিলে যখন বসলেন তখন কৃষ্ণকান্তকে কিছুটা সজীব দেখাচ্ছিল, রাত্রে তাঁর খাওয়া-দাওয়া যৎসামান্য, খই দুধ বা একটু ছানা। কখনও-সখনও এক-আধখানা হাতে গড়া রুটি।
সেই সামান্য খাবার সেদিন অনেকক্ষণ ধরে খেলেন কৃষ্ণকান্ত। খেতে খেতে বললেন, তুমি কি একথা বিশ্বাস করবে বউমা যে, আমি কখনও চুরি করিনি, দুর্নীতির আশ্রয় নিইনি, অকারণে মিথ্যে কথা বলিনি? বিশ্বাস করবে?
কেন করব না? আমি তো জানি ওসব।
কৃষ্ণকান্ত মাথা নেড়ে বলেন, কিছুই জানো না মা, পলিটিকস করলে বুঝতে, চুরি না করা এক কথা, আর অন্যের চুরি দেখেও চোখ বুজে থাকা অন্য কথা। এমন অনেক সময়েই হয়, তুমি চাও বা না চাও অনেক অন্যায়কে তোমার প্রশ্রয় দিতেই হয়।
