প্রথা আঁকড়ে থাকতে গেলে যে নিলামে চড়াতে হবে সব কিছু। দিনকাল বদলে যাচ্ছে, পুরনো প্রথা আঁকড়ে থাকলে চলবে কেন? আমি তো জমিদার বাড়ির ছেলে। ব্রাহ্মণ সন্তান, তবু আমি তো ব্যাবসা করতে নেমেছি।
হেমকান্তর মনটা সায় দিচ্ছে না। তবে তিনি কনকের সঙ্গে আর কথা বাড়ালেন না। ওরা সব সময়ে। ঠিক কথাই বলে। ওদের কথায় যুক্তির কোনও অভাব নেই। তিনি বললেন, আচ্ছা। ঠিক আছে।
কনককান্তি তবু চলে গেল না। একটু অপেক্ষা করে হঠাৎ বলল, একটা কথা, বাবা।
বলো।
শচীনের লিস্টে আমাদের পুরুতমশাইয়েব নাম নেই। কিন্তু আমি মনে করি ওঁর নামটা সবার আগে লেখা উচিত ছিল।
পুরুতমশাই!–হেমকান্ত শশব্যস্তে বললেন, তার আবার কী হল?
কনককান্তি মৃদু হেসে বলল, সকাল-সন্ধেয় দুবার ঘণ্টা নাড়ার জন্য একটা লোককে তার বিশাল। পরিবারশুদ্ধ দিনের পর দিন প্রতিপালনের কোনও অর্থই হয় না।
হেমকান্ত কথা বললেন না। চেয়ে রইলেন।
কনককান্তি বলল, ওদের খানিকটা জমি দেওয়া আছে বয়রায়। চাষবাসও করান জানি। এখানকার চাকরি গেলে একেবারে না খেয়ে মরবেন না। আমার পরামর্শ হল, নগদ কিছু টাকা দিয়ে ওঁদেরও উচ্ছেদ করে দিন। মাস-মাইনের পুরুত ঠিক করুন। তাতে ঝামেলা আর খরচ দুই-ই কমে যাবে।
হেমকান্ত কথা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। প্রস্তাবটা এমন কিছু সাংঘাতিক নয়। কিন্তু মনু-মনু কোথায় যাবে?
কনককান্তি যেন হেমকান্তর মনের কথা শুনতে পেল। একটু ইতস্তত করে বলল, মনুপিসির কথা অবশ্য আমাদের আলাদা করে ভাবতে হবে। উনি আমাদের যথেষ্ট সেবা করেছেন। ওঁর জন্য বরং পাঁচ টাকা মাসোহারার ব্যবস্থা করে দিন।
হেমকান্ত ভারী অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন। নতুন একটা যুগের পাগলা হাওয়া এসে তাঁর ঘরের সব কিছু ওলট-পালট করে দিতে চাইছে। সম্ভবত এ থেকে তাঁর নিস্তার নেই। অলস অকর্মার যে জীবন তিনি কাটিয়েছেন তার জন্য কিছু গুনোগার তো তাঁর দেওয়ারই কথা। সবচেয়ে বড় গুনোগার কি মনুকে হারানো?
কনককান্তি মৃদুস্বরে বলল, এস্টেটের অবস্থার জন্য আপনি নিজেকে অপরাধী ভাবেন বলে শুনেছি। কিন্তু দোষ আপনার নয়। ওয়ার্লড ওয়ারের পর যে ডিপ্রেশনটা এসেছে সেটাকে কাটানো খুব মুশকিল। আদায়-উসুল ঠিকমতো হলে ততটা চিন্তার কিছু ছিল না। কিন্তু আপনি অনেক খাজনা মাপ করে দিয়েছেন। আমি বলি কী, শচীনকে শুধু উকিল হিসেবে নয়, ম্যানেজার হিসেবেই রাখুন। শক্ত লোক। আদায়-উসুল ঠিকমতো করতে পারবে। ওকালতিও করুক।
আমিও তো তাই চাই। সবচেয়ে ভাল হত তোমাদের দুই ভাইয়ের কেউ এসে আমার কাছে থাকলে।
সেটা তো সম্ভব নয়।
দেখি, শচীনের সঙ্গে কথা বলব। এ লোকগুলোকে তাহলে বিদেয় দেওয়াই সাব্যস্ত হল?
আমি তাই বলি। তবে আপনি যা ভাল বুঝবেন করবেন।
কনক চলে যাওয়ার পর হেমকান্ত খানিকটা অস্থির সময় কাটালেন। রাতে ভাল ঘুম হল না।
বাহুল্য কর্মচারীদের বিদায় দেওয়াই যদি সিদ্ধান্ত হয় তবে মনুর বাবাকেও রাখা চলে না। পাকে-প্রকারে একথাটাই তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে কনক। হেমকান্ত যদি শক্ত মানুষ হতেন তবে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ছেলের পরামর্শ চাইতেন না। কিংবা ছেলের পরামর্শ যাই হোক সেটাকে গ্রাহ্য করতেন না। কিন্তু সেই দৃঢ়তা হেমকান্ত নিজের ভিতর খুঁজে পান না।
পরদিন বিকেলে হেমকান্ত নিঃশব্দে নিজের একটেরে কুঞ্জবনটিতে এসে বসলেন। মনুর সঙ্গে একটু পরামর্শ করা দরকার। কিন্তু কনককান্তি আসায় তিনি আড়ালেও মনুর সঙ্গে দেখা করার সাহস পাচ্ছেন না।
ভাঙা গাড়ির পাদানিতে বসে হেমকান্ত শচীনের লিস্টটা বের করে আর-একবার দেখলেন। এক-একটা নাম, এক-একটা মানুষ। এক-একটা মানুষকে ঘিরে কত স্মৃতি। এই যে নব্বই বছর বয়সের সুবলভাই। এই বাগানের কাজ করতে করতে হাড়ে ঘুণ ধরিয়ে ফেলল। ওর দুটো ছেলেকেও ঢুকিয়েছিল কাজে। পশ্চিমে একটা কেয়াঝোপ ছিল। তার নীচে আগাছা পরিষ্কার করতে গিয়ে সুবলের এক ছেলেকে সাপে কামড়ায়। বাঁচেনি। কতকাল আগেকার কথা!
কিংবা হর কমপাউন্ডার। মেয়ের শোকে মাথাটা কেমন হয়ে গেল। আর কাজকর্ম করতে পারল। কিন্তু নীরবে এক বদ্ধ খুপরির মধ্যে বসে বছরের পর বছর ওষুধ তৈরি করে গেছে। কখনও নালিশ জানায়নি। আর্জি জানায়নি।
এদের তো কনক ঠিক চিনবে না। শচীন তো আরও নয়। এদের কাছে এস্টেট মানেই আয়পয়। কিন্তু হেমকান্ত ঠিক সেরকম শিক্ষা লাভ করেননি। তাঁর কাছে একটা এস্টেট মানেই অনেকগুলি মানুষের ভাগ্য। অনেকগুলি মানুষের হৃদ্যতা, আত্মীয়তা। এক মস্ত যৌথ পরিবার। তিনি মহালে যাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন। কিন্তু জানেন, আজও কোনও মহালে গিয়ে হাজির হলে মানুষ কত খুশি হয়, ছুটে আসে। বউবাচ্চা সমেত এসে প্রণাম করে, দক্ষিণা দেয়। ইদানীং তারা পেরে উঠছে না, কী করবে?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লিস্টটা পকেটে ঢুকিয়ে চোখ তুলতেই চমকে উঠলেন হেমকান্ত। পা থেকে মাথা অবধি শিউরে উঠল তাঁর।
অদূরে এক মহানিমের ছায়ায় দাঁড়িয়ে তাঁকে তীক্ষ্ণ চোখে লক্ষ করছে মনু।
হেমকান্ত মৃদু হেসে বললেন, এসো।
রঙ্গময়ি এগিয়ে এসে বলে, তুমি এখানে যে হঠাৎ!
কয়েকদিন আসিনি। বাড়িতে ওরা সব এসেছে।
আজ কী মনে করে?
এমনি। মনটা ভাল নেই। এসো মনু, দুটো কথা বলি।
রঙ্গময়ি মাথা নেড়ে বলে, আজ এখানে এসে ভাল কাজ করোনি।
কেন বলো তো!
এখানে আজ একটা নাটক হওয়ার কথা আছে।
